আল কোরআন ও বিজ্ঞান এবং মুসলমানদের অবদান

প্রকাশিত: ১:০১ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৮, ২০১৯

আল কোরআন ও বিজ্ঞান এবং মুসলমানদের অবদান

হারুনুর রশীদ ,বার্সেলোনা ,স্পেন ।
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান এবং একটি চিরন্তন ধর্ম।
আল কোরআন হচ্ছে শ্বাশত বিধান । অন্যদিকে
বিজ্ঞান শ্বাশত নয়। এক সময় বিজ্ঞান যা বলে, পরে তা পরিবর্তন হতে পারে।
বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের ভাষায়- Science without religion is lame
and religion without science is blind.
নবী করিম হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর ওপর সর্বপ্রথম “ইকরা” শব্দটি দিয়ে ইসলামের যাত্রা।
জ্ঞান সাগরের মহাধিপতি মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা.) ঘোষণা করেন- ‘লেখকের কালি শহীদের রক্ত অপেক্ষাও খোদার নিকট অধিক পবিত্র।’ ‘এক ঘণ্টা জ্ঞান-বিজ্ঞান আলোচনা সহস্র রজনী উপাসনাপেক্ষা শ্রেয় ।”আল্লাহর সৃষ্টি সম্পর্কে নিবিষ্ট মনে এক ঘণ্টা চিন্তা করা এক হাজার বছর এবাদত করা অপেক্ষা উৎকৃষ্ট।’
আল কোরআন হচ্ছে বিজ্ঞানময়। আধুনিক বিজ্ঞানীগণ আজ পর্যন্ত আল কোরআনের কোন বক্তব্য অসার প্রমান করতে পারেনি।
মানবজাতির গাইডলাইন আল কোরআনে আল্লাহ তা’য়ালা সাত শতাধিক আয়াতে জ্ঞান বিজ্ঞান অর্জন ও এ সম্পর্কে চিন্তা করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। এবং পবিত্র কুরআনের এক তৃতীয়াংশ (২২২২টি) আয়াতই প্রত্যক্ষভাবে বিজ্ঞান সম্পৃক্ত।
মরিছ বুকাইলির ভাষ্যমতে- “কুরআনে এমন একটা বক্তব্যও নাই, যে বক্তব্যকে আধুনিক বৈজ্ঞানিক বিচারে খন্ডন করতে পারে।”
আজকের এই পৃথিবীতে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ‘একশত নব্বই’ কোটির মতো।কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে,মহানগ্রন্ত আল-কোরআনের এই নির্ভুল
ও বিজ্ঞানময়তার খবর মুসলিম গৌরবময় যুগের পর মুসলিম জাতি এক পর্যায়ে ভুলে গেলেও ,ভুলেনি পাশ্চাত্যরা । ল্যাটিন , জার্মান প্রভৃতি ভাষায় কুরআনের প্রচুর অনুবাদ হয়।এবং তারা কুরআন গবেষণার মাধ্যমে প্রচুর বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও আবিস্কার পৃথিবীকে উপহার দিতে সক্ষম হয়।
যেমন এক সময় মানুষ জানত মানুষের কথা বাতাসে হারিয়ে যায়। কিন্তু কোরআনের মাধ্যমে পাশ্চাত্য জানতে পারল যে, মানুষের উৎক্ষিপ্ত কথা বাতাসে ভেসে যায়। ইরশাদ হচ্ছে- “একদিন সবকিছুই প্রকাশিত হয়ে পড়বে (ইয়াওমাইজিন তুহাদ্দিচু আখবারাহা)।
উক্ত আয়াতে বাতাসে সব কথা একদিন প্রকাশ হওয়ার ইঙ্গিত রয়েছে। সুতরাং বেতার আবিস্কারের বহু শতকের সাধনা আল-কোরআনের এই বাণীতে নিহিত এবং পাশ্চত্যরা তা যথাযথভাবে কাজে লাগিয়েছে।
একইভাবে মহাকাশ,চন্দ্র সূর্যের পরিক্রমণ, মধ্যাকর্ষণ শক্তি, মানুষ ও জীবের সৃষ্টি প্রক্রিয়া, উদ্ভিদ প্রাণী ও রসায়ন প্রভৃতি বিষয়ের আবিস্কার পাশ্চাত্যরা
করলেও তার বেশির ভাগই আল-কোরআনে উল্লেখ ছিল হাজার বছর পূর্বেই।
মুসলিম জাতি তাদের বৈজ্ঞানিক বিপ্লব সংগঠিত করেছিল আল-করআনের বলেই। বিজ্ঞানের এমন কোন শাখা নেই যেখানে মুসলিম মনীষীদের হাতের
ছোয়া লাগেনি। তাদের রচিত যুগশ্রেষ্ঠ ও কালজ্বয়ী গ্রন’গুলো শত শত বছর ধরেই ইউরোপে পাঠ্যসূচী ছিল। ইবনে সীনা, আল -আল রাজী, আবুল কাসেম জাহারাভী, ইবনুল হাইছাম, জারকালী, জাবির বিন হাইয়ান, মুসা আল খারেজমী প্রমুখ বিজ্ঞানীদের আবিস্কার ও রচনাবলী সেইদিন ইউরোপের শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল পাঠ্যসূচী ছিল।
মুসলমানদের হাজার বছরের সভ্যতা ও সংস্কৃতির এক উজ্জ্বলতম কেন্দ্র ছিল মুসলিম স্পেন। দীর্ঘ সাতশত বছর স্পেন মুসলমানদের অধীনে ছিল। বাগদাদ,
কনস্টান্টিনোপল ও কর্ডোভায় মুসলিম উৎকর্ষতার চরম বিকাশ লাভ করে।তবে স্পেনের কর্ডোভা ছিল স্বতন্ত্র মর্যাদার অধিকারী । মুসলিম স্পেন যখন
জ্ঞান বিজ্ঞান, শিল্প – সভ্যতা ও সংস্কৃতি চর্চায় নিমগ্ন তখন ইউরোপীয়রা অজ্ঞতা- বর্বরতায় নিমজ্জত ছিল। লেনপুল বলেন- All Europe was then
plunged in barbaric ignorance and savage manners.

