ইচ্ছার স্বাধীনতা বনাম ভাগ্যলিপি !

প্রকাশিত: ১১:৫৮ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১০, ২০২০

ইচ্ছার স্বাধীনতা বনাম ভাগ্যলিপি !

শিকদার মুহাম্মদ কিব্রিয়াহ:

“কপালের লিখন যায় না খণ্ডন”, “ভাগ্যে থাকলে ঠেকায় কে?” এ-ধরনের কথা খুবই সাধারণ। আর এ-ধরনের কথার সরল শাব্দিক মানে হল, মানুষ ভাগ্য দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ভাগ্যে যা আছে, তা-ই ঘটবে। ভাগ্যের ওপর মানুষের কোন হাত নেই।যদি তা-ই হয়, তবে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি বা কর্মপ্রচেষ্টা অর্থহীন। অর্থাৎ মানুষের নিজের কোন ইচ্ছাশক্তি নেই। অতএব, কর্মপ্রচেষ্টার প্রশ্নটিও যৌক্তিক কারণে অবান্তর। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। কারণ, ব্যক্তিসত্তা স্বাধীনভাবে ইচ্ছে করতে পারে, কর্মে প্রবৃত্ত হতে পারে—আমাদের বোধ বা চেতনা থেকেই এটি আমরা অনুধাবন করে থাকি। তাহলে কি ভাগ্য বলে কিছুই নেই? ব্যক্তি নিজেই তার ইচ্ছা ও কর্মের স্রষ্টা? সকল কাজের জন্য দায়ী? কী হতে পারে সমস্যাটির যৌক্তিক সমাধান?
নীতিবিজ্ঞানে ইচ্ছার স্বাধীনতাকে স্বীকার্য সত্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। কারণ, ব্যক্তিসত্তার ইচ্ছার স্বাধীনতা ও স্বাধীন কর্ম-প্রচেষ্টা অস্বীকার্য হলে নৈতিকতা-অনৈতিকতা এবং এর পরিপ্রেক্ষিত ফলাফল তথা পুরস্কার ও শাস্তি নিরর্থক হয়ে যায়। ব্যক্তিসত্তা যদি স্বাধীনভাবে তার ইচ্ছাশক্তির প্রয়োগ তথা স্বেচ্ছাধীন প্রক্রিয়ায় কাজ করতে সক্ষম না হয়, কিংবা সাধিত সেই কর্মের সংঘটক ইচ্ছাশক্তি যদি স্বীয় মানসিক প্রক্রিয়ায় সৃষ্টি না হয়, তবে সম্পন্ন সেই কাজটি সৃষ্টির কারণ বা ইচ্ছাশক্তির জন্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিসত্তাকে দায়ী বলে গণ্য করা অযৌক্তিক। এ জন্যেই নৈতিকতার রক্ষাকবচ হিসেবে ইচ্ছার স্বাধীনতাকে নীতিবিজ্ঞানে স্বীকার্য সত্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। অর্থাৎ ব্যক্তিসত্তার ইচ্ছা ও কর্মের স্বাধীনতা আছে এবং এজন্যেই ব্যক্তি তার প্রতিটি নৈতিক আচরণের জন্যে দায়বদ্ধ।
প্রশ্ন হল, ইচ্ছা ও কর্মের এ-স্বাধীনতা কি নিরঙ্কুশ? অর্থাৎ ইচ্ছার বিষয়টি কি ব্যক্তিসত্তার একতরফা ইচ্ছাধীন? কোনভাবেই কি ব্যক্তিসত্তায় ইচ্ছাসৃষ্টিতে কোন শক্তির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা বা প্রভাব-প্রণোদনা নেই? আবার ব্যক্তিসত্তায় সৃষ্ট ইচ্ছার ফলাফলরূপে সংঘটিত কাজ কি নিরঙ্কুশভাবেই ইচ্ছার সার্থক প্রতিফলন ঘটাতে সক্ষম অর্থাৎ সার্বক্ষণিকভাবেই কি ব্যক্তির ইচ্ছার অনুরূপ হয়ে থাকে? ইচ্ছার