সভ্যতা বলতে কী বোঝায়?

প্রকাশিত: ৬:৫৮ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৪, ২০১৯

সাদেক আহমদ শিকদার:সভ্যতা’ শব্দটি এসেছে ‘সভ্য’ শব্দ থেকে। ‘সভ্য’ অর্থ ভদ্র, শিষ্ট, মার্জিত, সুরুচিসম্পন্ন, ভালো (civilian – polite – courteous – mannerly) ইত্যাদি। ভালোটাকে গ্রহণ করে মন্দটাকে বর্জন করে ধীরে ধীরে গড়ে উঠে সভ্যতা (Civilization)।
পৃথিবীর অনাদিকাল থেকেই ভালো এবং মন্দ এই দু’টি শব্দ চলে আসছে, সেইসাথে চলছে এই ভালো এবং মন্দের দ্বন্দ্ব। কোনটি ভালো, কোনটি মন্দ? – এ যেন এক অমীমাংসিত প্রশ্ন। কারণ ভালো এবং মন্দের ধারণা একটি আপেক্ষিক বিষয়। আপনার কাছে যেটা ভালো আমার কাছে সেটা মন্দ, তেমনিভাবে আপনার কাছে যেটা মন্দ আমার কাছে সেটাই ভালো। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, কারো কাছে লাল রং খুব পছন্দ আবার কারো কাছে সেই লাল রং-ই খুব অপছন্দের। তেমনিভাবে কেউ হয়তো ঝাল পছন্দ করেন, অন্য একজন হয়তো ঝাল মোটেই পছন্দ করেন না তার কাছে আবার মিষ্টি পছন্দ। পৃথিবীতে কেউ যে তিতা পছন্দ করতে পারে এটা হয়তো কেউ ভাবতেই পারবেন না, কিন্তু এটাও পৃথিবীতে আছে। সুতরাং ভালো ও মন্দের দ্বন্দ্ব, এই শব্দ দুইটির ব্যবহার অনাদিকাল থেকেই চলে আসছে। আসলে কোনটি প্রকৃতপক্ষে ভালো আর কোনটি প্রকৃতপক্ষে মন্দ আমাদের মতো কম বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের পক্ষে বলা সম্ভব নয়। কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ সেটা যদি জনগণের উপর ছেড়ে দেওয়া হয় তাহলে এই ভালো-মন্দের দ্বন্দ্ব, সংঘাত কোনো দিনই শেষ হবে না। এজন্যই কোনটি ভালো, কোনটা মন্দ এটা বলার জন্য একটা চূড়ান্ত জায়গা থাকতেই হবে এবং সবাইকে সেই চূড়ান্ত জায়গাটার সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হবে, এটাই বাস্তবতা। যদি সেটা না থাকে তাহলে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, পৃথিবী যাই বলি না কেন কোথাও কোনোদিনই কোনো শৃঙ্খলা আসবে না, শান্তি আসবে না, কোনো প্রশ্নেরই সমাধান পাওয়া যাবে না।
প্রশ্ন হলো, কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ এটা আমাদেরকে কে বলে দিবে? কার বলা ‘ভালো’টাকে আমারা সবাই চূড়ান্তভাবে ‘ভালো’ বলে মেনে নিব? কার ‘মন্দ’ বলাকে আমরা চূড়ান্তভাবে ‘মন্দ’ বলে মেনে নিব? অর্থাৎ ন্যায় অন্যায়ের মানদণ্ড কোনটি হবে?
