আজ বঙ্গবীর ওসমানীর জন্মদিন

প্রকাশিত: ১২:৫২ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১, ২০২০

আজ বঙ্গবীর ওসমানীর জন্মদিন

স্টাফ রিপোর্টার:

আজ ১লা সেপ্টেম্বর মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি বঙ্গবীর জেনারেল মোহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানীর ৯৯ তম জন্মবার্ষিকী। ১৯১৮ সালের এই দিনে খান বাহাদুর মফিজুর রহমানের ঔরসে এবং মাতা জোবেদা খাতূনের গর্র্ভে পিতার কর্মস্থল সুনামগঞ্জে জন্ম গ্র্রহন করেন। তাঁর পৈত্রিক নিবাস সিলেট জেলার ওসমানীনগর থানার থানার দয়ামীরে। ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি ছিলেন বঙ্গবীর এমএজি ওসমানী। তাইতো ৭১’সালের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বাংলার আকাশে যখন স্বাধিনতার সুর্য উদিত হয়েছিল তখন তাঁকে “বঙ্গবীর”উপাধিতে ভুষিত করা হয়েছিল। ৭০এর নির্বাচনের পর তৎকালীন পাকিস্থান সরকার তাঁকে“বাঘের বাচ্ছা” উপাধি দিয়েছিল। মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আলোচনা করতে গেলে যার নাম বিশেষভাবে উচ্চারণ করতে হয় তিনি হলেন ওসমানীনগর তথা সিটেবাসীর গর্ব বঙ্গবীর জেনারেল মোহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানী। স্বাধিনতার পর তিনি বঙ্গবীর উপাধিতে ভূষিত হলেও তাঁর মৃত্যুর ২৮ বছর ও ৯৪তম মৃত্যুবার্র্ষিকী চলে গেলেও মহান মুক্তিযুদ্ধের এ মহানায়ক আজ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় ভাবে যথাযথ স্বীকৃতি পাননি। মুক্তিযুদ্ধে অবদান রেখেছেন এমন অনেক জাতীয় নেতার জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালন করা হলেও বঙ্গবীর ওসমানীর জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী পালন তো দূরে থাক; দিন দুটোর খোঁজও অনেকেই রাখেন না। বঙ্গবীর এমএজি ওসমানীর জন্ম ও মৃত্যু দিবস ১লা সেপ্টেম্বর ও ১৬ই ফেব্রুয়ারি সরকারী ছুটির দাবী ওসমানীর স্মৃতি ধন্য ওসমানীনগরবাসীর দীর্র্ঘদিনের হলেও অদ্যাবদী তা উপেক্ষিত। মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্র্র্বাধিনায়ক বঙ্গবীর জেনারেল মোহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানীর স্মরণে ঢাকায় গড়ে উঠেছে ‘ওসমানী উদ্যান’ ও ‘ওসমানী মেমোরিয়াল হল’। সিলেট শহরে তার নামে ওসমানী শিশুপার্র্ক , হাসপাতাল, বিমান বন্দর। বঙ্গবীর ওসমানীর পিতৃভূমিতে তাঁর স্মৃতি স্মরনে ওসমানীনগর থানা। নামমাত্র তৈরী করা হয় একটি হাসপাতাল। ১৯৮৪ সালের ১৬ ফেব্র“য়ারী মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধি নায়ক বঙ্গবীর এমএজি ওসমানীর মৃত্যুর পর তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে একই বছরের ১০ এপ্রিল দয়ামীর হাইস্কুল প্রাঙ্গনে শোক সভায় বঙ্গবীর এমএজি ওসমানীর নামে ডায়বেটিকস্ সেন্টার, মাতৃমঙ্গল ৫০ শয্যার একটি হাসপাতাল তৈরীর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এ লক্ষ্যে উপজেলা পরিষদ তৎকালীন সময়ে ৫০ হাজার টাকা আর্থিক অনুদান দেয়। দয়ামীর বাজারের উত্তরে ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পশ্চিম পাশে হাসপাতাল তৈরীর জন্য ৬০ শতাংশ ভূমি নির্ধারন করা হয়। ১৯৮৪ সালের ২৬ আগষ্ট তৎকালীন এরশাদ সরকারের উপ-আঞ্চলিক সামরিক আইন প্রশাসক ব্রিগেডিয়ার এমজি রব্বানী উক্ত ভূমিতে হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন করেন। এরপর উক্ত উদ্যোগের ভাটা পড়ে। ১৯৮৮ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ব্যারিষ্টার মওদুদ আহমদ পুনরায় উক্ত স্থানে হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন করেন। কিন্তু অজানা কারনে তা চাঁপা