বিপরীত কোন কাজ কি সংঘটিত হয় না? বাস্তব জবাব হল, ব্যক্তিক ইচ্ছা সার্বক্ষণিকভাবেই স্থিতিশীল ও প্যারালাল নয় বরং ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ইচ্ছা প্রভাবিত ও পরিবর্তিত হয়। কার্যকারণ সূত্রের সাথেও এ জবাবটি সংগতিপূর্ণ। আবার সংঘটিত কাজের জন্যে ব্যক্তিসত্তাকে সার্বিকভাবে দায়ী হিসেবে গণ্য করা চলে না, কেননা,প্রকৃতি-পরিবেশ ও পরিস্থিতিগত কারণে সংশ্লিষ্ট সে-ই সত্তা তার কর্মের স্বাধীনতাকে সার্থকভাবে প্রয়োগ করতে সক্ষম হয় না।
প্রাকৃতিক ও পারিপার্শ্বিক প্রতিবন্ধকতা যদি ইচ্ছার স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশ বা বাস্তবায়নের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়, তবে অবাস্তবায়িত থেকে যাওয়ার কারণে ব্যক্তিক সেই ইচ্ছা কি অমূল্যায়িত বা অবমূল্যায়িত হবে? সেই ইচ্ছার নৈতিক ‘মান’ নির্ণায়ক কিংবা ‘পরিমাণ’ নির্ধারক কোন যন্ত্র বা ব্যবস্থা আছে কি? সাক্ষাৎ মৃত্যুভীতিতে সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃতভাবে-বাধ্যগতভাবে সংঘটিত কোন অপকর্মের জন্যে কাউকে দায়ী বলে বিবেচনা করা যাবে কি— গেলে কতটুকু? বস্তুগত সাক্ষ্য-প্রমাণে যদি তার মৃত্যদণ্ড হয়ে যায়, তবে একে ন্যায়বিচার বলা যাবে কি? কথিত ন্যায়বিচারে সংঘটিত কাজের নৈতিক মান কি নির্ণীত হতে পারবে? কৃত কাজটির নৈতিক পরিমাণ কি নির্ধারিত করা সম্ভব হবে? প্রকৃত পরিণাম তথা কাজের ফলাফল অর্থাৎ পুরস্কার বা শাস্তি কি সে স্বরূপত যথার্থভাবে ভোগ করতে পারবে?
“প্রতিটি সত্তাই তার নৈতিক কাজের ফলাফল ভোগ করবে”—নীতিবিজ্ঞানে স্বতঃসিদ্ধ এ সিদ্ধান্তটির নিরপেক্ষ ও যথার্থ প্রয়োগ কি জাগতিক বিচারে সম্ভব? জবাব নেতিবাচক।অর্থাৎ ইচ্ছা ও কর্মের স্বাধীনতা নিরঙ্কুশ নয়।
“ইচ্ছার স্বাধীনতা” সমস্যাটি ইসলামের তাকদির-প্রাসঙ্গিক আলোচনার বিষয়বস্তু। শাব্দিক অর্থে তাকদির মানে “পরিমাণ নির্ধারণ”, আর পারিভাষিক অর্থে “অদৃষ্ট”বা ভাগ্যে বিশ্বাস।আল্লাহ আল কুরআনে ঘোষণা করেন যে, তিনি এ বিশ্বজগত সৃষ্টি করেছেন এবং তাকদিরের বিধান দিয়েছেন। নিশ্চয়ই সবকিছু তাকদির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। অনিবার্য কারণেই প্রশ্ন এসে যায় যে, জগৎ-প্রক্রিয়ার সবকিছুই কী তাহলে পূর্বনির্ধারিত? আপাতভাবে প্রাকৃতিক তথা বস্তুগত ঘটনাবলী বা বিষয়বস্তুকে পূর্বনির্ধারিত হিসেবে বিবেচনা করা গেলেও ব্যক্তিসত্তার ইচ্ছা ও আচরণও কী পূর্বনির্ধারিত? যদি তা-ই হয়, তবে নৈতিক কাজের জন্যে ব্যক্তিসত্তাকে দায়ী বলে গণ্য করার যৌক্তিকতা কোথায়? তাকদিরের নিয়ম বা বিধান আসলে কী—কীভাবে তা কার্যকর হয়?
