নেতৃত্বহীন ও মেধাশুন্য জাতি সৃষ্টির এক মহাপ্রয়াস বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞ

প্রকাশিত: ৫:০৮ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৪, ২০২০

নেতৃত্বহীন ও মেধাশুন্য জাতি সৃষ্টির এক মহাপ্রয়াস বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞ


মুহাম্মদ শামসুল ইসলাম:

মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে পাকিস্তানিরা ছিন্নভিন্ন এবং তাদের পরাজয় অনিবার্য তখন তারা বাঙালি জাতিকে নেতৃত্বহীন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়ায় পরিণত করার উদ্দেশ্য বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনা করে।
পশ্চিম পাকিস্তানের দীর্ঘ  চব্বিশ বছরের শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আন্দোলন সংগ্রামের পাশাপাশি বুদ্ধিজীবী সমাজের বৌদ্ধিক প্রেরণায় শাণিত হতে থাকে বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্ন। অবশেষে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাঙালির জীবনে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। প্রায় ২৪ বছরের পাকিস্তানি শাসনের জুলুম, নিপীড়ন, নির্যাতন ও বৈষম্যকে চ্যালেঞ্জ করে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করেন। ফলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর প্রধান লক্ষ্যবস্তুত হয় এদেশের বুদ্ধিজীবী শ্রেণি। ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ রাতে অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে বাংলাদেশে যে গণহত্যা শুরু হয়, তার অন্যতম লক্ষ্যবস্তু ছিলেন বুদ্ধিজীবী মহল। তাই প্রথম রাত থেকে শুরু করে একেবারে শেষদিন পর্যন্ত এ নিধন-প্রক্রিয়া চলেছে সুসংগঠিত ও সুপরিকল্পিত উপায়ে। বুদ্ধিজীবীরা পাকিস্তানি শাসকচক্রের সব সময় বিরাগবাজন ছিল।সেজন্য তারা নির্দয় ও নির্মমভাবে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছিল।
আমরা জানি, ২৫ মার্চের রাত থেকেই শুরু হয় মূলত বুদ্ধিজীবী নিধনযজ্ঞ এবং ১৪ ডিসেম্বর সেটার চূড়ান্ত রূপ প্রকাশ পায়। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মহান মুক্তিযুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয়ের প্রাক্কালে ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আল বদর ও আল শামস বাহিনীসহ ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং তাদের স্থানীয় সহযোগীরা, বিশেষত চরমপন্থী-ডানপন্থী ইসলামপন্থী মিলিশিয়া গ্রুপ আল-বদর, বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান হাজার হাজার বরেণ্য শিক্ষাবিদ, গবেষক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, চিকিৎসক, শিল্পী, কবি, দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক ও সাহিত্যিককে রাতের অন্ধকারে চোখ বেঁধে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায়। তাদের ওপর নির্মম অত্যাচার চালিয়ে নারকীয়ভাবে হত্যা করা হয়। হত্যার পর ঢাকার মিরপুর, রায়েরবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় বুদ্ধিজীবীদের ক্ষত-বিক্ষত লাশ ফেলে রাখা হয়। অনেকের লাশ শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি এবং অনেকের লাশ পাওয়াও যায়নি।
জানা যায় যে, বুদ্ধিজীবী নিধনের নীলনকশা পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর নেতৃত্বে নুন্যতম দশ জনের একটি কমিটি প্রণীত হয়।বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর গভর্নর হাউজে ফেলে যাওয়া রাও ফরমান আলীর ডায়েরীর পাতায় বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের একটি তালিকা পাওয়া যায় (যাঁদের অধিকাংশই ১৪ ডিসেম্বরে নিহত হন)। ডায়েরীর পাতায় এই তালিকার কথা ফরমান আলী নিজেও স্বীকার করেন, যদিও তিনি বুদ্ধিজীবীদের গণহত্যার দায়িত্ব অস্বীকার করেছেন। পাকবাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমীর আবদুল্লাহ খান নিয়াজীর সার্বিক নির্দেশনায় নীলনকশা বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেন ব্রিগেডিয়ার বশির, লেফটেন্যান্ট কর্নেল হেজাজী, মেজর জহুর, মেজর আসলাম, ক্যাপ্টেন নাসির ও ক্যাপ্টেন কাইউম। অভিযোগ রয়েছে যে, চরম ডানপন্থী ইসলামী আধাসামরিক আল-বদর ও আল-শামস বাহিনীর সশস্ত্র ক্যাডাররা পাকবাহিনীর অস্ত্র সাহায্য নিয়ে তাদেরই ছত্রছায়ায় এই বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত করে।
