পরনিন্দা ঈমান ও আমল ধ্বংস করে দেয়

প্রকাশিত: ১:৩৩ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৮, ২০২০

পরনিন্দা ঈমান ও আমল ধ্বংস করে দেয়

ধর্ম ডেস্কঃমানুষের চারিত্রিক গুণাবলীই তার বিকাশ ঘটায়। সৎ আচরণ ব্যক্তিকে করে মহান আর সমাজ ও পারিপার্শ্বিকতাকে করে সুন্দর। একটু নজর ফেরালেই দেখা যায়, গীবত বা পরনিন্দা সুন্দর পরিবেশকে নষ্ট করে। ঈমান ও আমল বরবাদ করে দেয়। শুধু তাই নয়, সৃষ্টি করে হিংসা-বিদ্বেষ ও অশান্তি। নিন্দার এই কুৎসিত রূপ সম্পর্কে আমরা অনেক সময় সচেতন থাকি না।

গীবত এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে- অপবাদ, অসাক্ষাতে নিন্দা, কুৎসা রটনা, কলঙ্ক রটনা, কারো চরিত্র হননের জন্য বিবৃতি দেয়া ইত্যাদি। ইসলামী পরিষাভায় গীবত হচ্ছে কারো সম্বন্ধে তার অনুপস্থিতিতে এমন কোনো কথা বলা, যা শুনলে অপ্রিয় মনে হবে। অপরের দোষের দিকে দৃষ্টি রেখে যে কথা বলা হয়, তাই গীবত। গীবত সম্পর্কে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)- এর যেসব হাদীস রয়েছে এগুলোর মর্ম হচ্ছে ‘যা সম্মুখে বললে মনে বিরক্তি ও কষ্ট আসে, অগোচরে তা বলাই গীবত।’

আমরা আড়ালে মানুষের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দোষ চর্চায় মেতে উঠি। অনেক সময় এই দোষ চর্চা নোংরা আলোচনায় গড়ায়। পরনিন্দা সম্পর্কে মহান রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন- ‘তোমাদের মধ্যে কেউ যেন পরনিন্দায় লিপ্ত না হয়। তোমাদের কেউ কি মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়া পছন্দ করবে। এটা যেমন তোমরা ঘৃণা কর তেমনি পরনিন্দা সম্পর্কেও তোমাদের ঘৃণা থাকা উচিত।’

পরনিন্দা সম্পর্কে আমাদের রাসূল (স.) ইরশাদ করেছেন, ‘পরনিন্দা ব্যভিচারের চেয়েও ঘৃণ্য ও জঘন্যতম। পরনিন্দাকারী এবং পরনিন্দা শ্রবণকারী উভয়ই সমান অপরাধী।’

কিন্তু বাস্তবতা হলো- পরনিন্দা মহামারী আকারে আমাদের সমাজে বিষ ছড়াচ্ছে। পরনিন্দার উৎস হচ্ছে গর্ব ও অহংকার। অনেক সময় আমরা এর জোরে মানুষকে খাটো করে দেখি, দোষ-গুণ বিচার না করেই মিথ্যার আলোকে পরচর্চা করি। অন্যদিকে বংশ, সামাজিক প্রতিষ্ঠা, রূপ, সৌন্দর্য্য ও বিদ্যা-বুদ্ধির জোরেও মানুষকে নির্বোধ ও বোকা ভাবি এবং পরনিন্দায় নিজের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ রাখতে চাই। শেখ সাদী (র.) বলেছেন, তোমার পূর্ব-পুরুষ কোনো এককালে শাহী দরবারের ঝাড়ুদার ছিল কি না সেটা বড় কথা নয়, তুমি কি, সেটিই হচ্ছে বড় পরিচয়।’

সব ধরনের অশ্লীলতা ও অশালীন উক্তি ইসলামে নিষিদ্ধ। যে কথা শুনে মানুষ কষ্ট পায়, তাই অশালীন। কারো সম্পর্কে অপ্রীতিকর বাক্য না বলাই হচ্ছে শালীনতা। ইসলামের আগমন হয়েছে মানুষকে শালীনতা ও সৌহার্দ্য শিক্ষা দেয়ার জন্য। তাই শালীনতাকে ইসলাম মানুষের মর্যাদার মাপকাঠি হিসাবেও নির্ধারণ করেছে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে ‘আল্লাহ তা’য়ালার নিকট ওই ব্যক্তি বেশি মর্যাদাবান যে বেশি শালীন ও পরহেজগার।’