মুসলিমদের অবিস্মরণীয় অবদান:-

মহানগ্রন্ত আল কোরআন ও বিশ্বনবী(সা:) এর মৌলিক নির্দেশকে বুকে ধারন করে যে মুসলিম বিজ্ঞানী ও মনীষীগণ পৃথিবীর বুকে
জ্বালালেন এক উজ্জ্বল দীপ্ত শিখা।

১। জাবির ইবনে হাইয়ান: (৭২২-৮০৪)
রসায়নের ইতিহাসে যার নাম সর্ব প্রথমে আসবে তিনি আর কেউ নয় তিনি হচ্ছেন- আল জাবির ইবনে হাইয়ান। তিনি দুই হাজারেরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন। যারমধ্যে
রসায়ন বিষয়ক ২৬৭ টি
যুদ্ধাস্ত্র বিষয়ক ৩০০ টি
চিকিৎসা বিষয়ক ৫০০ টি
এছাড়াও ইস্পাত তৈরি, ধাতুর শোধন, তরল বাষ্পীয় করণ, কাপড় ও চামড়া রঙ করা, ওয়াটার প্রুফ তৈরি করা, লোহার মরিচা প্রতিরোধক বার্ণিশ, চুলের কলপ, লেখার পাকা কালি ইত্যাদি আবিষ্কার করে বিজ্ঞান জগতে তার স্মৃতি অমর হয়ে আছেন তিনি।

২। অাল কিন্দি (৮১৩-৮৭৩):
বিজ্ঞানের উপর যে বৈজ্ঞানিক ২৭৫টি বই লিখে বিজ্ঞানে যিনি ব্যাপক অবদান রেখেছেন তিনি আর কেউ নয়, মুসলিম বৈজ্ঞানিক অাল কিন্দি। এছাড়া তাঁকে সাংকেতিক বার্তার পাঠোদ্ধারকারীও বলা হয়।

৩। অাল ফারাবি (৮৭০-৯৫০):
ফারাবিকে বলা হয় পদার্থ বিজ্ঞানে শূন্যের অবস্থান নির্ণয়কারী । যিনি বাগদাদে প্রায় চল্লিশ বছর উচ্চ শিক্ষার গভেষণা কাজে নিয়োজিত ছিলেন। দর্শনে অাল ফারাবি ছিলেন দার্শনিক প্লেটোর সমপর্যায়ের। যাকে ‘দ্বিতীয় এরিস্টটল’ এবং ‘মুঅাল্লিমুস সানি’ বা দ্বিতীয় শিক্ষক বলালা হয়।