বিশ্বজগতে তাকদিরের বিধান দুটি প্রক্রিয়ায় প্রয়োগ লাভ করে। একটি হচ্ছে “তাকবিনি” আর অন্যটি হচ্ছে “তাশরিয়া”। তাকবিনি হচ্ছে সৃষ্টিগত প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ায় মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে এবং বিবর্তন ও বিকাশের মধ্য দিয়ে চুড়ান্ত পরিণতিপ্রাপ্ত হবে। এটি প্রাকৃতিক পদ্ধতি। প্রকৃতির স্রষ্টা কর্তৃক নির্ধারিত পদ্ধতি। অপরটি অর্থাৎ তাশরিয়া হচ্ছে, ব্যক্তিসত্তার স্বেচ্ছাভিত্তিক কাজ। এ-ক্ষেত্রে ব্যক্তিসত্তার ইচ্ছার স্বাতন্ত্র্য ও কর্মের স্বাধীনতা স্বীকৃত এবং প্রায়োগিক। স্বাধীন ইচ্ছা ও কর্মভিত্তিক হওয়ার কারণে এ-ক্ষেত্রে ব্যক্তিসত্তা তার কৃতকর্ম ও কর্ম-প্রেরণাদায়ক ইচ্ছাশক্তির জন্য দায়ী। অর্থাৎ এটি নৈতিকতা-অনৈতিকতার প্রশ্নসাপেক্ষ। এ-ই প্রক্রিয়াটিতে নৈতিক কাজের পরিমাণ ও মান নির্ধারিত ও নির্ণীত হয় এবং এর সমানুপাতে ফলাফল প্রদান করা হয়। এ-ই ফলাফল ইহ ও পরকালের যে কোন একটি অথবা উভয়টি মিলে পূর্ণতা লাভ করবে।
ইচ্ছার স্বাধীনতার প্রয়োগে ব্যক্তিসত্তা কী ইচ্ছে করবে, সে-ই ইচ্ছের বাস্তবায়নে সে কী পদক্ষেপ নেবে, কী বাধার সম্মুখীন হবে, ইচ্ছেটি আদৌ বাস্তবায়িত হবে কি-না, হলে কতটুকু, বাস্তবায়িত ইচ্ছেটি বৈধ না অবৈধ, এর ব্যক্তিক-সামাজিক বা মানবিক প্রতিক্রিয়া কী বা কেমন, এর পরিণতি বা ফলাফল কী এবং কতটুকু হওয়া উচিত, ইহকালে না পরকালে, নাকি উভয়কাল মিলে পরিণতি ভোগ করা উচিত, কোন কাজের কোন ফল পাওয়া উচিত [ ইত্যাদি সর্বদ্রষ্টা পরমসত্তা সার্বিকভাবেই জ্ঞাত।অর্থাৎ ] ব্যক্তির ওপর কি কি তাকবিনি আইন প্রযোজ্য হবে; যা তার ইচ্ছাধীন নয়, প্রযুক্ত তাকবিনি আইন তথা প্রাকৃতিক ঘটনা বা বিষয় যা অর্পিত বা আরোপিত এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে তার আচরণ বা কর্মপদ্ধতি কী হবে অর্থাৎ তার ইচ্ছের স্বাধীনতাকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সে কীভাবে প্রয়োগ করবে ইত্যাদি ঐচ্ছিক ও অনৈচ্ছিক কাজের সমানুপাতিক ফলাফল নির্ধারণ করে সর্বদ্রষ্টা স্রষ্টা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিসত্তার তাকদির বা ভাগ্যলিপি চুড়ান্ত করে দেন। ইচ্ছার স্বাধীনতা প্রয়োগে ব্যক্তি দ্বারা কোন একটি কাজ সংঘটিত হলে এর পরিণাম কী আর সংঘটিত না হলে পরিণাম কী ইত্যাদি তার তাকদির বা