পড়ে থাকার পর ১৯৯৫ সালে সাবেক সচিব সফিউর রহমানের নির্দেশে হাসপাতালের নির্মান কাজ শুরু হয়। প্রায় ৭ লক্ষ টাকা ব্যায়ে নির্মান কাজ শেষ হয় ১৯৯৯ সালে। কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতায় নির্মিত ভবনে তালা ঝুলেই থাকে। দীর্র্ঘদিন এ অবহেলিত থাকার পর এই স্থানে ২০০৮ সালে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সিলেট জেলা পরিষদ প্রায় ৬৫ লাখ টাকা ব্যয়ে জেনারেল আতাউল গণি ওসমানীর পৈতৃক নিবাস ওসমানীনগরের দয়ামীরে ‘ওসমানী গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর’ নির্মাণ করে। ২০০৮ সালের ২২ ডিসেম্বর নির্মাণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদ। ’ওসমানী গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর”ওসমানী গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর’ নিমান হলেও উদ্ভোদনের অপেক্ষায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পশ্চিম দিকে এবং দয়ামীর বাজরের উত্তরে গড়ে ওঠা ওসমানী গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘরটি বর্তমানে পড়ে আছে অযতœ অবহেলায়। বঙ্গবীর ওসমানীর জীবনীঃ-মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্র্র্বাধিনায়ক বঙ্গবীর জেনারেল মোহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানী সুনামগঞ্জে জন্মগ্রহন করলেও পিতার চাকরির সূত্রে তাঁর শৈশব-কৈশোর কেটেছে বিভিন্ন জায়গায়। ভারতের গৌহাটিতে ওসমানীর প্রাথমিক শিক্ষার শুরু।১৯৩২ সালে ওসমানী সিলেট গভর্নমেন্ট পাইলট হাই স্কুল এ ভর্তি হন। ১৯৩৪ সালে সিলেট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় সমগ্র ব্রিটিশ ভারতে তিনি প্রথম স্থান লাভ করেন। আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন ১৯৩৮ সালে।বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করে ওসমানী সেনাবাহিনীতে যোগ দেন ১৯৩৯ সালে তিনি রয়ালআর্মড ফোর্সে ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন। দেরাদুনে ব্রিটিশ -ভারতীয় মিলিটারি একাডেমীতে প্রশিক্ষণ শেষে তিনি ১৯৪০ সালে তিনি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন কমিশনড অফিসার হিসেবে। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর একটি ব্যাটেলিয়ানের কমান্ডার হিসেবে তিনি বার্মা সেক্টরে কাজ করেন। ১৯৪২ সালে মেজর পদে উন্নীত হন। ১৯৪২ সালে ওসমানী ছিলেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সর্ব কনিষ্ঠ মেজর। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে ওসমানী ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে লং কোর্স পরীক্ষা দিয়ে উচ্চস্থান লাভ করেন। দেশবিভাগের পর ১৯৪৭ সালের ৭ই অক্টোবর ওসমানী পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। এসময় তাঁর পদমর্যাদা ছিল লেফটেন্যান্ট কর্নেলের। ১৯৪৯ সালে তিনি চীফ অফ জেনারেল স্টাফের ডেপুটি হন।১৯৫১ সনে তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এর ১ম ব্যাটেলিয়ানের অধিনায়ক নিযুক্ত হন। এর পর তিনি চট্টগ্রাম সেনানিবাস প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত তৎকালিন পূর্ববাংলার আরও কয়েকটি আঞ্চলিক স্টেশনের দায়িত্ব তিনি সফলতার সাথে পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি ১৪ তম পাঞ্জাব রেজিমেন্ট এর ৯ম ব্যাটেলিয়ানের রাইফেলস কোম্পানির পরিচালক, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ই.পি.আর.)-এর অতিরিক্ত কমাণ্ডান্ট, সেনাবাহিনীর জেনারেল স্টাফ অফিসার প্রভৃতি দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি কর্নেল পদমর্যাদা লাভ করেন এবং সেনাবাহিনীর হেডকোয়ার্টারের জেনারেল স্টাফ এন্ড মিলিটারি অপারেশনের ডেপুটি ডিরেক্টুরের দায়িত্ব পান।