আমাদের অনেকের মধ্যে একটি ভুল ধারণা রয়েছে যে, পাপীর পাপ সম্পর্কে উল্লেখ করলে কিংবা যার যে দোষ আছে তা অন্যকে বললে গীবত হয় না। বরং এ ধরনের গর্হিত কাজের নিন্দা করা পুণ্যের কাজ। এই ধারণা ঠিক নয়, বিভ্রান্তিমূলক। যার মধ্যে যে দোষ নেই, তা যদি বলা হয়, তাহলে তা হবে মিথ্যা অপবাদ। আর যদি সত্যি হয়, তখন তা হবে গীবত। এই প্রসঙ্গে নবী করীম (সা.) বলেছেন, ‘কারো সম্বন্ধে তার অগোচরে এমন কোনো কথা যদি বলা হয়, যা শুনলে তার নিকট অপ্রীতিকর বোধ হয়, তবে সে কথা সত্য হলেও গীবত।’

ইমাম গাযযালী (রা.) তার ‘কিমিয়ায়ে সা’দাত’ গ্রন্থে গীবতের সংজ্ঞা দিয়ে বলেছেন, অন্যের দেহ, বংশ, বসন-ভূষণ, ভাবভঙ্গি, ক্রিয়াকলাপ, কথোপকথন ও গৃহের কোনো দোষ বের করে কিছু বললেই তাকে গীবত বলে।

দীর্ঘ দেহবিশিষ্ট লোককে লম্বু, খর্ব লোককে বামুন, কালো লোককে নিগ্রো, উজ্জ্বল লোককে সাদা, টেরা ইত্যাদি বললে দেহ সম্পর্কে গীবত হয়ে যায়। কোনো ব্যক্তিকে কোনো হীন পেশাদারের সন্তান বললে তার বংশ সম্বন্ধে গীবত হয়ে যায়। কাউকে নিন্দুক, মিথ্যাবাদী, গর্বিত, কাপুরুষ, অলস ইত্যাদি বললে তার প্রকৃতি সম্পর্কে গীবত করা হয়। কাউকে বিশ্বাসঘাতক, আমানত খেয়ানতকারী, অসংযমী, অতিরিক্ত আহারকারী, হারামখোর, অধিক নিদ্রা যায়, পোশাক পরিচ্ছদ পরিষ্কার রাখে না, আয় অনুযায়ী ব্যয় করে না ইত্যাদি তার ক্রিয়াকলাপ সম্বন্ধে গীবত। কারো সম্পর্কে যদি বলা হয়, তার পোশাক বেসামাল, আস্তিন ঢিলা, আচল দীর্ঘ তা হলে তার বসন-ভূষণ সম্পর্কে গীবত করা হলো। গীবত কেবল মুখ দ্বারাই হয় না। চোখ, হাত এবং ইঙ্গিত দ্বারাও গীবত হয়ে থাকে। সব ধরনের গীবতই হারাম। হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আমি একদিন মহানবির নিকট ইশারায় প্রকাশ করেছিলাম যে, অমুক মহিলা বেটে। নবী করিম (সা.) বললেন, হে আয়েশা তুমি গীবত করলে।’

গীবত করা যেমন নিষেধ তেমনি গীবত শোনাও নিষেধ। যে গীবত শুনে, সেও গীবতের পাপের অংশীদার হয়ে যায়। গীবত শোনাও যে পাপ তার সমর্থনে হাদিস হচ্ছে- ‘একদিন হযরত আবু বকর (রা.) ও হযরত উমর (রা.) একসাথে সফর করছিলেন। এমন সময় একজন অপরজনকে বললেন, ‘অমুক ব্যক্তি অতিরিক্ত নিদ্রা যায়।’ তারপর তারা রুটি খাবার জন্য তরকারি চাইলে, নবী করিম (সা.) বললেন, ‘তোমরা উভয়েই তো তরকারি খেয়েছো।’ তারা বললেন, কি খেয়েছি আমরা জানি না। নবী করীম (সা.) বললেন, ‘তোমরা নিজের ভাইয়ের মাংস খেয়েছো’। এ হাদিস থেকে জানা যায়, ‘অমুক ব্যক্তি অতিরিক্ত নিদ্রা যায়’ কথাটি একজন বলেছেন অন্যজন শুনেছেন। অথচ নবী করীম (সা.) উভয়কে গীবতের অপরাধী করলেন।