ভাগ্যলিপিতে অচুড়ান্ত হিসেবে ঝুলন্ত থাকে। তাকদিরের এ-ই বিশেষ ব্যবস্থাপনাকে বলে “তাকদির-এ মুয়াল্লাক”। মুয়াল্লাকে ব্যক্তির ইচ্ছার স্বাধীনতা সংরক্ষিত এবং এজন্যেই তা নৈতিক দায়বদ্ধ। আর যে বিষয়গুলো ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভর করে না, অর্পিত বা আরোপিত হবেই, সেগুলোকে বলে “তাকদির-এ মুবরাম”। এটি চুড়ান্ত।
উদাহরণ সহযোগে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যাক, মানুষের জণ্ম এমন একটি বিষয়, যেটির ওপর মানুষের কোন হাত নেই। গরিবের ঘরে জন্ম হবে, না ধনীর ঘরে হবে, বাংলাদেশে হবে না আমেরিকায় হবে, কেউ নিজে সিলেক্ট করতে পারে না। এটা তাকবিনী বা মুবরাম। এ-ই মুবরাম অবস্থার মধ্যে থেকেও পরবর্তীতে মানুষ অনেক ক্ষেত্রেই ইচ্ছা ও কর্মের স্বাধীনতা প্রয়োগ করতে পারে। এগুলো তাশরিয়া বা মুয়াল্লাকের বিষয়।আর মুয়াল্লাকের এ বিষয়গুলোর কর্মফলরূপে বা পরীক্ষারূপে অনেক অর্পিত, আরোপিত বা আপতিক বিষয় ব্যক্তির জীবনে ঘটে, যেগুলো ব্যক্তিক-ইচ্ছার অনুরূপ নয়। এগুলো মুবরাম।তাকবিনী ও তাশরিয়া আইনের মাধ্যমে কার্যকর মুবরাম ও মুয়াল্লাকের বিষয়গুলোর সমন্বিত রূপটিই হচ্ছে তাকদির বা ভাগ্যলিপি। এজন্যেই এখানে ইচ্ছার স্বাধীনতা ও পরাধীনতা তথা বিধির অধীনতা দুটোই কার্যকর। ইসলামি জীবন-ব্যবস্থায় এ-ই পুরো প্রক্রিয়াটির ওপরই ঈমান রাখতে হয়।
উদাহরণ স্বরূপ মনে করুন, জনৈক জনপ্রিয় ওয়াজী সুললিত কন্ঠের মাধ্যমে ওয়াজ করে প্রচুর অর্থবিত্তের অধিকারী হলেন। তাঁর এ কন্ঠশক্তির স্রষ্টা তিনি নিজে নন। প্রকৃতির স্রষ্টা দ্বারা নির্ধারিত প্রকৃতিগত। এটি তাঁর ভাগ্যে ছিল বলেই তিনি পেয়েছেন—নিজস্ব অর্জন নয়। এটা তাকবিনী আইনের অধীনে তাকদিরে মুবরাম। এখন, তাঁর এই সুললিত কন্ঠ কীভাবে তিনি ব্যবহার করবেন-এটা তাঁর ইচ্ছার অধীন। তিনি কী সৎ পথে মানুষকে ডাকবেন, না অসৎ পথে প্রবৃত্ত করবেন—হকের নামে মানুষকে বিভ্রান্ত করবেন; সবই তাঁর স্বাধীন ইচ্ছার ব্যাপার। যদি সৎ পথে চালিত হন, তবে ভাল পরিণাম আর অসৎ পথে চালিত হলে মন্দ পরিণাম ভোগ করবেন। দুটোই মুয়াল্লাকে তাশরিয়া আইনের অধীনে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে। বাস্তবায়িত হবার সাথে সাথেই তা মুবরাম তথা স্থায়ী হয়ে যায় কর্মফল হিসেবে। আবার, সংশ্লিষ্ট ওয়াজীর স্রষ্টা ও সুললিত কন্ঠ দানকারী আল্লাহ যেহেতু