৪। ইবনে সিনা (৯৮০-১০৩৭):
চিকিৎসা বিজ্ঞানে যার অবদান সবচেয়ে স্মরণীয় তিনি হলেন ইবনে সিনা। তাঁকে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক বলা হয়।
চিকিৎসা শাস্ত্রে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থের নাম ‘কানুন ফিত তীব’ এ গ্রন্থে ৭৬০ টি ঔষধ ও চিকিৎসা পদ্ধতির বর্ণনা অাছে। যা পশ্চিমা বিশ্বের চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের কাছে Bible of Medical Science হিসেবে পরিচিত।

৫। মুসা অাল খাওয়ারিজমি (৭৮০-৮৫০):
পৃথিবীর ১ম বীজ গণিতের জন্মদাতা মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল খারেজমি। তিনি ভারতকে নিয়ে একটি বই লিখেছিলেন যার নাম কিতাবুল হিন্দ। অংক বিভাগে শূন্যের মূল্য অমূল্য এবং অপরিসীম এই শূন্য [০] আবিষ্কার তার বলে দাবি করা হয়। ‘হিসাব আল জাবর ওয়াল মোকাবেলা’ বইটি তার বিরাট অবদানের কথা মনে করিয়ে দিবে। শুধু তাই নয় তিনি জ্যোতির্বিদও ছিলেন। খলিফার অনুরোধে আকাশের মানচিত্রও তিনি এঁকেছিলেন এবং একটি পঞ্জিকার জন্ম দেন। তাকে সরকারী উপাধি দেয়া হয়েছিল- ‘সাহিব আলজিজ’।

৬। অাল রাজি (৮৬৫-৯২৫):
ম্যাঙ্গানিজ ডাই অক্সাইড থেকে যিনি প্রথম কাঁচ আবিষ্কার করে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন তিনিও মুসলিম বৈজ্ঞানিক অাল রাজী।
তিনি একদিকে যেমন ছিলেন ধর্মীয় পণ্ডিত তেমন করে অন্যদিকে ছিলেন গণিতজ্ঞ ও চিকিৎসা বিশারদ। সোহাগা, পারদ, গন্ধক, আর্সেনিক ও সালমিয়াক নিয়ে তার লেখা গবেষণা উল্লেখযোগ্য। পৃথিবীতে প্রথম পানি জমিয়ে বরফ তৈরি তারই অক্ষয় কীর্তি। এর পরেই ইউরোপ বরফ তৈরির কারখানা তৈরি করেছিলেন।
এছাড়া গুটিবসন্ত আবিষ্কারকও বলা হয় তাঁকে।

৭। অাল অাসমাঈ (৭৪০-৮২৮):
আজকের বিশ্বে বিজ্ঞানের যে বিশেষ শাখা নিয়ে তুমুল বিতর্ক সেই বিবর্তনবাদ এবং বিবর্তনবাদের জনক বলে যে চার্লস ডারউইনের কথা তিনি উল্লেখ করেছেন পশু-পাখি, লতা-পাতা নিয়ে ডারউইনের আগেও যিনি কাজ করে গেছেন তিনিও মুসলিম বৈজ্ঞানিক। যার নাম আল আসমাঈ। বর্তমান কোন মানুষ তার লেখা সে সময়ের গবেষণামূলক বইকে অস্বীকার করতে পারবেন না।

৮। ওমর খৈয়াম (১০১৯-১১৩৫):
এনালিটিক্যাল জ্যামিতির জনক ছিলেন তিনি। তাঁকে পৃথিবীখ্যাত গণিত এবং চিকিৎসা বিশারদও বলা হয়।

৯। ভূগোল:
অাল বেরুনি ছিলেন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ভূগোলবিদ। এছাড়াও প্রথম ভূ-মানচিত্র এঁকেছিলেন যারা তারা সকলেই মুসলিম ছিলেন। ৬৯ জন মুসলিম ভূগোলবিদ পৃথিবীর প্রথম যে মানচিত্র এঁকেছিলেন তা আজো এক পরম বিস্ময়! এই মানচিত্রের নাম-‘সুরাতুল আরদ’ যার অর্থ হচ্ছে বিশ্ব আকৃতি।