আমাদের মঙ্গলের জন্য, আমাদের সুখের জন্য, শান্তির জন্য, মানবজাতির কল্যাণ ও প্রগতির জন্য, মানবজাতি ও পৃথিবীকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার জন্য ভালো-মন্দের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য একটি কর্তৃপক্ষকে মানতেই হবে। সুতরাং যে কোনো সংবিধান বা জীবন-ব্যবস্থাতেই শেষ সিদ্ধান্ত নেবার জন্য একটি স্থান থাকতে হয়। অন্যথায় মানবজীবনের যে কোনো সমস্যার সমাধানের জন্য পরামর্শ আলোচনায় বসলে তা অনন্তকাল চলতে থাকবে। এই শেষ সিদ্ধান্ত নেবার ও দেবার কর্তৃত্ব ও অধিকারই হচ্ছে সার্বভৌমত্ব (Sovereignty – ইলাহ)। এই সার্বভৌমত্ব হতে পারে মাত্র দুই প্রকার। যিনি সৃষ্টি করেছেন তাঁর, অর্থাৎ স্রষ্টার; কিম্বা সৃষ্টের অর্থাৎ মানুষের। বর্তমান পৃথিবীময় যে ‘সভ্যতা’ চলছে তা হচ্ছে পাশ্চাত্যের ইহুদি খ্রিষ্টানদের তৈরি একটি ‘সভ্যতা’। এখানে ইহুদি-খ্রিষ্টানরা যেটাকে ভালো ও ন্যায় বলেছে সেটাই ভালো ও ন্যায়, ইহুদি খ্রিষ্টানরা যেটাকে মন্দ বা অন্যায় বলেছে সেটাই মন্দ বা অন্যায়। অর্থাৎ ইহুদি-খ্রিষ্টানদের ভালোটাকে গ্রহণ করে, তাদের মন্দ বলাটাকে বর্জন করে যে সভ্যতা গড়ে উঠেছে অর্থাৎ ইহুদি-খ্রিষ্টানদের ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত ক্ষমতাধর কর্তৃপক্ষ (ইলাহ) মেনে নিয়ে যে সভ্যতা গড়ে উঠেছে সেটাই ইহুদি-খ্রিষ্টান বস্তুবাদী ‘সভ্যতা’। যেমন- ইহুদি-খ্রিষ্টান ‘সভ্যতা’ বলেছে আল্লাহর বিধান চলবে না, বিধান চলবে মানুষের; স্রষ্টা নয় – জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস, তারা বলেছে মানবজাতির অর্থনীতি হবে সুদভিত্তিক, সুদই সর্বশ্রেষ্ঠ ও আধুনিক পদ্ধতি, যদিও আল্লাহ ও তাঁর রসুল এই সুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন (সুরা বাকারা ২৭৯)। অপরদিকে ইহুদি-খ্রিষ্টানরা বলেছে জীবন-ব্যবস্থাগুলির মধ্যে ইসলাম মন্দ, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হিসাবে যাকাত ব্যবস্থা মন্দ ইত্যাদি। ইহুদি-খ্রিষ্টানদের তৈরি এই সভ্যতাই আজ সমস্ত পৃথিবী আচ্ছন্ন করে আছে। পৃথিবীর একজন মানুষ নেই, এক ইঞ্চি মাটি নেই, এক ইঞ্চি পানি নেই যেটা এই সভ্যতার বাইরে। অপরপক্ষে ইসলাম হচ্ছে আরেকটি সভ্যতা। আল্লাহ, আল্লাহর রসুল যেটাকে ভালো বলেছেন, ন্যায় বলেছেন সেটাই ভালো, সেটাই ন্যায়, আর আল্লাহ এবং আল্লাহর রসুল যেটাকে মন্দ বা অন্যায় বলেছেন সেটাই মন্দ বা অন্যায়। অর্থাৎ ন্যায় অন্যায়ের মাপকাঠি একমাত্র আল্লাহকে মেনে নিয়ে, আল্লাহকে একমাত্র সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক হিসাবে মেনে নিয়ে যে সভ্যতা গড়ে উঠে সেটাই ইসলামী সভ্যতা। এই সভ্যতা আজ পৃথিবীর কোথাও নেই। অথচ এক সময় এই সভ্যতা মানবজাতিকে এমন অতুলনীয় ন্যায়, শান্তি ও নিরাপত্তা উপহার দিয়েছিল, আজ যেটা কল্পনারও বাইরে। কাউকে বললেও উত্তরে বলে, সেটা কি আজ সম্ভব?

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