ভবিষ্যৎ-দ্রষ্টা, তিনি জানেন তাঁর বান্দা স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিকে কীভাবে প্রয়োগ করে কী ফল অর্জন করবে। অতএব, এ সবকিছুর আলোকে বান্দার চুড়ান্ত ভাগ্যলিপি তৈরি করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব নয়। তাশরিয়া আইনের অধীনে মুয়াল্লাকে ঝুলন্ত কাজগুলি বান্দা করবে বলেই আল্লাহ সেগুলোকে লিপিবদ্ধ করেন এবং এগুলোর কর্মফল মুবরাম করে দেন। অর্থাৎ তাকবিনি প্রক্রিয়ায় অর্জিত সার্বিক সামর্থ্যকে তাশরিয়া প্রক্রিয়ায় প্রাপ্ত ইচ্ছা ও কর্মের স্বাধীনতার ভিত্তিতে ব্যক্তিসত্তা কীভাবে প্রয়োগ করে কী ফল অর্জন করবে—এর মাধ্যমেই তাকদির নির্ধারিত হয়।
বলা হয়ে থাকে, জন্মের মত মৃত্যুও নির্ধারিত। তবে কি মানুষ বাঁচার জন্য চেষ্টা করবে না? ধরুন, কথিত ওয়াজীর মুখে ক্যান্সার হল। তাঁর কোটি টাকা খরচ করে চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য আছে। এখন তিনি কোটি টাকা খরচ করার ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসা করবেন কি করবেন না-এটা তাঁর নিজের ব্যাপার। আল্লাহ তাঁকে বাধ্য করেন না।তিনি বিদেশ গিয়ে প্রায় দেড়কোটি টাকা খরচ করে সুস্থ হয়ে ফিরে এলেন। যদি না করতেন, তবে হয়তো অন্যকিছু ঘটতো। টাকা ছিল বলেই তিনি বেঁচে রইলেন। যার টাকা নেই সে বেঁচে থাকতে পারতো না। টাকার ভাগ্যটা তাকবিনী বা মুবরাম আর টাকা ব্যবহারের বিষয়টি তাশরিয়া বা মুয়াল্লাক। আল্লাহ জানেন ওয়াজী ঝুঁকি নেবেন,চিকিৎসা করাবেন।এসব জানেন বলেই এসবের ভিত্তিতে তাঁর মৃত্যুটাও প্রলম্বিত করে নির্ধারিত বা মুবরাম করে রেখেছেন। আর চিকিৎসা সত্ত্বেও তিনি কবে মারা যাবেন, তা-ও সর্বজ্ঞানী আল্লাহ জানেন বলেই তাঁর মৃত্যুর দিনটিও একইভাবে মুবরাম হয়ে আছে।মোটকথা,প্রকৃতিগতভাবে যা কিছু ঘটবে তার ওপর যেমন বিশ্বাস রাখতে হবে,তেমনি আমল বা প্রচেষ্টা তথা স্বাধীন ইচ্ছা ও কর্মশক্তির প্রয়োগ দ্বারা অনেক কিছুই পরিবর্তন করা যায় অর্থাৎ ভাগ্যকে বদলানো যায়—এর ওপরও বিশ্বাস রাখতে হবে। আল্লাহ বলেন, “যারা নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করে না, আল্লাহও তাদের ভাগ্য পরিবর্তন করে দেন না।”—–আল কুরআন।
এখন, প্রশ্ন উঠতেই পারে, ইচ্ছা সৃষ্টির ক্ষেত্রে ব্যক্তি কি স্বাধীন? হলে কীভাবে? যদি না হয়, তবে ইচ্ছাকৃত কাজটির জন্যে সে দায়ী হবে কেন?
