ঈমান ভঙ্গের দশটি কারণ-

প্রকাশিত: ৬:১৪ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২৭, ২০২০

ঈমান ভঙ্গের দশটি কারণ-

হ্যালো বাংলাদেশ ইসলামী ডেস্কঃ

আমরা ওযু ভঙ্গের কারণ জানি, নামায ভঙ্গের কারণ জানি কিন্তু ঈমান ভঙ্গের কারণ জানি কি??

একঃ আস শিরক
আল্লাহ তা’য়ালার ইবাদতে শরীক করা। এ ব্যাপারে মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ আল্লাহ্ বলেছেন:
“নিশ্চয় আল্লাহ্ তাঁর সাথে অংশীদার করা ক্ষমা করেন না।ইহা ব্যতীত অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন; এবং যে কেহ আল্লাহর সাথে শরীক করে সে এক মহা পাপ করে।”(সূরা নিসা ৪: আয়াত ৪৮)

“…….কেহ আল্লাহর সাথে শরীক করলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত অবশ্যেই হারাম করবেন এবং তার আবাস জাহান্নাম। যালিমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই।” (সূরা মায়িদা ৫: আয়াত ৭২)

কেউ আল্লাহর সাথে যে বিভিন্ন প্রকার শরীক করতে পারে তার মধ্যে রয়েছে অলিহাহ, আরবাব, আনদাদ ও তাগুত। বর্তমান কালের কয়েকটি বড় বড় শিরক সমূহের মধ্যে রয়েছে মাজার ও কবর পূজা, পীর ও আল্লাহর অলিরা গায়েব জানেন, অসুস্থকে সুস্থ করতে পারেন, বাচ্চা দিতে পারেন, বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারেন কিংবা আমাদের খবর জানেন ইত্যাদি ধারণা পোষণ করা।

আল্লাহ্ একমাত্র আইন ও বিধান দাতা। কুরআন ও সুন্নাহর মাধ্যমে আল্লাহ আমাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন সমাজ, রাষ্ট্র, শিক্ষা, বিচার ব্যবস্থা, শাস্তি, অর্থনীতি কিভাবে চালাতে হবে এবং এ সমস্ত ব্যাপারে আল্লাহর দেয়া বিধানই প্রত্যেক মুসলিমের একমাত্র সংবিধান। যদি কেউ আল্লাহর দেয়া সংবিধানের উপর নিজেরা আইন তৈরী করে তবে তারা তাগুত(আল্লাহদ্রোহী, সীমালংঘনকারী)-তে পরিণত হবে। যারা তাগুতের তৈরী সংবিধানকে মানবে, তারা মানার বিষয়ে আল্লাহর সাথে শিরক্ করে মুশরিকে পরিণত হবে। এমনিভাবে আল্লাহর দেয়া শরীয়া আইন বাদ দিয়ে যে সমস্ত বিচারক মানুষের তৈরী করা আইন দিয়ে বিচার ফয়সালা করে তারাও তাগুত।এবং যে সকল লোক তাদের কাছে নিজের ইচ্ছার বিচার ফয়সালা নিয়ে যাবে তারাও শিরকের গুনাহতে লিপ্ত হয়ে ইসলাম থেকে বাদ পড়ে যাবে।

দুই:মধ্যস্থতা ধরা
যে ব্যক্তি তার নিজের এবং আল্লাহর মধ্যে মধ্যস্থতা ও যোগাযোগের মাধ্যম বানায় এবং তাদের কাছে তার মনোস্কামনা পূরণের(শাফায়া) জন্য আবেদন নিবেদন করে এবং তাদের উপর নির্ভর করে, সে কাফির (অবিশ্বাসী) হয়ে যায়। ইহাই অতীত ও বর্তমানের আলেমদের ইজমা।

