পরাজিত প্রজন্ম

প্রকাশিত: ৬:৩৫ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২, ২০২০

পরাজিত প্রজন্ম


শিকদার মুহাম্মদ কিব্রিয়াহ:
নির্ঘুম সারা রাতের ক্লান্তি মাস্টারবাবুর কাঁচাপাকা কুঁকড়ানো ঘনচুল ভরা মাথাটাকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে চায়। অব্যাহত হতাশার অমানিশা—মেঘে ঢাকা আকাশ! একটুখানি পূর্ণিমার পরশ পাবার শেষ আশাটুকুও মৃত নগরে নোঙর ফেলে অসহায় নাবিকের মত। বিনিদ্র রাতভরে করোটির ভেতর মগজের কোরকগুলো চরকপূজার চরকির মত ঘুরপাক খেয়েছে। তবুও নিরাশার অন্ধকার কেটে আশার আলোর মশাল জ্বেলে এগিয়ে আসবে কেউ—এমন কারও অস্তিত্ব আবিষ্কার করতে পারলেন না তিনি।
পুব আকাশে তেজী সূর্যের তীব্র আলোর ঝলক। কিন্তু এ-আলোর ঝলক মাস্টারবাবুর জন্যে কোন আশীর্বাদ হয়ে আসে না ; বরং তীব্র দহনে রাতজাগা অসহ্য দু’টি চোখে জ্বালা ধরে। নোনাজল ঝরে। তিনি ঘুরে বসেন। পশ্চিমমুখী। পশ্চিম আকাশের সুনীলে ভাসছে ক’খণ্ড বিবাগী মেঘ। মাস্টারবাবুর মনটি মাংসের পিঞ্জর ছেড়ে ভেসে চলে মেঘের দেশে। পৃথিবীবিমুখ চিল হয়ে। শরীরটা প’ড়ে থাকে মৃত্তিকার জমিন আঁকড়ে ধরে। শুকনো একজোড়া ঠোঁট ফসকে বেরিয়ে আসে নির্লিপ্ত-উদাস বিষণ্ণ ক’টি উচ্চারণ—মাটি! আহারে মাটি! চিতায় পোড়ে ছাই হয়ে যাবার পরও তোর কোলেই আশ্রয় নিতেই হয়! আমার এ-ই মনটা কেমন অনায়াসে চড়ে বসেছে মেঘের ভেলা—তুই আটকে রাখতে পারিস নি! কিন্তু আমার বেহায়া শরীরটা ঠিকই তোকে জড়িয়ে প’ড়ে আছে! তোকে ছাড়তে চায় না—তুইও ছাড়বি না—ঘুরাবি শুধু! অথচ একদিন সত্যি-সত্যিই চলে যাব—সকল অস্পৃশ্যতা আর স্বার্থপরতার উর্ধ্বগামী কোন এক জগতে!
মাস্টারবাবু। নরেন্দ্র নাথ। কে পি হাইস্কুলের গণিতের শিক্ষক। বয়স পয়তাল্লিশ। কিন্তু বেশিরভাগ সাদা চুলের নিচে পাওয়ারফুল চশমা, নীরব ধ্যানী পথচলা, স্বল্পভাষী কালো মানুষটাকে একজন বিদগ্ধ-প্রাজ্ঞ প্রফেসরের অবয়বে উপস্থাপন করে। আজন্ম উদারপ্রাণ মানবিক মনের সরল-আবেগী মানুষটা আজ জীবনের সংঘাত-সংক্ষুব্ধ মোহনায় এসে দাঁড়িয়েছেন। শিক্ষকতার জন্যে প্রতিদিন আট মাইল হাঁটাপথের মৃত্তিকায় টপ টপ করে ঝরে প’ড়া ঘামের বিনিময়ে অর্জিত বিন্দু বিন্দু সঞ্চয়ে খরিদ করেছিলেন একখণ্ড জমি—মাথাগোঁজার আবহমান নিয়মে। কিন্তু নির্বিরোধ-শান্তিপ্রিয় মানুষটার পিছু ধাওয়া করে বিবাদ-বিসম্বাদ। যে প্রাচুর্যাভিমান, কৌলিন্যের কৃত্রিমতা, স্বার্থপরতা আর ষড়যন্ত্রের নাগপাশ থেকে মুক্তির মানবিক প্রত্যয়ে স্বগ্রাম ছেড়ে এসেছেন তিনি চৌদ্দহাতি গ্রামে ; প্রকৃতির শান্ত-স্নিগ্ধ-শ্যামল-সবুজ আশ্রয়ে একটুখানি শান্তির আবাস গ’ড়ে নিতে—এখানেও স্বার্থপর বিরোধিতার কালোস্রোত মাস্টারবাবুকে আবারও অসহায় করে তোলে। [চলবে]