অযথা আতঙ্ক, কিংবা বিষয়টিকে হালকা চালে দেখা, করোনার ক্ষেত্রে দু’টিই সমান বিপজ্জনক!

প্রকাশিত: ১০:২২ অপরাহ্ণ, মার্চ ১৪, ২০২০

অযথা আতঙ্ক, কিংবা বিষয়টিকে হালকা চালে দেখা, করোনার ক্ষেত্রে দু’টিই সমান বিপজ্জনক!
চিন-ইরান-দক্ষিণ কোরিয়া-জাপানের সংক্রমণ চিত্রে স্পষ্ট, বাড়ি অথবা ছোট কোনও জায়গা থেকেই উৎসারিত কোভিড-১৯। মানুষ যাতে আরও আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে না পড়ে তার জন্য ‘হু’ করোনাভাইরাস সংক্রমণকে প্যানডেমিক (বিশ্বত্রাস) বলতে রাজি হচ্ছিল না।
করোনাভাইরাস
কোনও রকম মাস্ক ব্যবহার করে নয়, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগীকে বাইরের ছোঁয়াচ থেকে আগলাতে পারলেই ভাইরাসটিকে সামলানো সম্ভব। লিখছেন মৃন্ময় চন্দ
মানুষ যাতে আরও আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে না পড়ে তার জন্য ‘হু’ করোনাভাইরাস সংক্রমণকে প্যানডেমিক (বিশ্বত্রাস) বলতে রাজি হচ্ছিল না। বরঞ্চ ‘ইনফোডেমিক’ তকমায় কোভিড-১৯কে ভূষিত করেছিল। কারণ নভেল করোনাভাইরাসের তুলনায় বহু গুণ দ্রুতগতিতে গুজবের দাবানল ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষত কাকে কান নিয়ে যাওয়ার দেশ ভারতে। মোবাইল ফোনের বিরক্তিকর হ্যালো টিউনের ৩০ সেকেন্ডব্যাপী বকবকে মানুষ করোনার মতো একটি মারণ-ভাইরাসকে বড্ড হালকা-চালে দেখতে শুরু করছেন। অথবা কেউ কেউ অসাড় সাবধানবাণীতে হয়ে পড়ছেন অতিরিক্ত আশঙ্কিত। দোকানে লাইন লাগাচ্ছেন মাস্ক বা স্যানিটাইজার কিনতে। মাস্কের কালোবাজারি চলছে, স্যানিটাইজার অমিল। ‘হু’ এবং সেন্টার ফর ডিজিস কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন-এর বিশেষজ্ঞরা বারেবারে সতর্ক করছেন, করোনা সংক্রমণে সুস্থ মানুষের সার্জিকাল বা এন-৯৫, কোনও মাস্কেরই কোনও উপযোগিতা নেই। এখনও পর্যন্ত বিজ্ঞানীরাই নিশ্চিত নন, হাঁচি-কাশি (ড্রপলেট) বা বায়ুবাহিত (এরোসল) হয়েই কোভিড-১৯ ছড়াচ্ছে কিনা! সার্জিকাল বা এন-৯৫ মাস্ক নভেল-করোনাভাইরাস আটকাতে অপারগ। পেশাদারদেরও আধ ঘণ্টার বেশি এন-৯৫ মাস্ক পরিধান নিষিদ্ধ। সার্জিকাল মাস্ক বা এন-৯৫ মাস্ক রোগী অথবা স্বাস্থ্যকর্মীরাই কেবল পরবেন। রোগী পরিধান করবেন সুস্থ মানুষ যাতে তাঁর থেকে সংক্রমিত না হন। স্বাস্থ্যকর্মী নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে ও তাঁর শরীরের অন্য কোনও সংক্রমণ যাতে নাক-মুখ গলে নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে করোনা রোগীর শরীরে ঢুকে বিপত্তি না বাড়ায়, তার জন্য পরবেন।