যাদের হত্যা করা হয়েছিল তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন এ এন এম মুনীর চৌধুরী, ড. জিসি দেব, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, আনোয়ার পাশা, ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, আবদুল মুকতাদির, এস এম রাশীদুল হাসান, ড. এন এম ফয়জুল মাহী, ফজলুর রহমান খান, এ এন এম মুনীরুজ্জামান, ড. সিরাজুল হক খান, ড. শাহাদাত আলী, ড. এম এ খায়ের, এ আর খান খাদিম, মো. সাদেক, শরাফত আলী, গিয়াসউদ্দিন আহমেদ, অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলেন অধ্যাপক মীর আবদুল কাইয়ুম, হবিবর রহমান, সুখরঞ্জন সমাদ্দার, ড. আবুল কালাম আজাদ। সাংবাদিক ছিলেন সিরাজুদ্দীন হোসেন, শহীদুল্লাহ কায়সার, খোন্দকার আবু তালেব, নিজামুদ্দীন আহমদ, আ ন ম গোলাম মোস্তফা, শহীদ সাবের, শেখ আবদুল মান্নান (লাডু), সৈয়দ নজমুল হক, এম আখতার, আবুল বাসার, চিশতী হেলালুর রহমান, শিবসদন চক্রবর্তী, সেলিনা পারভীন। এছাড়া শিল্পী আলতাফ মাহমুদসহ এক হাজার একশত এগার জন বুদ্ধিজীবী।
একাত্তরের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের কারণ উদঘাটন করতে হলে পাকিস্তান আমলের সেই পঁচিশ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা অনুধাবন করতে হবে। ১৯৪৭ থেকে ৭১-এই সময়ের মধ্যে পূর্ব বাংলার অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে উল্লেখজনক পরিবর্তন ঘটে। জমিদারি প্রথার অবসান ঘটার ফলে ধীরে ধীরে সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার উচ্ছেদ ঘটেছে। সেই সঙ্গে নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণিরও জন্ম হতে থাকে। তাদের মন-মানসিকতায় পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগে। সমাজের ভেতর এই মৌলিক পরিবর্তনের ধারা আমাদের সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক আন্দোলনকে প্রভাবিত করেছে।
বাঙালিরা বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মাধ্যমে পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের গণ্ডি থেকে বের হয়ে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদে’ প্রবেশ করে। বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনের দ্বারা এই জাতীয়তাবোধের যে উন্মেষ ঘটেছিল, পরবর্তীতে সেটার অগ্রগতিতে মূল অবদান ছিল তৎকালীন বুদ্ধিজীবীদেরই। উর্দু-ফারসি-আরবি শব্দ মিলিয়ে বাংলা ভাষাকে মুসলমানি চেহারা দেওয়ার চেষ্টা এবং আরবি হরফে বাংলা লেখার প্রচলনের চেষ্টার বিরুদ্ধেও বুদ্ধিজীবীরা ছিলেন সরব। এমনকি পাকিস্তান জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী অনেক কবিও ব্যঙ্গাত্মক কবিতার মাধ্যমে পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিভিন্ন পদক্ষেপের সমালোচনা করেছিলেন।
পাকিস্তানিদের এই ক্রোধের পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের পিছনে লুকিয়ে ছিল আরও একটা কারণ। কোন জাতির বিবেক জাগ্রত করার জন্যে যেমন প্রয়োজন বুদ্ধিজীবীর, তেমনি জাতিকে নির্জীব করার জন্যে প্রয়োজন বুদ্ধিজীবীশূন্য করে দেয়া। যদি বাঙালিরা যুদ্ধে জিতেও যায় তবে যেন মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারে সেটাও ছিল তাদের বুদ্ধিজীবী নিধনের অন্যতম উদ্দেশ্য। তাই পরাজয় যখন নিশ্চিত তখন শাসকচক্র বেপরোয়া হয়ে ওঠে – যার প্রমাণ পাওয়া যায় ১৪ ডিসেম্বরের ঘটনায়। গ্রেফতারকৃত এক আলবদর দাবি করেছিল আরও কিছু দিন সময় পেলে সকল বুদ্ধিজীবীদেরকেই হত্যা করে ফেলা হত। ১৪ ডিসেম্বর পৃথিবীর ইতিহাসের এক কালো অধ্যায় প্রতিবছর ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে পালন করা হয় বুদ্ধিজীবী দিবস। ঢাকার মোহাম্মদপুর থানার রায়ের বাজারে নির্মাণ করা হয় শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ।আমি সকল শহীদ বুদ্ধিজীবীদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি,আমিন।
তথ্যসূত্র:
১) ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী, পূর্ব বাংলার সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন ১৯৪৭-১৯৭১
২) মুনতাসির মামুন ও জয়ন্তকুমার রায়, মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি: সিভিল সমাজের সংগ্রামের ২৫ বছর।
৩) হাসান হাফিজুর রহমান, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র।
৪) বদরুদ্দীন উমর, বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদের সামাজিক খুঁটি বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা , সংস্কৃতি, ২০১৬।
৫) বাংলা পিডিয়া । ৬)দৈনিক প্রথম আলো।৭)দৈনিক ইত্তেফাক।
লেখক , প্রভাষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, গোয়াইনঘাট সরকারি কলেজ, সিলেট।