“জীবহত্যা মহাপাপ” এবং কুরবানির পশু প্রসঙ্গ

প্রকাশিত: ১০:০৩ অপরাহ্ণ, জুলাই ৩১, ২০২০

“জীবহত্যা মহাপাপ” এবং কুরবানির পশু প্রসঙ্গ


শিকদার মুহাম্মদ কিব্রিয়াহ:

“জীবহত্যা মহাপাপ। এজন্যে, কুরবানির নামে পশু হত্যা করা যাবে না।” এটাকে পাশবিকতা, উন্মত্ততা এবং বর্বরতা ইত্যাদি অভিধায় উদ্ধৃত করেন অনেক ব্লগার ও লেখক। তাদের প্রতি যথাযথ সম্মান ও শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, প্রথমত: জীবমাত্রই হত্যা করা যাবে না—এ ধারণাটি যৌক্তিক নয়। এজন্যেই সঠিক নয়। এটিকে সংশোধিত আকারে যদি বলা যায়, অনর্থক বা অপ্রয়োজনে জীবহত্যা মহাপাপ, তবে তা যৌক্তিকভাবেই সঠিক বলে গ্রহণ করা যেতে পারে। কেননা, কোন জীব যদি মানবতার জন্য ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে এবং যদি কোন বিকল্প না থাকে, তবে তাকে মানবতার অনিবার্য প্রয়োজনেই হত্যা করে ফেলতে হবে। তবে বৈধ প্রক্রিয়ায়। আবার, আমরা মানুষ প্রতিনিয়ত মাছ, মাংস ইত্যাদি আমিষ জাতীয় খাবার খাচ্ছি মাছ, গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগ ইত্যাদি জীব বা প্রাণী “হত্যা” করেই। এ হিসেবে আমরা প্রতিদিন মহাপাপ করে চলছি। জীবহত্যা মহাপাপ হলে একই কারণে প্রাণিহত্যাও মহাপাপ হতে বাধ্য। আর তখন আমরা ভাত-রুটি, শাক-সবজি এসবও খেতে পারব না। কারণ, উদ্ভিদেরও প্রাণ আছে। উদ্ভিদের প্রাণ সংহার করেই এগুলো পেতে হয়। খেতে হয়। অতএব, এটি একটি অবাস্তব ধারণা। অপ্রাকৃতিক ধারণা। এজন্যেই তা অবৈজ্ঞানিক। প্রকৃতির নিয়ম তথা জীববিজ্ঞানের খাদ্যচক্র অনুসারে, মাংসভোজী প্রাণী তৃণভোজী প্রাণীকে খেয়ে বেঁচে থাকে। এভাবে অন্যান্য প্রাণীরা অন্যান্য প্রাণীদের খায়। মানুষ সর্বভুক প্রাণী। গরু-ছাগল-ভেড়া-দুম্বা-উটের খাদক তো মানুষই। অন্যান্য প্রাণীর খাদক যেমন অন্যান্য প্রাণী। তাহলে এটি হত্যা হবে কেন? এ তত্ত্বটি বিজ্ঞান ও প্রকৃতির বিরোধী। আর, যে ধর্ম, মত বা আদর্শ প্রাকৃতিক সত্যকে ধারণ করতে পারে না বা সংগতি রক্ষা করতে পারে না, সে-ই ধর্ম বা মতাদর্শ সত্য হতে পারে না।
দ্বিতীয়ত: কুরবানিকে পশুহত্যা, পাশবিক, হিংস্র, বর্বর ইত্যাদি বলা যেত, যদি ঈদের দিন সকালে দেখা যেত মুসলমানরা উদ্ধত কৃপাণ হাতে সশস্ত্র অবস্থায় দলে দলে বেরিয়ে পড়েছে, আর যেখানেই গরু বা ছাগল পাচ্ছে, তাকেই আল্লাহু আকবার বা উলুধ্বনি দিয়ে উৎসব করে হত্যা করে যাচ্ছে নির্বিচারে, যে যেভাবে পারছে সেভাবেই পশু নিধনে উন্মত্ত হয়েছে! যেন এ পশুগুলো সব রকম অশুভের প্রতীক বা কারণ। কিন্তু বাস্তব দৃশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। পশুটি এখানে ত্যাগের প্রতীক। কারণ, এটি বন্য বা বেওয়ারিশ নয়। এটি পালিত বা ক্রীত। এর সাথে মানসিক ও আর্থিক ত্যাগের প্রশ্ন জড়িত। এখানে পশুকে হত্যা করা হয় না। জবাই করা হয়। পদ্ধতিগত ভিন্নতা সুস্পষ্ট। বল্লম, বর্শা বা ছুরি দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বা কুপিয়ে কুপিয়ে আহত করে মারা হয় না। বরং ধারাল ছুরি দিয়ে গলার নরম অংশটি একটানে কেটে দেয়া হয় যাতে পশুটির অধিক কষ্টভোগ না হয়। কোনভাবেই এ-কে গো-হত্যা বা পশুহত্যা বলা যায় না। পশু জবাই করে খাওয়া বৈধ। যেমনটি খাওয়া হয়ে থাকে। কুরবানির সময় ভিন্ন কোন পাশবিক পদ্ধতি অবলম্বন করা হয় না।
তৃতীয়ত: পশু কুরবানি করা এখানে মুখ্য বিষয় নয়। বরং এটি একটি প্রতীকী বিষয়। যেমন, শহিদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা ও স্মরণে প্রতীকীভাবে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। প্রাণধর্মী উদ্ভিদের অংশ কেটে বাহ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পূর্ণ অর্থহীনভাবে আমরা ফুলের বিনাশ করি! কারণ, অর্পিত ফুলের ঘ্রাণ বা সৌন্দর্য কিছুই উপভোগ করেন না শহিদরা। যেহেতু তারা মৃত।এটি জেনেও আমরা এ অর্থহীন কাজটি করি। কোন প্রশ্ন করি না। অথচ, ইব্রাহিম আ:-এর ঐশী ঘটনার স্মারক হিসেবে যে পশু জবাই করা হয়, তা কোনভাবেই অর্থহীন কোন কাজ নয়। অবৈধ কোন কাজ নয়। স্বাভাবিক ও বিজ্ঞানসম্মত কাজ। যেহেতু জবাইকৃত পশুর মাংস কুরবানিদাতা নিজেও খেতে পারে, দানও করতে পারে। যেহেতু মাংস দান করার মৌলিক উদ্দেশ্যে এ কুরবানি দেয়া নয়, সেজন্য মাংসদানের পরিমাণের ওপর এক্ষেত্রে কোন বাধ্যবাধকতা নেই। এটি এজন্যেই ঐচ্ছিক। তবে নিজে সম্পূর্ণটা না খেয়ে গরিবদের অংশবিশেষ বিলিয়ে দেয়া অবশ্যই উত্তম ও সওয়াবের কাজ হবে। কিন্তু যেহেতু এটিই মূল বিষয় নয়, এজন্যেই এটিকে কুরবানির অনিবার্য বিষয় করা হয় নি। করা হলে এটি হয়ে যেতো মূখ্য বিষয়, আর মূখ্য বিষয়টি হয়ে যেতো গৌণ।

