ইইউ ছাড়ার পর যুক্তরাজ্যকে যে পাঁচ বিষয় সমাধান করতে হবে

প্রকাশিত: ৪:৫৪ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৬, ২০২০

ইইউ ছাড়ার পর যুক্তরাজ্যকে যে পাঁচ বিষয় সমাধান করতে হবে

হ্যালো বাংলাদেশ নিউজ ডেস্ক: যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছেড়েছে কিন্তু এখনো অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে, যার উত্তর মেলেনি। ব্রেক্সিটের পরে যুক্তরাজ্য যেসব প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে পারে, সেগুলো এখানে বর্ণনা করা হলো।

১. ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে একটি বাণিজ্যিক চুক্তি করা

ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে যাওয়ার মানে হলো, এখন ব্রিটেন ইইউ এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে বাণিজ্য চুক্তি করতে পারবে। সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে, ব্রেক্সিট উত্তর অন্তর্বর্তীকালীন সময় আর বাড়ানো হবে না। ২০২০ সালের মধ্যে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হবে। এর মানে হলো, ইইউর সঙ্গে কোন চুক্তিতে পৌঁছানোর সময়সীমা বেশ কম।

দরকষাকষির শর্তের ব্যাপারে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশ সম্মত হওয়ার পর ফেব্রুয়ারি মাসের শেষদিকে থেকে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। কোন একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর পর সেটাকে বাস্তবে রূপ দিতে এ বছরের শেষ নাগাদ বেশ কয়েকমাস লেগে যাবে।

সুতরাং বাস্তবের বিচারে শুধুমাত্র একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনার জন্য কয়েকমাস সময় থাকছে। কিন্তু তারপরেও অনেক ইস্যু আলোচনার জন্য থেকে যাবে। ব্রিটিশ সরকার পণ্যের ওপর ‘শূন্য শুল্ক, শূন্য কোটা’ চুক্তি করার ব্যাপারে কথা বলছে, যেখানে সীমান্ত কর, রফতানি ও আমদানির কোন সীমা থাকবে না।

কিন্তু সুচারুভাবে বাণিজ্য অব্যাহত রাখতে হলে অনেকগুলো বিষয় নিয়েই সমঝোতা হতে হবে, যার মধ্যে সেবা খাত, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সেবা, খাবার ও পানীয় শিল্প এবং বিনোদনের মতো অনেকগুলো বিষয় রয়েছে।

অবশ্যই একটি চুক্তিতে সম্মত হওয়া উভয় পক্ষের জন্যই দরকার, কিন্তু সেজন্য বিশাল কর্মযজ্ঞের দরকার হবে। মাছ ধরা, ন্যায্য প্রতিযোগিতা, ইউরোপিয়ান কোর্ট অফ জাস্টিসসহ অনেক বিষয়ে বিরোধ তৈরি হতে পারে। ২০২০ সালের মধ্যে যদি কোন চুক্তি সম্পন্ন করা সম্ভব না হয়, তাহলে যুক্তরাজ্য-ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্পর্কে নতুন করে একটি টানাপড়েন শুরু হবে।

২. যুক্তরাজ্যকে নিরাপদ রাখা

এগারো মাসের মধ্যে যদি একটি বাণিজ্য চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হয়ও, তাহলেও যুক্তরাজ্যকে অবশ্যই নিরাপত্তা প্রশ্নে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার জন্য একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে। যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের পুলিশ এবং নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা একতম হয়েছেন যে, ব্রেক্সিট উত্তর সময়ে এরকম একটি বিষয়ে একমত হওয়া কঠিন হবে।

যেমন ইউরোপ জুড়ে সংগঠিত বড় অপরাধের ব্যাপারে যে সংস্থা তদন্ত সমন্বয় করে, সেই ইউরোপেলের ওপর এর মধ্যেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে যুক্তরাজ্য। এর মানে হলো, যুক্তরাজ্য যেসব বিষয়ে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে- ইংলিশ চ্যানেল দিয়ে মানব পাচার বা অস্ত্র পাচার সম্পর্কে- যুক্তরাজ্যের উদ্বেগের আরো অবনতি হতে পারে।

ব্রিটিশ পুলিশ কর্মকর্তারা এখন পর্যন্ত ইইউ সিস্টেম ব্যবহার করে বিদেশি নাগরিকদের অতীতের অপরাধের রেকর্ড সম্পর্কে জানতে পারে অথবা ওয়ান্টেড ব্যক্তিদের সম্পর্কে পুরো মহাদেশ জুড়ে সতর্ক বার্তা জারি করতে পারে। কিন্তু ভবিষ্যতে এই তথ্য পাওয়া যুক্তরাজ্যের জন্য কঠিন হয়ে উঠবে। কারণ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে তথ্য বিনিময় না করার ব্যাপারে ইউনিয়নের অনেক দেশের নির্দিষ্ট আইন রয়েছে।

সরকার অবশ্য আরেকটু এগিয়ে চিন্তা করার চেষ্টা করছে। যেমন সরকার আশা করছে, ইউরোপিয়ান অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট পদ্ধতি থেকে এতদিন যুক্তরাজ্য যেরকম সুবিধা পেয়ে আসছে, একই রকম সুবিধা পেতে একটি আইন জারি করবে সরকার। এর ফলে ইউনিয়নের সঙ্গে কোন চুক্তি না হলেও সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের অন্যদেশে বিচারের জন্য পাঠানো যাবে। উভয় পক্ষই এটা চায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসের মধ্যে কি এরকম একটি চুক্তি করা সম্ভব হবে?

