আদর্শ ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির এক মহানায়ক মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানি

প্রকাশিত: ২:৩২ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১০, ২০২০

আদর্শ ও অসাম্প্রদায়িক  রাজনীতির এক মহানায়ক মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানি


মুহাম্মদ শামসুল ইসলাম
প্রমত্তা যমুনা, নৌকা, জেলে, মাছ, নদীর চর, মালবাহী নৌকা, বন্যা ইত্যাদির সঙ্গে বসবাস ও লড়াই করে কেটেছে তাঁর বাল্যকাল। যমুনার বক্ষ যেন ছিল তাঁর মায়ের মতো, তাঁর একান্ত আপন পৃথিবী।সেই যমুনার তীরে অবস্থিত সিরাজগঞ্জ শহর। তারই অদূরে ধানগড়া পল্লীতে ১৮৮০ সালের ১২ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেছিলেন সেদিনের আবদুল হামিদ ।
তিনি ছিলেন বিংশতাব্দীর ব্রিটিশ ভারতের অন্যতম তৃণমূল রাজনীতিবিদ ও গণআন্দোলনের নায়ক, যিনি জীবদ্দশায় ১৯৪৭-এ সৃষ্ট পাকিস্তান ও ১৯৭১-এ প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি বাংলাদেশের মানুষের কাছে মজলুম জননেতা হিসাবে সমধিক পরিচিত।
১৯১৩ সালের দিকে যুবক আবদুল হামিদ খান ব্রিটিশবিরোধী রাজনীতির দিকে মনোনিবেশ করেছিলেন। সে সময় তিনি চিত্তরঞ্জন দাশের ব্যক্তিত্ব ও রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। ১৯১৭ সালে চিত্তরঞ্জন ময়মনসিংহ সফরে এলে যুবক আবদুল হামিদ খান তাঁর গভীর সান্নিধ্যে এসেছিলেন। ১৯১৭ সালে কলকাতার কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের প্রায় একই সময়ে অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আবদুল হামিদ খান সে অধিবেশন দুটিতেই দর্শক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। সেখানে মোহনলাল করমচাঁদ গান্ধী, মওলানা মোহাম্মদ আলী, চিত্তরঞ্জন দাশ, মওলানা আবুল কালাম আজাদ প্রমুখ সর্বভারতীয় নেতাকে দেখে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতি ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। সে অবস্থায় চিত্তরঞ্জন দাশ ১৯১৯ সালে কংগ্রেসের প্রাদেশিক সম্মেলনে যোগদানের জন্য আবার ময়মনসিংহে এলে আবদুল হামিদ খান তাঁর সরাসরি সংস্পর্শে আসেন এবং তাঁর একজন অত্যন্ত স্নেহভাজন শিষ্যে পরিণত হয়েছিলেন। এর কিছু সময় পর আব্দুল হামিদ খান কংগ্রেসে যোগদান করে প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।
রাজনীতিতে প্রবেশের পর মওলানা আবদুল হামিদ খানের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল খিলাফত আন্দোলন এবং ১৯২০ সালে গান্ধীর নেতৃত্বে
ব্রিটিশরাজের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক। পূর্ব বাংলার মওলানা আবদুল হামিদ খান সক্রিয়ভাবে সে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন এবং গ্রেপ্তার হন। সেই থেকে তাঁর রাজনৈতিকভাবে গ্রেপ্তার হওয়ার ইতিহাস শুরু হয়েছিল এবং জীবনের প্রায় অর্ধেক সময় তাঁকে কারা অন্তরালে কাটাতে হয়েছে। অসহযোগ আন্দোলনের একপর্যায়ে গান্ধীর সঙ্গে চিত্তরঞ্জন দাশের মতবিরোধ দেখা দিয়েছিল। সে কারণে চিত্তরঞ্জন দাশ কংগ্রেসে থেকেই ‘স্বরাজ দল’ গঠন করেছিলেন। মওলানা আবদুল হামিদ খান উত্তর বাংলা ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে কংগ্রেস ও স্বরাজ দলের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ চালিয়ে যান। সে সময় কৃষকদের সমস্যা ও অধিকার নিয়ে আবদুল হামিদ খান জমিদারদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্থানে আন্দোলন গড়ে তোলেন। তখন জমিদারদের ষড়যন্ত্রে বাংলা থেকে বিতাড়িত হয়ে মওলানা আবদুল হামিদ খান ১৯২৪ সালে আসামের ধুবড়ির নিকটবর্তী ভাসানচরে এসে বসতি গড়ে তোলেন। সেখানে ক্রমান্বয়ে তাঁর বিশাল মুরিদ বাহিনী গড়ে ওঠে। তাদের সহায়তায়ই তিনি সেখানে কৃষক সমাবেশের আয়োজন করেছিলেন। সেই থেকে ভাসানচরের মওলানা হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন মওলানা আবদুল হামিদ খান এবং তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ভাসানী শব্দটি।মওলানা ভাসানী ১৯৩২ সালের ডিসেম্বরে সিরাজগঞ্জের কাওয়াখালিতে বঙ্গ-আসাম প্রজা সম্মেলন নামে এক ঐতিহাসিক কৃষক সমাবেশ আয়োজন করেছিলেন। তিনি ১৯৩৭ সালে আসাম প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। সংসদের বাইরে রাজপথে তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। আসামের কুখ্যাত ‘লাইন প্রথার’ বিরুদ্ধে তাঁর যে সংগ্রাম তা অবিস্মরণীয়।