১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে তিনি পাকিস্তানের হয়ে যুদ্ধ করেন। ‘ডেপুটি ডাইরেক্টর অব মিলিটারি অপারেশন’ হিসেবে যুদ্ধরত বিভিন্ন সামরিক হেড কোয়ার্টারে যোগাযোগ করতেন তিনি পাক-ভারত যুদ্ধ যখন শেষ হয়। তখন তাঁর বয়স চল্লিশের উপরে ১৯৬৬ সালের মে মাসে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে অবসরকালীন ছুটি নেন এবং পরের বছর (১৯৬৭ সালের ১৬ ফেব্র“য়ারী) পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন।১৯৭০ সালে তিনি আওয়ামীলীগে যোগদান করেন। আওয়াামীলীগের প্রার্থী হিসেবে ৭০’-এর নির্বাচনে ফেঞ্চুগঞ্জ-বালাগঞ্জ-বিশ্বনাথ এলাকা থেকে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালের ১১ এপ্রিল তৎকালীন মুজিব নগরের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রে ভাষণ দেন। ঐ ভাষণে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবকাঠামো গঠনের কথা উল্লেখ করে এম.এ.জি. ওসমানীকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসেবে ঘোষণা দেন। উল্লেখ্য যে ১০ এপ্রিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র জারী ও সরকার গঠন করা হয়। এবং পরবর্তীতে ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার শপথ গ্রহণ করে। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল গঠিত হয় মুজিবনগর সরকার। এম এ জি ওসমানীকে মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক ঘোষণা করা হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাঁকে বঙ্গবীর উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ১৯৭১ সালের ২৬শে ডিসেম্বর তাঁকে বাংলাদেশ আর্মড ফোর্সের জেনারেল পদে নিয়োগ দেয়া হয়। ১৯৭২ সালে দায়িত্ব থেকে অবসর নেন এবং মন্ত্রীসভায় যোগ দেন অভ্যন্তরীণ নৌ যোগাযোগ, জাহাজ ও বিমান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে। ১৯৭৩ সালের মার্চে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।উক্ত নির্বাচনে বঙ্গবীর এমএজি ওসমানী তাঁর নিজ এলাকা (ফেঞ্চুগঞ্জ-বালাগঞ্জ-বিশ্বনাথ)থেকে অংশ নেন এবং উক্ত নির্বাচনে তিনি সাফল্য লাভ করেন। ১৯৭৩ এর নির্বাচনে ওসমানী ৯৪ শতাংশ ভোটে বিজয়ী হয়ে ডাক, তার, টেলিযোগাযোগ, অভ্যন্তরীণ নৌ যোগাযোগ, জাহাজ ও বিমান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেন। ১৯৭৪ সালের মে মাসে মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বাকশাল ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হলে তিনি সংসদ সদস্যপদ এবং আওয়ামী লীগের সদস্যপদ ত্যাগ করেন। ১৯৭৫ সালের ২৯শে আগস্ট খন্দকার মোশতাক আহমেদের প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা পদে নিয়োগ পান, তবে ৩রা নভেম্বর জেলহত্যার ঘটনার পর পদত্যাগ করেন। ১৯৭৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ওসমানী ‘জাতীয় জনতা পার্টি’ নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন। ১৯৭৮ ও ১৯৮১ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বঙ্গবীর এমএজি ওসমানী অংশ নেন। তিনি জাতীয় জনতা পাটির চেয়ারম্যান ছিলেন। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ১৯৮৪ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারি এমএ জি ওসমানী লন্ডনের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধিন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় সিলেটে সমাহিত করা হয়

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