৩. খাবারের চালান আসা অব্যাহত রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করা

খামার থেকে শুরু করে মাছ ধরা, উৎপাদন থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত যুক্তরাজ্যে খাদ্য ও পানীয় শিল্প থেকে বছরে ৪৬০ বিলিয়ন ডলার যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে যোগ হয়। এই শিল্পে কাজ করেন ৪০ লাখ মানুষ। এখন চিন্তা হলো, অন্তর্বর্তীকালীন সময় শেষ হওয়ার পর খাদ্য ও পানীয় গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছানোর জটিল প্রক্রিয়ায় কী ঘটবে?

এই শিল্পের প্রতি তিনজনের একজন এসেছেন যুক্তরাজ্যের বাইরে থেকে। অনেকেই ইস্টার্ন ইউরোপের নাগরিক। অভিবাসীদের জন্য দেয়া নূন্যতম বেতনের বিষয়টি চালু করার মাধ্যমে তাদের এখানে আসা যদি বন্ধ হয়ে যায়, তখন কী হবে? বাণিজ্যের প্রসঙ্গ এলে সম্ভাবনা রয়েছে যে পণ্যগুলো সীমান্তে খুলে পরীক্ষা করে দেখা হবে। যার ফলে খরচ বাড়বে এবং তাজা খাবারের মেয়াদ কমে যাবে।

খাদ্য উৎপাদকদের সংগঠন, ফুড এন্ড ড্রিংক ফেডারেশন বলছে, ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির ব্যাপারে ‘উৎস নীতি’ নিয়ে আরো একটি জটিল চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। কারণ যুক্তরাজ্যের উৎপাদকরা পণ্য তৈরির অনেক উপাদান ব্যবহার করে যার কিছু দেশের, কিছু বিদেশ থেকে আমদানি করা। ফলে এগুলো ইউরোপের উৎস আইনের সঙ্গে ঠিক খাপ খায় না।

৪. বিশ্বে নতুন ভূমিকা তৈরি করা

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার পরে বিশ্বে যুক্তরাজ্যের অবস্থান তৈরি করতে হলে ব্রিটিশ সরকারকে অনেক কাজ করতে হবে। সরকারের শ্লোগান, ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ বা বৈশ্বিক ব্রিটেন বাস্তবায়নে কাজ করতে হবে মন্ত্রীদের। ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্কের যে সেতু হিসাবে কাজ করেছে ব্রিটেন, তা একদিকে সরিয়ে রাখতে হবে। তার বদলে মন্ত্রীদের অবশ্যই একটি স্বাধীন বিদেশ নীতি তৈরি করতে হবে।

এর মানে হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য থেকে কম সমর্থন পাওয়া। কারণ যুক্তরাজ্য এখন অন্য দেশের সমস্যার চেয়ে নিজের দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যার দিকে বেশি নজর দেবে। পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে যে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ থেকে বেরিয়ে কীভাবে ক্রমে শক্তিশালী হয়ে ওঠা চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করা হবে।

৫. প্রমাণ করা যে, সব যুক্তিতর্ক ঠিক ছিলো

যারা ব্রেক্সিটের বিপক্ষে ওয়েস্টমিনিস্টার কলেজ গ্রিনের সামনে বিক্ষোভ করেছেন, তাদের অবস্থান এখন আর গুরুত্বপূর্ণ নয়। এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সবচেয়ে বেশি ভক্তকেও স্বীকার করতে হবে যে উত্তাপটি আবেগময় এবং রাজনৈতিক লড়াইয়ের বাইরে চলে গেছে গত কয়েক বছরের মধ্যে।

মিঃ জনসনের পক্ষে এখন চ্যালেঞ্জ হ’ল জনসাধারণকে দেখানো যে সমস্ত বাধা, সমস্ত যুক্তি প্রকৃত পক্ষে মূল্যবান ছিল। কিন্তু সেটা সহজ হবে না। ব্রেক্সিটের পক্ষের লোকজন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ব্রাসেলস থেকে যুক্তরাজ্যের ফিরে পাওয়া শক্তি তুলে ধরতে আগ্রহী। কিন্তু এখন যুক্তরাজ্য প্রস্থান লাউঞ্জে আছে- বিশেষ করে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে পরিস্থিতি অনেকটা একই থাকবে।

এমনকি যারা শুক্রবার রাতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছেড়ে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে যাওয়া উদযাপন করতে শ্যাম্পেনের বোতল খুলেছেন, শনিবার সকালে ঘুম থেকে উঠে তাদের খুব একটা আলাদা কিছু মনে হয়নি। এখন যখন ইউনিয়ন ছেড়ে যাওয়া বা থাকার বিতর্কের অবসান ঘটেছে, তখনো কিছু ভোটার বিশ্বাস করেন যে, যুক্তরাজ্য বোকামির পথে যাত্রা করছে।

এখন বরং সবচেয়ে বড় আশঙ্কা রয়েছে যে, এই বছরের শেষের মধ্যে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিট একটি বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর করতে পারে কিনা। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন পুরোপুরি খুশি হবেন যদি শুক্রবারের পরে, বি-শব্দটি আর কখনও শোনা যায় না, তবে উভয় পক্ষের জনগণের কাছে এটি দেখানো দরকার যে এটি উপযুক্ত ছিল। তিনি এর মধ্যেই ইতিহাসের বইয়ে ঠাই করে নিয়েছেন, তবে সেই অধ্যায়ের এখনো সমাপ্তি ঘটেনি। সূত্র : বিবিসি।