১০। কম্পাস যন্ত্রের যিনি আবিষ্কারক তিনিও মুসলিম ছিলেন, যার নাম- ইবনে আহমদ। এছাড়াও অঙ্কনে ব্যবহৃত কম্পাসের উদ্ভাবক হলেন – আল-কুহি

১১। পানির গভীরতা এবং স্রোত মাপার যন্ত্রও মুসলিম বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার করেছিলেন- যার নাম – আব্দুল মজিদ।

১২। আর প্রাচীন মুসলিম বৈজ্ঞানিক, হাসান, আহমদ, মুহাম্মদ সম্মিলিত ভাবে ৮৬০ সালে বিজ্ঞানের একশত রকমের যন্ত্র তৈরির নিয়ম ও ব্যবহার প্রণালী এবং তার প্রয়োজন নিয়ে বই লিখে রেখে গেছেন।

১৩। ভূতত্ত্ব সম্পর্কে বিখ্যাত বই ‘মুজাম আল উবাদা’ লেখক হচ্ছেন মুসলিম- ইয়াকুব ইবনে আব্দুল্লাহ।

১৪। তুলা থেকে প্রথম তুলট কাগজ আবিষ্কার করেন আরেক মুসলিম আবিষ্কারক- ইউসুফ ইবনে উমার। এই আবিষ্কারের মাত্র ২ বছর পরে বাগদাদের কাগজের কারখানা তৈরি করা হয়েছিল।

১৫। হৃদযন্ত্রে রক্ত চলাচল আবিষ্কারক – ইবনুল নাফিস
১৬। আলোক বিজ্ঞানের জনক – ইবনে আল-হাইছাম
১৭। টলেমির মতবাদ ভ্রান্ত প্রমাণকারী – আল-বাত্তানি
১৮। ত্রিকোণমিতির জনক – আবুল ওয়াফা
১৯। স্টাটিক্সের প্রতিষ্ঠাতা -ছাবেত ইবনে কোরা
২০। পৃথিবীর আকার ও আয়তন নির্ধারণকারী – অাবু মুসা
২১। মিল্কিওয়ের গঠন শনাক্তকারী – নাসিরুদ্দিন তুসি
২২। এলজাব্রায় প্রথম উচ্চতর পাওয়ার ব্যবহারকারী -আবু কামিল)দ
২৩। ল’ অব মোশনের পথ প্রদর্শক – ইবনে বাজ্জাহ
২৪। এরিস্টোটলের দর্শন উদ্ধারকারী – ইবনে রুশদ
২৫। ঘড়ির পেন্ডুলাম আবিষ্কারক – ইবনে ইউনূস
২৬। পৃথিবীর ব্যাস নির্ণয়কারী – আল-ফরগানি
২৭। পৃথিবীর প্রথম নির্ভুল মানচিত্র অঙ্কনকারী – আল-ইদ্রিসী
২৮। বিশ্বের প্রথম স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের আবিষ্কারক – আল-জাজারি
২৯। সূর্যের সর্বোচ্চ উচ্চতার গতি প্রমাণকারী – আল-জারকালি

৩০। বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের অগ্রদূত – ইবনে আল-শাতির
৩১। ভূগোলে বিশ্বকোষ প্রণেতা – আল-বাকরি
৩২। প্ল্যানেটারি কম্পিউটার আবিষ্কারক – আল-কাশি
৩৩। বীজগণিতের প্রতীক উদ্ভাবক -আল-কালাসাদি
৩৪। মানবজাতির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস প্রণেতা – আবুল ফিদা
৩৫। বিশ্ববিখ্যাত পরিব্রাজক – ইবনে বতুতা।

জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখা-প্রশাখায় মুসলিম মনীষীদের অবদান অন্ধকার আকাশে পূর্ণিমার চন্দ্রের মতো বিরাজমান। মানব সমাজের প্রধান প্রধান কাজ মুসলমানগণ সমাধান করেছেন।বর্তমান বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক মুসলমানদের নিকট শতদিক দিয়ে ঋণী।কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে,আজ মুসলমান সম্প্রদায় নানারূপ নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হচ্ছে।আল্লাহ আমাদের সবাইকে ভালোভাবে জীবন যাপন করার তেীফিক দান করেন।আমিন।