মূল বিষয়:
আল্লাহ ইব্রাহিম(আ:)-এর আনুগত্যের পরীক্ষা নিতে গিয়ে ইব্রাহিমকে আদেশ করলেন সবচেয়ে প্রিয়বস্তু কুরবানি দিতে। ইব্রাহিমের কাছে তাঁর ছেলে ইসমাইল ছিলেন সবচেয়ে প্রিয়। তাই তিনি ইসমাইলকে কুরবানি দিতে উদ্যত হলেন। কিন্তু মহান আল্লাহ মানুষ বলিদানের বদলে ঐশী ব্যবস্থাপনায় একটি দুম্বা জবাই করিয়ে নিলেন। অর্থাৎ একটি স্বাভাবিক, বিজ্ঞানসম্মত, বৈধ ও প্রচলিত ব্যবস্থার মাধ্যমে কুরবানির স্পিরিটটাকে কবুল করে নিলেন। সেই থেকে বৈধ পশু কুরবানির মাধ্যমে আল্লাহর জন্যে ত্যাগের এই প্রতীকী আনুষ্ঠানিকতা সামর্থ্যবান মুসলমানদের জন্য ওয়াজিব করে দেয়া হল। ত্যাগের অনুভূতিশীল ঘটনার স্মারক হিসেবে।