“তারা আল্লাহকে ব্যতিত যার ইবাদাত করে তা তাদের ক্ষতিও করতে পারে না,উপকারও করতে পারে না। তারা বলে, ‘এইগুলি আল্লাহর নিকট আমাদের সুপারিশকারী।’ বল, ‘তোমরা কি আল্লাহকে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর এমন কিছুর সংবাদ দিবে যা তিনি জানেন না?তিনি মহান, পবিত্র’ এবং তারা যাকে শরীক করে তা হতে তিনি উর্দ্ধে।”(সূরা ইউনুস ১০: আয়াত ১৮)

“জেনে রাখ, অবিমিশ্র আনুগত্য আল্লাহরই প্রাপ্য। যারা আল্লাহর পরিবর্তে অন্যকে অভিভাবকরুপে গ্রহণ করে তারা বলে, ‘আমরা তো এদের পূজা এজন্যই করি যে, ইহারা আমাদেরকে আল্লাহর সান্নিধ্যে নিয়ে যাবে।’ তারা যে বিষয়ে নিজেদের মধ্যে মতভেদ করছে আল্লাহ তার ফয়সালা করে দিবেন। যে মিথ্যাবাদী ও কাফির আল্লাহ তাকে সৎপথে পরিচালিত করেন না।” (সূরা যুমার ৩৯:আয়াত ৩)

এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ হবে যদি কোন ব্যক্তি মৃত বা জীবিত পীর(ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব) বা দরবেশের কাছে সন্তান দেয়ার বা মনের ইচ্ছা পূরণের জন্য প্রার্থনা করে; এছাড়া তাবীজ দিতে বলে আর বিশ্বাস স্থাপন করে পীরবাবার তাবীজে সে সুস্থ হবে অথবা মনের কামনা পূরণ হবে। এসকল কাজ দ্বারা আল্লাহ তা’য়ালা রুবুবিয়াতের সাথে পীরবাবা বা বুজুর্গকে শরীক করা হয়। ইহা সুস্পষ্ট শিরক্ যা কিনা একজন মুসলিমকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়।

তিন: যে ব্যক্তি বহু্ইশ্বরবাদকে প্রত্যখান না করে বা বহুইশ্বরবাদী(মুশরীক) কাফির কিনা এমন সন্দেহ পোষণ করে সে কাফির হয়ে যায়। উদাহরণ স্বরূপ যদি কোন ব্যক্তি বলে যে, সে নিশ্চিত নয় একজন খৃষ্টান কাফির কিনা, তাহলে সে নিজেই কাফির হয়ে যায়। কারণ সে ঈসা(আ)-কে আল্লাহ হিসেবে গ্রহণকারী খৃষ্টানদের প্রত্যাখান করে নি।

চার: যে ব্যক্তি মহানবী(সা) এর পরিপূর্ণতা ও দিক নির্দেশনা বা ফয়সালায় অবিশ্বাস করে সে কাফির। এর কারণ হচ্ছে আল্লাহর রাসূল(সা) ও তার ফয়সালা হচ্ছে সীরাতুল মুসতাক্কিমের উপর। আর যারা তাগুতের কাছে যাওয়া বেশি পছন্দ করে তারা সত্য সঠিক পথ হতে বহু দূরে। এই সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন,
“কারও নিকট সৎপথ প্রকাশ হওয়ার পর সে যদি রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং মু’মিনদের পথ ব্যতিত অন্য পথ অনুসরণ করে, তবে যে দিকে সে ফিরিয়া যায় সে দিকেই তাকে ফিরাইয়া দিব এবং জাহান্নামে তাকে দগ্ধ করব, আর উহা কত মন্দ আবাস। নিশ্চয়ই আল্লাহ তার সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করবেন না; ইহা ব্যতিত সব কিছু যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন, এবং কেহ আল্লাহর শরীক করলে সে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট হয়।” (সূরা নিসা ৪: আয়াত ১১৫-১১৬)