গীবত বা পরনিন্দাকে নবি করিম (সা.) অত্যন্ত কঠোর ভাষায় নিন্দা করেছেন এবং এর পরিণাম সম্পর্কে তার উম্মাহকে অবহিত করেছেন। হযরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে তিনি বলেন, ‘ইসা ইবনে মালিকিনা আসলামী নবি করিম (সা.)-এর নিকট এসে চতুর্থবারের মতো ব্যভিচারের স্বীকারোক্তি দেয়ায়, তিনি তাকে প্রস্তরাঘাতে হত্যার আদেশ দেন। অতঃপর নবি করিম (সা.) ও কতিপয় সাহাবা (রা.) তার পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। তখন তাদের মধ্য থেকে একজন বলে উঠলেন, এই বিশ্বাসঘাতকটা কয়েকবারই নবি করিম (সা.)- এর নিকট আসে এবং প্রত্যেকবারই রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে ফিরে যেতে বলেন, অতঃপর যেভাবে কুকুর হত্যা করা হয়, তেমনি তাকে হত্যা করা হয়। নবী করীম (সা.) এ কথা শুনে মৌনতা অবলম্বন করেন। এরপর তারা যখন একটি মৃত গাধার পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন এবং গাধাটি ফুলে যাওয়ায় এর পাগুলো উপরের দিকে উঠেছিলো, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘তোমরা দুজনে এটা খাও। তারা বললেন, গাধার মৃত দেহ খেতে বলেছেন হে রাসুল! তিনি বললেন, কেনো তোমাদের ভাইয়ের সম্মানহানীর মাধ্যমে ইতিপূর্বে তোমরা যা অর্জন করেছো, তা এর তুলনায় অধিক বেশি গর্হিত!’

গীবতের পরিণাম সম্পর্কে নবি করিম (সা.) আরো বলেছেন, ‘আগুন যেমন শুকনো কাঠ জ্বালিয়ে ভস্মীভূত করে ফেলে, গীবতও তদ্রূপ মানুষের সওয়াবসমূহ ধ্বংস করে ফেলে।’

গীবত পরিহার করে চলা কঠিন কোনো কাজ নয়। নবি করিম (সা.) এটাকে কোনো কঠিন কাজ বলে মনে করেননি। হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা) থেকে একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, ‘একদিন আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)- এর সাথে ছিলাম। তিনি এমন দুটি কবরের পাশে উপনীত হলেন যেগুলোর অধিবাসিরা আজাবে লিপ্ত ছিল। তিনি বললেন, ‘এরা কোনো কঠিন বা গুরুতর ব্যাপারে শাস্তি পাচ্ছে না। তাদের মধ্যে একজন লোক গীবত করে বেড়াতো, আর অপরজন পেশাব হতে সতর্ক থাকতো না। অতঃপর তিনি একটি কিংবা দু’টি তাজা খেজুরে ডাল এনে তা ভেঙে কবরের উপর গেড়ে দিতে নির্দেশ দিয়ে বললেন, যতক্ষণ পর্যন্ত এ ডাল দুটি তাজা থাকবে কিংবা শুকিয়ে যাবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের শাস্তি হালকা করে দেয়া হবে।’

ইমাম গাযযালী (রা) তার রচিত কিমিয়ায়ে সাদাত নামক গ্রন্থে গীবত থেকে বাঁচার কিছু উপায় ও প্রতিষেধক বর্ণনা করেছেন। তিনি গীবতকে একটি রোগ বা অসুখ বলে আখ্যায়িত করে এ রোগের জ্ঞানমূলক ও অনুষ্ঠানমূলক দুটি ওষুধের কথা বলেছেন-
এক. জ্ঞানমূলক ওষুধ হচ্ছে- পবিত্র কুরআন ও হাদিসে গীবতের ক্ষতি ও অনিষ্ট সম্পর্কে যা বলা হয়েছে তার মর্ম উপলব্ধি করে তার ওপর দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস স্থাপন করা। দ্বিতীয়ত নিজের দোষ অনুসন্ধান করা। নিজের দোষ বের হওয়ার পর মনে করতে হবে, আমার ন্যায় অন্যেরও দোষ থাকা অসম্ভব নয়। নিজে যেহেতু দোষ থেকে বাঁচতে পারিনি, সেহেতু অন্যের দোষ দেখে এতো বিস্মিত হওয়ার কি আছ।

