লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের প্রথম ‘টাকা ডিনমিনেটেড বন্ড

প্রকাশিত: ১১:২৯ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১১, ২০১৯

লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের প্রথম ‘টাকা ডিনমিনেটেড বন্ড

লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের প্রথম ‘টাকা ডিনমিনেটেড বন্ড’, যার নাম দেয়া হয়েছে ‘বাংলা বন্ড’। এই বন্ডের মাধ্যমে প্রায় ১০০ কোটি মার্কিন ডলার বাজার থেকে তোলা হবে।

সোমবার লন্ডন স্টক মার্কেটে স্থানীয় সময় সকাল ৭:৫৫টায় আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলা টাকা বন্ডকে তালিকাভুক্ত করার অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।

রিং দ্যা বেল নামের এই অনুষ্ঠান উদ্বোধন করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আজকে বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক দিন। বাংলা বন্ড চালু বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশের একটি বড় পদক্ষেপ। এই বন্ড চালুর মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রবাসী বিনিয়োগ আরো সহজতর হবে।’

তিনি বাংলা বন্ড চালুর পেছনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবদান। এমনকি বাংলা বন্ড নামকরণটিও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া বলেও জানান তিনি।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি খাত বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, আইএফসি এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট নেনা স্টেলকোভিক, ব্রিটেনস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনার সাঈদা মুনা তাসনীম, বিডার চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মনোয়ার আহমেদ এবং আইএফসি ডিরেক্টররা।

এরপর লন্ডন সময় সকাল সাড়ে ৯টায় লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ সেমিনার রুমে এক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে জানান, ‘প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিনিয়োগে উৎসাহ দেয়ার জন্য লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে চালু হয়েছে ‘বাংলা টাকা বন্ড’। এটি হবে একটি টাকা বন্ড। এই বন্ডের আকার হবে ১০০ কোটি ডলার। কিন্তু প্রাথমিকভাবে বাজার থেকে তোলা হবে ১ কোটি মার্কিন ডলার বা ৮৪ কোটি টাকা। প্রবাসীরা ডলারে এই বন্ড কিনলেও প্রথমবারের মতো তা টাকায় রূপান্তর করে দেশের বিভিন্ন অবকাঠামোগত প্রকল্পে বিনিয়োগ করা হবে। বিশ্বব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) হবে এই বন্ডের ইস্যু ম্যানেজার।’

তিনি বলেন, ‘এটির মাধ্যমে আমাদের দীর্ঘ মেয়াদী অর্থায়নের সম্ভাবনার পথ চলার একটি ধাপ শুরু হলো। যা আমাদেরকে ২০৪১ এর স্বপ্ন, বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বিনির্মাণে সহায়তা করবে।’

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এই প্রথম বাংলাদেশের টাকা কোনো আন্তর্জাতিক ফাইন্যান্সিয়াল মার্কেটের সঙ্গে সংযুক্ত হতে যাচ্ছে। টাকা লন্ডন স্টক মার্কেটে লেনদেন হবে। যে কেউ এই বন্ড কিনতে পারবে। ডলার দিয়ে এই বন্ড কিনতে হবে। সেই ডলার টাকায় কনভার্ট হয়ে তা বিনিয়োগ করা হবে। আইএফসি বাংলাদেশে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ করেছে। এই ১ বিলিয়ন ডলার ‘টাকা বন্ড’ ছাড়ার মাধ্যমে তাদের বিনিয়োগ আরো বাড়বে।’

বিষয়টি নিয়ে আইএফসির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে প্রবাসীদের বিনিয়োগে উৎসাহ দেয়ার জন্য এই বন্ড চালু করা হয়েছে। বন্ডের অর্থ ডলার থেকে টাকায় রূপান্তরের পর বাংলাদেশে বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ করবে আইএফসি।’

এরই অংশ হিসেবে চালুকৃত বন্ডের মাধ্যমে গঠিত এ তহবিল বাংলাদেশের অন্যতম প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ও পানীয় উৎপাদনকারী এবং অন্যতম কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী  ‘প্রাণ গ্রুপ’কে দেয়া হবে। বাংলাদেশে এই প্রথম কোনো প্রতিষ্ঠান বিদেশি কোনো পুঁজিবাজার থেকে তহবিল সংগ্রহ করছে।

লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ আজ বাংলা বন্ডকে তাদের মূল বাজারে অন্তর্ভুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে। প্রাথমিকভাবে এই বন্ডের মেয়াদ হবে তিন বছর। পরে তা বাড়িয়ে ৫ বছর এবং সর্বোচ্চ ১০ বছর করা হতে পারে।

এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ভারতের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, প্রথমে তিন বছর মেয়াদী রুপি বন্ড ছাড়া হয়েছিল। পরে মেয়াদ বাড়িয়ে ৫ বছর করা হয়। এখন তা বেড়ে হয়েছে ১০ বছর। প্রবাসী ভারতীয়রা এই বন্ডে বিপুল হারে বিনিয়োগ করেছেন। প্রবাসে বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী বাংলাদেশিরা বাংলা বন্ডে বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

বাংলাদেশ ২০১১ সাল থেকে এ ধরনের বন্ড ছাড়ার পরিকল্পনার কথা বলে আসছিল। ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক বৈঠকে আইএফসির কর্মকর্তাদের সঙ্গে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের এ বিষয়ে আলোচনাও হয়েছিল। বাংলাদেশ সরকার তখনই এ বিষয়ে প্রাথমিক সম্মতি দিয়েছিল।

এরপর আইএফসি বাংলাদেশ সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠায়। তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে অর্থমন্ত্রণালয় একই বছর ৪ অক্টোবর এক চিঠিতে ‘বাংলা বন্ড’ ছাড়ার অনুমোদনের বিষয়টি জানায়।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) যাচাই কমিটির অনুমোদন সাপেক্ষে আইএফসির ওই প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়।

ওই কমিটির কাছে প্রাণ গ্রুপের পক্ষে এ বন্ড ছাড়ার প্রস্তাব করে আইএফসি। চলতি বছরের এপ্রিলে আইএফসির প্রস্তাবে সাড়া দেয় বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ।

এই বন্ডের মাধ্যমে বাজার থেকে যে অর্থ পাওয়া যাবে, সেখান থেকে প্রাণ অ‌্যাগ্রো ও নাটোর অ‌্যাগ্রো ৮০ কোটি টাকা করে ঋণ পাবে। সুদের হার নির্ধারণ করা হয়েছে সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এ ঋণ সমান কিস্তিতে তিন ও পাঁচ বছরে তাদের পরিশোধ করতে হবে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