প্রকৃতিগতভাবেই মানুষ জীববৃত্তি ও বুদ্ধিবৃত্তি সম্পন্ন সত্তা। জীববৃত্তি মানে ইন্দ্রিয় প্রবৃত্তির পরিপোষণ—ভোগ-উপভোগের মাধ্যমে জৈবিক ইচ্ছার বাস্তবায়ন। আর, বুদ্ধিবৃত্তি জীববৃত্তির বিপরীত প্রবণতা। নৈতিক বা আদর্শিক। জীববৃত্তি ঐন্দ্রিয়িক। ইন্দ্রিয়জ সুখই এর কাম্য। পক্ষান্তরে, বুদ্ধিবৃত্তি নীতি-আদর্শের চেতনা দিয়ে জীববৃত্তিকে দমন করতে চায়। কিন্তু জীববৃত্তির সাথে প্রত্যক্ষভাবে সৃষ্টি-প্রক্রিয়া জড়িত। এজন্যে, একে অস্বীকার করা মানে জাগতিক সৃষ্টি প্রক্রিয়াকে অস্বীকার করা। অতএব, এটি অনস্বীকার্য। কিন্তু এটি যদি অনিয়ন্ত্রিত হয়, তবে শৃঙ্খলা, শিষ্ঠাচার, অধিকার, সাম্য, শান্তি কিছুই আর অবশিষ্ট থাকবে না। সমাজ-সভ্যতা হয়ে পড়বে বর্বর-পাশবিক। শক্তিই হবে সবকিছুর নিয়ামক। এজন্যে, এটি একই সাথে স্বীকৃত ও সুনিয়ন্ত্রিত হতে হবে। অর্থাৎ নিয়মতান্ত্রিকতায় একে প্রায়োগিক-ভারসাম্যপূর্ণ হতে হবে। আর এ নিয়ম হচ্ছে বৌদ্ধিক নিয়ম। বুদ্ধিজাত নৈতিক চেতনার আদর্শ দিয়ে জীববৃত্তিকে শুভ-প্রায়োগিক ও সৃষ্টিশীল-ফলপ্রসু করতে হয়।বিশুদ্ধ অর্থে বৌদ্ধিক চেতনা শুভধর্মী। এজন্যে এটি হচ্ছে শুভ ইচ্ছের স্রষ্টা। সংগত কারণেই বৌদ্ধিক চেতনাবিহীন জৈবিক চেতনাই হচ্ছে সার্বিক অশুভ ইচ্ছের স্রষ্টা। যেহেতু, স্বরূপগত স্বভাবে ব্যক্তিসত্তা এ দুটো চেতনাকেই ধারণ করে, সেজন্যে এগুলোর প্রায়োগিকতার দায় সে অস্বীকার করতে পারে না। অর্থাৎ শুভ-অশুভ প্রতিটি ইচ্ছাশক্তির প্রয়োগে ব্যক্তিসত্তা দায়বদ্ধ।
তবে প্রশ্ন উঠতে পারে, এ দায়বদ্ধতা কতটুকু? আর তার ইচ্ছা ও কর্মের নৈতিক মান ও পরিমাণ কীভাবে নির্ধারিত হতে পারে?
পরমস্রষ্টা ব্যক্তিসত্তায় “বিবেক” নামক ন্যায়-অন্যায় বোধের ভিত্তি স্থাপন করে দেন। ব্যক্তিসত্তার দৈহিক ও মানসিক বিকাশের সাথে সাথে এ-ই বিবেকবোধ বিকশিত হয়ে সমৃদ্ধি লাভ করে। ক্রমবিকাশের বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন মাত্রায় বিবেকবোধের প্রবৃদ্ধি ঘটে। আবার, স্রষ্টা ব্যক্তিসত্তায় ‘সহজাত ধারণা’র আকারে “বুদ্ধি”র সূচনা করে থাকেন। এই সূচিত বুদ্ধিও মানসিক দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ায় বিকাশ লাভ করতে থাকে।ফলে ব্যক্তিসত্তা জীবনের বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন মাত্রার বুদ্ধিমত্তা প্রাপ্ত হয়। আর এ বুদ্ধিমত্তার সাথে যুক্ত হয় জীবনিক প্রক্রিয়ায় অর্জিত “অভিজ্ঞতাজনিত বুদ্ধি”র প্রবৃদ্ধি।অভিজ্ঞতাজনিত বুদ্ধির উৎপত্তি হয় দুটি প্রক্রিয়ায়। একটি হচ্ছে, ব্যক্তিসত্তার অভ্যন্তরীণ বুদ্ধিমত্তার জীবনিক প্রয়োগের অভিজ্ঞতায়, আর অপরটি হচ্ছে, ব্যক্তিসত্তার বাইরে সংঘটিত লৌকিক-অতিলৌকিক জাগতিক ঘটনাবলীর প্রত্যক্ষণের মাধ্যমে।