দুই. মানুষ যেসব কারণে গীবত করে তার প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

মানুষ যেসব কারণে গীবত করে ইমাম গাযযালী (রা.) এর সংখ্যা আটটি উল্লেখ করেছেন-
১. ক্রোধ, কেউ কারো প্রতি ক্রোধাম্বিত হলে সে তার গীবতে লিপ্ত হয়। সুতরাং ক্রোধ দমন করলেই এসব গীবত থেকে বাঁচা যায়।
২. কারো সন্তুষ্টি লাভের জন্য ওই ব্যক্তির শত্রুদের গীবত করা হয়। এ অবস্থায় মনে করতে হবে কোনো মানুষের সন্তুষ্টি লাভের জন্য আল্লাহতালার অসন্তুষ্টি অর্জন করা নির্বুদ্ধিতা ও মূর্খতা ছাড়া আর কিছু নয়।
৩. নিজের দোষ হতে বাঁচার জন্য অপরের দোষ উদঘাটন, নিজের দোষ ঢাকার জন্য অপরের দোষ প্রকাশ করে আল্লাহতালার অসন্তুষ্টি অর্জন করা কখনো সঙ্গত হতে পারে না। এটা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
৪. নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশের জন্য অন্যের নিন্দা করা। অনেকে নিজেকে জ্ঞানী হিসেবে উপস্থাপনের জন্য বলে থাকে, অমুকে এ ব্যাপারে কিছুই বোঝে না। এসব উক্তিতে মূর্খ ও দুর্বলেরা তার ভক্ত হলেও জ্ঞানী ও বুদ্ধিমানেরা তার ভক্ত হয় না। মূর্খ ও দুর্বলদের কাছে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করার জন্য পরম পরাক্রমশালী আল্লাহতা’আলার বিরাগভাজন হওয়া কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
৫. নিজের যোগ্যতা দিয়ে যারা মান-সম্মান অর্জন করেছে, ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তির কাছে তা সহ্য হয় না। কারণে-অকারণে সে ওই সম্মানিত ব্যক্তির দোষ অম্বেষণ করতে থাকে এবং ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হয়। এসব ব্যক্তি দুনিয়াতে ঈর্ষার অনলে দগ্ধ হয়, আর আখিরাতে জাহান্নামের আগুনে দগ্ধ হয়। হিংসুকের হিংসায় সম্মানিত ব্যক্তির সম্মান এতোটুকুও লাঘব হয় না। ক্ষতি হিংসুকেরই হয়।
(৬) অনেক সময় মানুষ মজা করা কিংবা অন্যকে অপদস্থ করার উদ্দেশ্যে তার ক্রিয়াকলাপ নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ ও উপহাসে মত্ত হয়। উপহাসকারী যদি বুঝত যে তার এই উপহাস তাকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাচ্ছে তা হলে সে উপহাসকারী না হয়ে হাস্যাস্পদ হওয়ার প্রত্যাশা করতো, কেনো না হাশরের দিন হাস্যাস্পদের পাপের বোঝা উপহাসকারীর কাঁধে চড়িয়ে দেয়া হবে।
(৭) অনেক সময় পরহেজগার ব্যক্তিরাও পাপের আলোচনা করতে গিয়ে পাপীর নামও উল্লেখ করে ফেলেন। লক্ষ্য করেন না যে, এটা গীবতের মধ্যে গণ্য হয়ে যায়। সুতরাং পাপাচার নিয়ে আলোচনা করার সময় সতর্ক থাকতে হবে, যাতে কখনো কারো নাম উচ্চারিত না হয় এবং কারো প্রতি ইঙ্গিত করা না হয়।
(৮) মূর্খতা মানুষের জন্য বড় অভিশাপ। অনেকে জানেই না যে, কোন্ কথা গীবতের মধ্যে পড়ে, আর কোন্ কথা গীবতের মধ্যে পড়ে না। তবে অনিষ্টকর ব্যক্তির ক্ষতি হতে জনসাধারণকে সচেতন করার উদ্দেশ্যে অনিষ্টকারীর নাম নেয়া বৈধ। এটা গীবতের মধ্যে পড়ে না। অনুরূপভাবে বিচারকের সামনে সাক্ষী হিসেবে পাপীর নাম নেয়া গীবত নয়। যারা প্রকাশ্যভাবে পাপ করে এবং পাপকে দোষের মনে করে না তাদের নাম নেয়া গীবত নয়।