চিন-ইরান-দক্ষিণ কোরিয়া-জাপানের সংক্রমণ চিত্রে স্পষ্ট, বাড়ি অথবা ছোট কোনও জায়গা থেকেই উৎসারিত কোভিড-১৯। সে ক্ষেত্রে ‘ক্লোজ কন্ট্যাক্ট’ বা ছোঁয়াছুঁয়ির তত্ত্বই কেবল ধোপে টেকে। সেই কারণে উহান থেকে ইটালি থেকে আমেরিকা — সর্বত্রই ‘কোয়ারেনটাইন’ বা রোগী ও তার পরিবারকে বাধ্যতামূলক আলাদা রাখা হচ্ছে। চিন যে কাজটা খুব সহজে করে ‘হু’র ভূয়সী প্রশংসা কুড়িয়েছে, অন্য কোনও দেশের পক্ষে তা করা মুশকিলই নয়, না-মুমকিনও বটে। রোজগারের ধান্ধায় ভারতে প্রতিটা মানুষকে বাইরে বেরোতে হয়। সরকার মধুর বাণীতে করোনা রোগীকে গৃহবন্দি থাকার পরামর্শ দিলেও তাকে পেটের টানে কর্মস্থলে যেতেই হবে।
নভেল-করোনাভাইরাসের ‘রিপ্রোডাকশন নাম্বার’ ২.৫, অর্থাৎ ইনফ্লুয়েঞ্জার তুলনায় দেড় গুণ বেশি প্রবণতা বহির্জগতে অক্লেশে ছড়িয়ে পড়ার। সাধারণ ভাইরাল জ্বরেই একসঙ্গে বহু মানুষ ঋতু পরিবর্তনের সময় কাবু হন। সেই ভাইরাল জ্বরের তুলনায় কয়েক গুণ দ্রুত গতিতে যদি করোনা ছড়ায় তাতে কী বিপুল সংখ্যক মানুষ একলপ্তে আক্রান্ত হতে পারেন তা সহজেই অনুমেয়। এই ‘রিপ্রোডাকশন নাম্বার’-এর দৌলতে বলা সম্ভব একজন মুখ্য করোনা রোগী থেকে আরও কতজন গৌণ করোনা রোগীর সংক্রমণ অবশ্যম্ভাবী। সেই হিসেবে সারা বিশ্বে ৬০% মানুষ শিকার হতে চলেছেন কোভিড-১৯ সংক্রমণের। শিশুদের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার হদিশ অমিল এখনও। স্রেফ ‘রিপ্রোডাকশন নাম্বার’ কমার কারণেই করোনার কামড় যত দিন যাবে ক্ষীণ হয়ে আসবে। ভাইরাসটিও প্রাকৃতিক নিয়মেই হয়ে পড়বে হীনবল। তার ‘ভিরুলেন্স’ বা ক্ষতির প্রাবল্য কালের নিয়মেই স্তিমিত হয়ে পড়বে।
ডিসেম্বরে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকে ভাইরাসটির মিউটেশনও সমান তালে চলছে। মিউটেশনের ফলে করোনা ভাইরাসের ল্যাজা-মুড়ো থেকে ইতিমধ্যেই ৩৫০টা টুকরো বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গেছে। মানুষের চুলের সহস্রাংশে একটা হিলহিলে এন সিওভি-১৯র আরএনএ বা প্রাণভোমরা গঠিত। মিউটেশনের সময় ইনসার্শন/ডিলিশন/ডুপ্লিকেশনের দৌলতে কাল্পনিক সুতোর মত আরএনএ ভেঙেচুরে ছত্রখান হয়ে যায়। ধড়-মুণ্ডু আলাদা হয়ে গেলে প্রাণ বাঁচানোই দুষ্কর। সে তখন আর মানুষের শরীরে ঢুকে কী সর্বনাশই বা করবে! চিনের মৃত্যুহার বা করোনা সংক্রমণে ভাঁটার টানের সেটাও অন্যতম কারণ। মানুষ থেকে মানুষের সংক্রমণ-কালেই ভাইরাসটির অবিরাম মিউটেশন ঘটতে থাকে। করোনা ভাইরাস দিব্যি ঘুমিয়ে