করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে চিনা অর্থনীতি ধস

প্রকাশিত: ১১:৩৭ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২০

করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে চিনা অর্থনীতি ধস

আ বু ল ফ য়ে জ

লন্ডন থেকে ।
 ২০০২-০৩ সালে চিনে সারস্ (সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিন্ড্রোম) করোনা ভাইরাসের প্রকোপ ছড়ানোর পর সেই সংক্রমণে গোট বিশ্বে ৭৭৪ জন মারা গিয়েছিলেন। প্রায় দু’দশক পর সেই চিন থেকেই ছড়ানো আর এক করোনা ভাইরাসের (নভেল করোনাভাইরাস) সংক্রমণে চিন-সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট ১০১৮ জন মারা গিয়েছেন। সংক্রমণ ছড়িয়েছে বিশ্বের ৩০টি দেশে।
মৃত্যুর মাপকাঠিতেই শুধু নয়, বর্তমান করোনাভাইরাস সংক্রমণ বিশ্ব অর্থনীতিতেও গভীর ক্ষত সৃষ্টি করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞমহল। এর কারণ, ২০০২-০৩ সালে সারস্ করোনাভাইরাস সংক্রমণের পর গত ১৭ বছরে বিশ্ব অর্থনীতিতে চিনের অংশীদারিত্ব বহুগুণ বেড়েছে। গত ৪০ বছরে বার্ষিক ৭ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়ে চিন এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ অর্থনীতি — মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরেই। চিনের এই উল্কা গতির উত্থানে বিশ্ব বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু থেকে ছিটকে গিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র — চিন বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পণ্য রপ্তানিকারী দেশ। ২০০২-০৩ সালে বিশ্বের মোট উৎপাদনের প্রায় ৪ শতাংশ আসত চিন থেকে। এখন ওই অনুপাত চারগুণ বেড়ে হয়েছে ১৬ শতাংশ। চিন এখন তেল, তামা, আকরিক লোহা, কয়লা প্রভৃতি কাঁচামালের সবচেয়ে বড় আমদানিকারী দেশ।
ফলে, নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে চিনা অর্থনীতি যতটা ধাক্কা খাবে, ততটাই প্রভাব পড়বে বিশ্ব অর্থনৈতিক বৃদ্ধিতে। এবং, সেই প্রভাব থেকে পার পাবে না ভারতও। ভারতীয় অর্থনীতির বৃদ্ধির হার গত ১১ বছরের তলানিতে নেমে আসার অন্যতম প্রধান কারণ হিসাবে ইতিমধ্যেই বিশ্ব অর্থনীতির শ্লথতাকেই দায়ী করতে শুরু করেছে মোদী সরকার। এখন, নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি যদি আরও ঝিমিয়ে পড়ে তবে ভারতীয় অর্থনীতির দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর আশা অনেকটাই ক্ষীণ হয়ে যাবে।
২০১৭ সালে চিন-সহ একাধিক দেশের পণ্য আমদানির উপর সীমাশুল্ক বাড়িয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাণিজ্যযুদ্ধ ঘোষণার পর থেকেই বিশ্ব অর্থনৈতিক বৃদ্ধির টালমাটাল অবস্থা। এখনও সেই পরিস্থিতি পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা যায়নি। ২০০৭-০৮ সালে বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে ২০১০ সালে বিশ্ব অর্থনীতি ৪.৩ শতাংশ বৃদ্ধির পথে ঘুরে দাঁড়ানোর পর ফের তা নিম্নমুখী হতে শুরু করে এবং ২০১৯ সালে ওই বৃদ্ধির হার ২.৯ শতাংশ হবে বলে আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডার (আইএমএফ) তাদের পূর্বাভাসে জানিয়েছে। আইএমএফের আশা, ২০২০ সালে অবশ্য ওই বৃদ্ধি সামান্য বেড়ে ৩.৩ শতাংশ হবে।