ব্যক্তিসত্তায় প্রাথমিক পর্যায়ে ভিত্তিস্থাপিত “বিবেকবোধ” ও “বিকশিত বিবেকবোধ”-এর সমন্বয়ে সমৃদ্ধ তাৎক্ষণিক “পূর্ণবিবেক” এবং “সহজাত ধারণা”, “বিকশিত বুদ্ধি” ও “অভিজ্ঞতাজনিত বুদ্ধি”-এর সমন্বিত বুদ্ধিমত্তা তথা প্রজ্ঞার ঐচ্ছিক প্রক্রিয়ায় তাকবিনী সীমাবদ্ধতা তথা প্রকৃতি-পরিবেশ ও পরিস্থিতিগত কারণের অধীনে ব্যক্তিসত্তা কী ইচ্ছে পোষণ করেছে, ইচ্ছের বাস্তবায়নে কী কর্ম-কৌশল গ্রহণ করে কাজ সম্পন্ন করেছে, সম্পন্ন সেই কাজটির পরিণতি হিসেবে ব্যক্তি-সমাজ ও প্রকৃতি-পরিবেশ তথা বিশ্বজনীন শুভ-অশুভ কী ফলাফল, কতটুকু এসেছে—এ সবকিছুর পরিমাণ ও গুণগত মানের স্বরূপ-সমষ্টিই হবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিসত্তার স্বাধীন ইচ্ছা ও কর্মের বিবেচ্য মান ও পরিমাণ। এর সমানুপাতেই সে নৈতিক পরিণাম বা কর্মফল তথা পুরস্কার ও শাস্তি ভোগ করবে।নৈতিক কাজের মান ও পরিমাণ নির্ধারণের উক্ত উপাদানগুলোর প্রকৃতি ও পরিমাণ পরমস্রষ্টা ছাড়া আর কারো পক্ষেই জানা সম্ভব নয়।কারণ, প্রাথমিকভাবে ব্যক্তিসত্তায় সূচিত বিবেকবোধ, এর বিকশিত অবস্থার তাৎক্ষণিক মাত্রা বা পরিমাণ, অর্পিত সহজাত ধারণা, বিকশিত বুদ্ধি এবং বিভিন্ন পর্যায়ে অর্জিত অভিজ্ঞতাজনিত বুদ্ধির যথার্থ পরিমাপ এবং স্বতন্ত্রভাবে এগুলোর স্বরূপ-উপলব্ধি কোন মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয়।এটি কেবল যৌক্তিক-অনুমিত সর্বশক্তিমান ও সর্বজ্ঞানী পরমসত্তার পক্ষেই সম্ভব। অর্থাৎ এগুলোর সঠিক পর্যবেক্ষণ, হিসেব সংরক্ষণ, সূক্ষ্ণ বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে সঠিক ন্যায়বিচারভিত্তিক ফলাফল প্রদান করা পরমসত্তা ছাড়া আর কারও পক্ষে কোনভাবেই সম্ভব হতে পারে না।
“প্রতিটি নৈতিক সত্তাকে তার কর্মফল ভোগ করতেই হবে”—নীতিবিজ্ঞানের এ স্বতঃসিদ্ধ সিদ্ধান্তটির বাস্তবায়ন কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় বিধায় প্রখ্যাত জার্মান দার্শনিক ইমান্যুয়েল কান্ট তাঁর বিখ্যাত নীতিদর্শনে নৈতিক কাজের পূর্ণতা তথা ফলাফল প্রদানে ঈশ্বরের অস্তিত্ব ও পরকালীন বিচার-ব্যবস্থার দ্ব্যর্থহীন স্বীকৃতি দিয়েছেন।
বিশ্বজগৎ ও মানুষের স্রষ্টা আল্লাহ তাঁর তাকদির ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কিছু অনিবার্য সীমাবদ্ধতার অধীনে মানুষের ইচ্ছা ও কর্মের স্বাধীনতা দিয়েছেন, যেগুলোর প্রত্যেকটির ফলাফল ইহকাল ও পরকালের কোন একটি বা উভয়টি মিলে পূর্ণতা লাভ করবে।—–(শেষ)