ছিল প্যাঙ্গোলিন বা কালাজের দেহে। হঠাৎ প্রকৃতির সুড়সুড়িতে যে মুহূর্তে তার প্রাণভোমরা অর্থাৎ আরএনএ-এর ‘সিকোয়েন্স’ বা সজ্জাক্রমের পরিবর্তন ঘটল, ঘুম ভেঙে সে লাফ দিয়ে ঢুকে পড়ল মানুষের শরীরে। দক্ষযজ্ঞ বাঁধল। ভেঙে গেল ‘স্পেসিস ব্যারিয়ার’। প্যাঙ্গোলিন বা কালাজের শরীরে নয়, জগতটাকে এবার নভেল-করোনাভাইরাস দেখবে মানুষের চোখ দিয়ে। মানুষের শরীর চেনে না এই অজানা অমিত-পরাক্রমী শত্রুকে। জানে না তার রণকৌশল।
শরীর প্রথম দিকে তার অযুত সৈন্যসামন্ত (অ্যান্টিবডি) নামিয়েও লড়াই করতে পারল না। মার খেতে খেতে প্রাকৃতিক নিয়মেই রুখে দাঁড়াল এক সময়। ধীরে ধীরে অনাক্রম্যতা তৈরি হল। জীবনশৈলীর পরিবর্তন, খাওয়া দাওয়ায় অ্যান্টিবডি বা সৈন্যদল তাগড়াই হল। বীরবিক্রমে করোনাভাইরাসকে প্রতিহত করতে নেমে পড়ল মানবশরীর। রোগের তীব্রতা, মৃত্যুহার কমতে লাগল। কিন্তু শত্রুকে চিনতে, তার বিরুদ্ধে ঢাল তরোয়াল নিয়ে সেজেগুজে নামতেই চলে গেছে মাস তিনেক। সারা পৃথিবীতেই তত দিনে মারা পড়েছেন কয়েক হাজার অসহায় মানুষ। অনুসিদ্ধান্ত : মিউটেশন নয়, ভাইরাসটি তখনই গণবিধ্বংসী যখন তার প্রাণভোমরা আরএনএ-র ‘সিকোয়েন্সিং’ বা সজ্জাক্রমের অদলবদল ঘটে, মাথা পিছলে লেজের দিকে সরে যায়।
চিন জৈব-সন্ত্রাসে বা গণ-বিধ্বংসী জীবাণু অস্ত্র তৈরি করবে বলে নাকি নভেল করোনাভাইরাসকে ল্যাবরেটরির অন্দরে গোপনে লালনপালন করছিল। একেবারেই ভিত্তিহীন, কারণ অনেক কম খরচে গণবিধ্বংসী মারণাস্ত্র তৈরি এ যুগে জলভাত। একটি ভয়ঙ্কর খুনি ভাইরাস সযত্নে পুষতে দরকার ‘বায়োসেফটি লেভেল-ফোর’ ল্যাবরেটরি, সারা পৃথিবীতেই যার সংখ্যা হাতে-গোনা। আর বড্ড ছটফটে, ঘন ঘন স্বয়ংক্রিয় মিউটেশনে অভ্যস্ত নভেল করোনাভাইরাস। যত মিউটেশন ততই সে দুর্বল। সেই অকর্মা করোনাভাইরাসের অস্ত্র হিসাবে কোনওই উপযোগিতা নেই! গবেষণাগারে প্রতিপালনের পরে মানুষের শরীরে তার ভূমিকা কী হতে পারে তা-ও কিন্তু অজ্ঞাতই ছিল। প্রাণঘাতী এন সিওভি-১৯ বাঁদর বা ইঁদুরের শরীরে কোনও তরঙ্গই তুলতে পারেনি। তাই বাঁদর/ইঁদুরের ওপর প্রতিষেধক তৈরির পরীক্ষানিরীক্ষা বাতুলতা। হুবহু মানুষের শরীরের অনুকরণে এসিই-টু রিসেপ্টর বানাতে হলে ট্রান্সজেনিক বাঁদর/ইঁদুর ল্যাবরেটরিতে তৈরি করতে হবে। তা যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ ও খরচসাপেক্ষও বটে। সেই কারণে কোভিড-১৯-এর প্রতিষেধক/ওষুধের ভবিষ্যতও খুব উজ্জ্বল নয়। আদা-জল খেয়ে বা মুরগি না চেখে করোনা নিরাময় সম্ভব নয়। পাকস্থলীর অ্যাসিডেও করোনা নিকেশ অসম্ভব।