এই আয়াত দ্বারা পরিষ্কার রুপে প্রমানিত হয় যে রাসূলের প্রদর্শিত পথের বিরোধীতা করা এবং মু’মিনের পথ ছেড়ে অন্য কোন পথ গ্রহণ করা শিরক। এর শাস্তি হচ্ছে নিকৃষ্ট স্থান জাহান্নাম। যদি কোন বিষয় আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কথা দ্বারা প্রমাণিত হয়, তাহলে তা নিয়ে কানাঘুষা করা এবং তা ছেড়ে নিজের মনগড়া পথের বা অন্য কারোর অন্ধ অনুকরণে অন্য পথের আশ্রয় নেয়া সুস্পষ্ট শিরক। আল্লাহ শিরককে কখনই ক্ষমা করবেন না।


পাঁচ: যে ব্যক্তি নবী মুহাম্মদ(সা) যা কিছু নিয়ে এসেছেন তাতে অসন্তুষ্ট হয় যদিও সে এ অনুযায়ী কাজ করে, সে কাফির হয়ে যায়। যেমন এক ব্যক্তি যে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ে অথচ সে এগুলো করা অপছন্দ করে অথবা এমন এক মহিলা যে হিজাব পরে অথচ সে তা পরা অপছন্দ করে।
মহান আল্লাহ বলেন-
“আর মানুষের মধ্যে এমন লোকও আছে যারা বলে,‘আমরা আল্লাহ ও আখিরাতে ঈমান এনেছি’, কিন্তু তারা মু’মিন নয়।” (সূরা বাকারা ২; আয়াত ৮)

“কিন্তু না, তোমার প্রতিপালকের শপথ! তারা মু’মিন হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তাদের নিজেদের বিবাদ-বিসম্বাদের বিচার ভার তোমার(রাসূলের) উপর অর্পণ না করে; অত:পর তোমার সিদ্ধান্ত সম্বন্ধে তাদের মনে কোন দ্বিধা না থাকে এবং সর্বান্ত:করণে মেনে য়ে।” (সূরা নিসা ৪: আয়াত ৬৫)


ছয়: যে ব্যক্তি দ্বীনের আওতার কোন কিছুর ব্যাপারে উপহাস করে বা কৌতুক করে অথবা ইসলামের কোন পুরষ্কার বা শাস্তির ব্যাপারে ব্যাঙ্গ করে সে কাফির হয়ে যায়। এর প্রমাণ হচ্ছে—

“এবং তুমি তাদেরকে প্রশ্ন করলে তারা নিশ্চয়ই বলবে, ‘আমারা তো আলাপ-আলোচনা ও ক্রীড়া-কৌতুক করছিলাম।’ বল, ‘তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর নিদর্শন ও তাঁর রাসূলকে বিদ্রুপ করছিলে?’ ‘তোমরা অযুহাত দেয়ার চেষ্টা করিও না। তোমরা তো ঈমান আনার পর কুফরী করেছ।….” (সূরা তওবা ৯ : আয়াত ৬৫-৬৬)


সাত: আস সিহর বা জাদু
সকল প্রকার যাদু নিষদ্ধ, কেউ এতে অংশগ্রহণ করুক, সময় ব্যয় করুক বা চর্চার প্রতি সহানুভূতিশীল হোক না কেন। যে ব্যক্তি জাদু চর্চা করে বা জাদুতে খুশী হয়, সে কাফির হয়ে যায়। কারণ আল্লাহ তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে বলেছেন:
“…সুলায়মান কুফরী করে নাই কিন্তু শয়তানরাই কুফরী করেছিল, তারা মানুষকে যাদু শিক্ষা দিত….।”(সূরা বাকারা ২ : আয়াত ১০২)

আট: যে ব্যক্তি মুশরিককে(বহু ঈশ্বরবাদী কাফের-ইহুদী,খ্রিষ্টান প্রভৃতি) সাহায্য সমর্থন করে এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে তাকে সহয়তা করে সে কাফির হয়ে যায় কারণ তার কাছে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখে এমন একজন মুসলিমের তুলনায় আল্লাহর শত্রু বেশী প্রিয়।ইহার প্রমাণ হচ্ছে মহান আল্লাহ তা’য়ালার এই কথা:
“হে মু’মিনগণ! তোমাদের পিতা ও ভ্রাতা যদি ঈমানের মুকাবিলায় কুফরীকে শ্রেয় জ্ঞান করে, তবে তাদেরকে অন্তরঙ্গরুপে গ্রহণ করে না। তোমাদের মধ্যে যারা তাদেরকে অন্তরঙ্গরুপে গ্রহণ করে, তারাই যালিম।” (সূরা তওবা :আয়াত ২৩)

