কবিতার আধুনিকতা কবিতার উত্তরাধুনিকতা

প্রকাশিত: ১১:২০ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১০, ২০১৯

কবিতার আধুনিকতা কবিতার উত্তরাধুনিকতা

শিকদার মুহাম্মদ কিব্রিয়াহ

প্রথা আমরা ভাঙবোই। কীভাবে? জবাবটি যেভাবেই হোক—কোন একটি পদ্ধতির কথা এসে যাবেই। পদ্ধতি মানেই কোন একটি প্রথার অনুসরণ। মানে প্রথাবদ্ধতা। প্রকৃতপক্ষে, কোন একটি প্রথাকে ভাঙতে হলে অন্য একটি প্রথার মাধ্যমেই তা করতে হয়। সেটি বিক্ষিপ্ত, সংগঠিত বা সংহত যা-ই হোক। এটিই স্বাভাবিক। তবে অধিকতর আধুনিক, উন্নত, যুগোপযুগী বা কল্যাণধর্মী প্রথা সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই প্রচলিত প্রথাকে ভাঙ্গার চেষ্টা চলে থাকে।এভাবেই চলে প্রথাভঙ্গের পালা। এটিই প্রগতি। এটিই ক্রমবিকাশের গতিধারা। তবে কথা হচ্ছে, প্রচলিত প্রথার উৎখাতের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিতব্য প্রথা যদি তুলনামূলকভাবে শ্রেষ্ট বলে বিবেচিত না হয়, তবে তো প্রচলিত প্রথাকে ভাঙ্গার কোন যৌক্তিকতা থাকে না। আবার প্রথাভাঙ্গার প্রক্রিয়ায় যদি অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে প’ড়ে কিংবা ঝুঁকির মুখে প’ড়ে, তবে তো সেটি হবে আত্মঘাতী। সেজন্যেই প্রথাভাঙ্গা বা প্রথাবিরোধিতার ক্ষেত্রে প্রয়োজন মুক্তবুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা-চেতনার আলোকে উদ্ভাবিত নীতিমালা কিংবা মূল্যবোধের সতর্ক ও বিচক্ষণ প্রয়োগ। না, এটা রক্ষণশীলতার রক্ষাকবচ নয়; নয় পেছন ফেরার নীতি-কৌশল বরং এটা প্রকৃত প্রগতির শুভধর্মী প্রায়োগিকতা।
কবিতার স্বরূপ কী? কবিতা অধিবিদ্যা নয়, নয় গণিত, বিজ্ঞান, ইতিহাস বা এমন কোন বিষয়- যার ক্ষেত্রে কোন নিয়ম-সূত্র আক্ষরিক অর্থেই প্রযুক্ত হতে পারে। ব্যাকরণ বা অধিবিদ্যা না-ই থাকলো, তাই বলে কবিতার কোন দর্শনও থাকবে না, থাকবে না কোন পরিচিতি—এমনটি নিশ্চয়ই নয়। দর্শন অবশ্যই আছে। সবকিছুরই একটা দর্শন, বোধ বা দৃষ্টিভঙ্গি থাকে। স্পষ্ট বা অস্পষ্ট। প্রকট বা প্রতীকী। কবিতারও আছে। কবিতার সংজ্ঞা কী? তাৎক্ষণিকভাবে জবাবদান চাট্টিখানি কথা নয়। যেমনটি সহজ নয় দর্শনের সংজ্ঞা প্রদানের ক্ষেত্রেও। দর্শনের ক্ষেত্রে যেমন বিভিন্ন বোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি ক্রিয়াশীল থাকে, যার প্রেক্ষাপটে সার্বজনীন বা স্বতঃসিদ্ধ-স্বীকৃত কোন সংজ্ঞা আজ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠা পেতে পারে নি। এভাবে কবিতারও। কবিতা ও দর্শন যদিও একই বিষয় নয়, তবুও এদের মাঝে কিন্তু মিল আছে অনেক। যেমন, উভয়টির গতি হচ্ছে উপলব্ধির পথে—সত্য ও সুন্দরের পরমার্থিক অনুসন্ধানে। তবে এ-ই পরমসত্যের স্বরূপ, উপলব্ধি বা উপলব্ধির পদ্ধতির ক্ষেত্রে দার্শনিকদের যেমন আছে বিভিন্ন বোধ ও দৃষ্টিভঙ্গিজাত সিদ্ধান্ত; তেমনি কবিতার ক্ষেত্রেও কবিদের আছে নিজস্ব বোধ বা উপলব্ধিজাত দৃষ্টিভঙ্গি ও সিদ্ধান্ত।
ভিন্ন মত ও পথের এত সমাবেশ থাকা সত্ত্বেও একজন বুদ্ধিবাদী দার্শনিক একজন অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিককে কিংবা অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিক বুদ্ধিবাদী দার্শনিককে অস্বীকার করতে পারেন না—বড়জোর তাঁর সমীক্ষার পদ্ধতি ও সমীক্ষিত সিদ্ধান্তের সাথে ভিন্নমত পোষণ করতে পারেন কিন্তু ‘এটি দর্শন নয়’ বলে উড়িয়ে দিতে পারেন না। কেননা, দর্শনচর্চার ক্ষেত্রে এমনকিছু নিয়ম আছে; যেগুলো স্বতঃসিদ্ধ। একইভাবে বলা যায়, কবিতারও কিছু নিয়ম-পদ্ধতি ও গঠনগত পরিচিতি আছে। যদিও এগুলো দর্শন বা অধিবিদ্যার মত আক্ষরিক অর্থে অলঙ্ঘনীয় নয়, তবুও কবিতাকে একেবারেই বিধিহীন বলার অবকাশ নেই। এ বিধিহীনতাকে কবি’র স্বাধীনতা হিসেবে অভিহিত করাও অসংগত। কারণ, স্বাধীনতার মানে স্বেচ্ছাচারিতা নয়। [চলবে]