মানবশরীরের আপাদমস্তক সুস্থ কোষের ‘এসিই-টু রিসেপ্টরকে’ নভেল করোনাভাইরাস তার সূচলো কাঁটা দিয়ে (স্পাইক প্রোটিন) আঁকড়ে ধরে ফুটো করে ঢুকে পড়ে। সুস্থ কোষটিকে ছিনতাইয়ের পরে বাধ্য করে তার পছন্দমতো চলতে। কোষটির যাবতীয় সুস্থ-স্বাভাবিক ক্রিয়াকর্মকে নিজের পক্ষে চালিত করে ত্বরিতগতিতে বংশবিস্তার চালিয়ে যায়। একের পর এক সুস্থ কোষ মারা পড়তে থাকে, করোনাভাইরাস ফেটে পড়ে অট্টহাসিতে। ‘এসিই-টু রিসেপ্টর’ মানুষের শরীরে প্রায় সর্বত্রই বিরাজমান, সংখ্যাধিক্য ফুসফুস-পাচনতন্ত্র-লিভারে। ফলে সবার প্রথম ফুসফুস বিকল হয়, তার পর পৌষ্টিকতন্ত্র ও লিভার। কোভিড-১৯-এ লিভার ফেলিওরে মৃত্যুর ঘটনাও নথিভুক্ত।

করোনা রোগী ৪.৪-৭.৫ দিনে সুস্থ মানুষকে আক্রান্ত করবেন, অন্তর্বর্তী এই সময়টি ‘সিরিয়াল মিন টাইম’ নামে পরিচিত। ইনকিউবেশন পিরিয়ড নভেল-করোনাভাইরাসের ৫-৬ দিন। উপসর্গ প্রকাশের দিন-দুয়েক আগেই কোভিড-১৯-এর সংক্রমণ সবচেয়ে বাড়ে। অর্থাৎ সঠিক অনুধাবনের আগেই একজন করোনা রোগী নিঃশব্দে আরও বহু সুস্থ মানুষকে রোগের বীজটি চারিয়ে দিয়েছেন। সার্সের ক্ষেত্রে লক্ষ্মণ প্রকাশের বহু দিন পরে সংক্রমণ ছড়াতে থাকে। রোগী তখন হাসপাতালে, যথাযথ চিকিৎসায়। ফলে ব্যাপক ভাবে জনারণ্যে সার্স কখনওই ছড়িয়ে পড়েনি। করোনাভাইরাস কোনও রোগলক্ষ্মণ ছাড়াই ছড়াবে। ১০ বা তার বেশিদিন রোগলক্ষ্মণ থাকবে। ৮০% কোভিড-১৯ রোগীর খুব সামান্য উপসর্গ থাকতে পারে আবার একদম উপসর্গহীনও হতে পারে। ১৪% গুরুতর অসুস্থ হবেন আর ৬% হবেন সঙ্কটাপন্ন। রোগলক্ষ্মণ প্রস্ফুটিত না হলে বুক বাজিয়ে সকলেই প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াবেন। প্রবল পরাক্রমে এন-সিওভিও ছড়াতে থাকবে। পশ্চিমের উন্নত দেশে শিক্ষিত সচেতন করোনাভাইরাস রোগী স্বেচ্ছায় গৃহবন্দি থাকছেন। স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে চিকিৎসা করাচ্ছেন। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় সেখানকার হাসপাতাল পূর্বাহ্ণেই প্রস্তুত নভেল করোনাভাইরাসের মত ব্যাপক সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে। বিপুল জনসংখ্যার দেশ ভারতে কোনও ব্যক্তি মানুষকে সর্বক্ষণ নজরদারি চালিয়ে ঘরবন্দি রাখা অসম্ভব। ছোঁয়াছুঁয়ি আটকাতে পারলেই কেল্লা ফতে। প্রথম দিকে, অর্থাৎ ভাইরাসটি অতি-সক্রিয় রণচণ্ডী, তখন ৭০% ক্ষেত্রে শুধু কড়া নজরদারি চালিয়ে রোগীকে বাইরের ছোঁয়াচ থেকে আগলাতে পারলেই কোভিড-১৯র মরণকামড়কে সামলে দেওয়া সম্ভব।