“হে মু’মিনগণ! তোমরা ইয়াহুদী ও খৃষ্টানদেরকে বন্ধুরুপে গ্রহণ করো না, তারা পরস্পরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে কেহ তাদেরকে বন্ধুরুপে গ্রহণ করলে সে তাদেরই একজন হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ যালিম সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না।” (সূরা মায়িদা ৫ : আয়াত ৫১)


নয়: যদি কোন ব্যক্তি বিশ্বাস করে যে, সে শারিয়ার মধ্যে (আল্লাহর আইন) বিভিন্ন জিনিস যোগ করা বা কতিপয় বিষয় বাদ দেওয়ার মাধ্যমে ইসলামের উন্নতি সাধন করতে পারব তাহলে সে কাফির হয়ে যায়।
ইহার কারণ হচ্ছে আল্লাহ তা’য়ালার পরিপূর্ণভাবে সকল মানুষের জন্য তার নবী মুহাম্মদ(সা)-এর কাছে ইসলামের বাণী পাঠিয়েছেন এবং যদি কেউ এটা অস্বীকার করে তাহলে সে কুরআনের এই আয়াতের বিরুদ্ধে যায়:

“…আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।…”(সূরা মায়িদা ৫: আয়াত ৩)

দশ: মুহাম্মদ(সা)-এর প্রতি অবতীর্ণ বাণী শিক্ষা না করা অথবা সে অনুযায়ী কাজ না করার মাধ্যমে কেউ আল্লাহর বাণী থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে সে ইসলামের গন্ডির বাহিরে চলে যায়। আল কুরানে এর প্রমাণ হচ্ছে-
“যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের নিদর্শনাবলী দ্বারা উপদিষ্ট হয়ে তা হতে মুখ ফিরিয়ে নেয় তার অপেক্ষা অধিক যালিম আর কে? আমি অবশ্যই অপরাধীদের শাস্তি দিয়ে থাকি।” (সূরা সাজদা ৩২:আয়াত ২২)

মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ আরো বলেছেন:

“বল, ‘তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাস তবে আমাকে অনুসরণ কর, আল্লাহ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করবেন। আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ বল, ‘আল্লাহ ও রাসূলের অনুগত হও।’ যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে জেনে রাখ, আল্লাহ তো কাফিরদেরকে পছন্দ করেন না।” (সূরা আল ইমরান : ৩১-৩২)

এইগুলোই দশটি বিষয় যা কোন ব্যক্তির ইসলামকে অকার্যকর করতে পারে এবং যদি সে তার ভুলের জন্য আল্লাহর কাছে অনুতপ্ত না হয় এবং সে মৃত্যু বরণ করার আগে আবার ইসলাম গ্রহণ না করে তাহলে সে একজন মুশরিক (পৌত্তলিক) বা একজন কাফিরের মৃত্যুবরণ করে, আর তার গন্তব্যস্থল হয় অনন্ত কালের জন্য দোজখের আগুন এবং কোনদিনও জাহান্নামের আগুন থেকে বের করা হবে না।

ঈমানের সাথে সম্পর্কিত অতি প্রয়োজনীয় উপরে উল্লেখিত বিষায়াদির প্রতিটি মানুষের নিজে জানা, উপলদ্ধি করা এবং সেই সাথে অন্যকেও জানিয়ে দেয়া আমাদের প্রত্যেকের ঈমানী দায়িত্ব।
আসুন আমরা নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হই এবং এই বক্তব্যটি অন্যর কাছে পৌঁছে দেই।