কিন্তু, তখন নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণের কথা প্রকাশ্যে আসেনি। চিনের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর ফিনান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের ভাইস-চেয়ারম্যান জেং গ্যাং মঙ্গলবার এক রিপোর্টে মন্তব্য করেন, করোনা ভাইরাস সংক্রমণের কারণে ২০২০ সালে চিনের অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ১ শতাংশ পয়েন্ট কমে যাবে। উল্লেখ্য, সারস্ করোনাভাইরাস সংক্রমণের সময় (২০০৩ সালে) এক ত্রৈমাসিকে চিনের বৃদ্ধির হার ২ শতাংশ পয়েন্ট কমে গিয়েছিল। ২০১৯ সালে চিনের অর্থনীতি বৃদ্ধি পেয়েছে ৬.১ শতাংশ, যা ১৯৯০ সালের পর সবথেকে কম!
২০১৯ সালের গোড়া থেকেই ভারতের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার নিম্নমু্‌খী। রপ্তানি কমেছে, দেশের বাজারে ক্রেতাচাহিদা কমায় আমদানিও কমেছে। এ বার নভেল করোনাভাইরাসের প্রভাবে দেশের রপ্তানি-আমদানি আরও কমবে। এর প্রভাব ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি শিল্প ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে।
বিশেষজ্ঞ সংস্থা ক্যাপিটাল ইকনমিক্সের মুখ্য অর্থনীতিবিদ নীল শেরিংয়ের মতে, ‘অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিল্প সংস্থাগুলি চিনের সঙ্গে তাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক তৈরি করেছে। ফলে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন অর্থনৈতিকভাবে এক অন্যের সঙ্গে, বিশেষ করে, চিনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ দিকে, ২০০৭-০৮ সাল থেকে অর্থনৈতিক সঙ্কটের সঙ্গে যুঝতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলিও তাদের হাতিয়ার প্রায় নিঃশেষ করে ফেলেছে। বিশ্বের মোট জিডিপি বা উৎপাদনের অনুপাতে বিভিন্ন দেশের সম্মিলিত ঋণের পরিমাণ এতো বেশি আগে দেখা যায়নি। ফলে, দু’দশক আগে সারস্ সংক্রমণে বিশ্ব অর্থনীতির যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছিল এ বার সেই ক্ষতি অনেক বেশি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।’
নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে ফোক্সওয়াগন, টয়োটা, ডেইমলার, জেনারেল মোটরস, রেনো, হোন্ডা, হুন্ডাই প্রভৃতি প্রথম সারির গাড়ি তৈরির সংস্থাগুলি তাদের চিনের কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে। হুন্ডাই তো কোরিয়ায় তাদের সবচেয়ে বড় কারখানাও আপাতত বন্ধ করে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থা স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুওরসের অনুমান, করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বের বহুজাতিক গাড়ি সংস্থাগুলি চিনে তাদের জানুয়ারি-মার্চ ত্রৈমাসিকের উৎপাদন ১৫% পর্যন্ত কমাতে পারে।
গত দু’দশকে ভারত-চিন দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ৩৭গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৮,৭১০ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। কিন্তু, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হল, বিশ্বের যে সমস্ত দেশে সবচেয়ে বেশি চিনা পণ্য রপ্তানি হয় সেই তালিকায় ভারতের স্থান সপ্তম। ভারত থেকে চিনে যা রপ্তানি হয় তার ৫৬ শতাংশই আকরিক লোহা, ভেজিটেবল ফ্যাট, পশুখাদ্যের মতো কাঁচামাল। চিন থেকে আমদানি করা পণ্যের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন বৈদ্যুতিন পণ্য, বৈদ্যুতিক ও টেলিকম সরঞ্জাম, ওষুধ তৈরির কাঁচামাল ও রাসায়নিক পণ্য।

তথ্যসূত্র, অনলাইন সংবাদ পত্র বিভিন্ন সমাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