তা ছাড়া ১৩৩৯ সালে সিরাজগঞ্জে মওলানা ভাসানী ‘বঙ্গ আসাম প্রজা সম্মেলন’ আয়োজন করেছিলেন।তিন দিনব্যাপী সেই সম্মেলনের পর ভাসানীর নাম কৃষকের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। স্বরাজ দল ও কংগ্রেস থেকে শেষ পর্যন্ত মুসলিম লীগে যোগদান করেন মওলানা ভাসানী। ১৯৪০ সালে মুসলিম লীগের লাহোর প্রস্তাব পাসের পর মওলানা ভাসানী আসামকে প্রস্তাবিত পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান। কিন্তু সেটা বাস্তবে রূপায়িত হয়নি। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট যখন ভারত-পাকিস্তান বিভক্ত হলো, ভাসানী তখন আসামে কারারুদ্ধ। পরবর্তিতে ভারতের অন্তর্ভুক্ত আসাম সরকার তখন ভাসানীকে সপরিবারে বিতাড়িত করেছিল। ধুবড়ি ছেড়ে ভাসানী আবার টাঙ্গাইলের যমুনাপারে চলে এসেছিলেন। তারপর আবার পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের অন্যায় শোষণ-শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলেন ভাসানী। একপর্যায়ে অর্থাৎ ১৯৪৯ সালে মুসলিম লীগ ত্যাগ করে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ। তিনি সর্বদলীয় ভাষা সংগ্রাম পরিষদেরও সভাপতি ছিলেন।
১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট গঠনকারী প্রধান নেতাদের মধ্যে অন্যতম। যে কারণে যুক্তফ্রন্টের নামকরণ করা হয়েছিল হক-ভাসানী যুক্ত ফ্রন্ট। হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা যুক্তফ্রন্টের ১৯৫৪ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিজয় এক নতুন পথে ঠেলে দেয় সম্পূর্ণ পাকিস্তানের রাজনীতি। তিনি ছিলেন একজন দূরদর্শী নেতা। তিনি পঞ্চাশের দশকেই নিশ্চিত হয়েছিল যে, পাকিস্তানের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ একটি অচল রাষ্ট্রকাঠামো। ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দের কাগমারী সম্মেলনে তিনি পাকিস্তানের পশ্চিমা শাসকদের আস্সালামু আলাইকুম বলে সর্বপ্রথম পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতার ঐতিহাসিক ঘণ্টা বাজিয়েছিলেন।১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার ও পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ওপর সশস্ত্র হামলা চালালে মওলানা ভাসানী টাঙ্গাইলের সন্তোষ থেকে সিরাজগঞ্জ হয়ে নৌপথে ১৫ এপ্রিল ভারতের আসাম সীমান্তে গিয়ে পৌঁছেন। ১৯৭১ সালের ১ জুন ভারতে আশ্রিত প্রবাসী বামপন্থী রাজনীতিকরা কলকাতায় এক সম্মেলন ডাকেন। এতে মওলানা ভাসানীর অনুপস্থিতিতেই তাঁকে ‘বাংলাদেশ জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম সমন্বয় কমিটি’র প্রধান করা হয়। তা ছাড়া বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার ১৯৭১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে আট সদস্যবিশিষ্ট একটি সর্বদলীয় উপদেষ্টা কমিটি গঠন করে। স্বাধীনতা অর্জনের পরপরই মওলানা ভাসানী দেশে ফিরে আসেন। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর সরকারের কাছে ভাসানী বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দাবিদাওয়া উত্থাপন করলেও বাস্তবে নীরবে-নিভৃতে তাঁর সঙ্গে (বঙ্গবন্ধু) সহযোগিতা করারই চেষ্টা করেছেন। তাঁর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আর একটি ঘটনা ছিল ১৯৭৬ সালের ১৬ই মে ফারাক্কা বাঁধ অভিমুখে লং-মার্চ।
দেওবন্দ মাদ্রাসায় ধর্মশিক্ষা বিষয়ে পড়াশোনা করে তিনি উড়িয়ে ছিলেন সংগ্রামদেশপ্রেমিক ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির পতাকা। যদিও দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে সৃষ্টি হওয়া পাকিস্তানে তিনি অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির সৃষ্টির উদ্দেশ্য তাঁর প্রতিষ্টিত “আওয়ামী মুসলিম লীগ” দল থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দেবার পক্ষে ছিলেন।বলা যায় তাঁর উদ্যোগেই মুসলিম শব্দটি পরে বাদ পড়ে। রাজনৈতিক জীবনের বেশিরভাগ সময়ই তিনি মাওপন্থী কম্যুনিস্ট তথা বামধারার রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। তার অনুসারীরা অনেকে এজন্য তাকে “লাল মাওলানা” নামেও ডাকতেন। তিনি একান্ত ধর্মপ্রাণ মুসলমান ছিলেন, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন।তিনি জাতীয়তাবাদী ও সমাজতান্ত্রিক আদর্শ-চেতনার সংমিশ্রণে একটি রাজনৈতিক দল গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন (ন্যাপ)।
তিনি ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রথম স্বপ্নদ্রষ্টাদের একজন ও পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি । শোষিত-বঞ্চিত ও নিপীড়িত অধিকারহারা মানুষের অধিকার আদায়ে সংগ্রামী মহাপুরুষ ছিলেন মাওলানা ভাসানী।
লেখক,প্রভাষক,রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,গোয়াইনঘাট সরকারি কলেজ,সিলেট।

faster