পাহাড়কণ‍্যা লোভাছড়ার সান্নিধ্যে আনন্দময় একদিন

প্রকাশিত: ৩:৪৮ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ৪, ২০২০

পাহাড়কণ‍্যা লোভাছড়ার সান্নিধ্যে আনন্দময় একদিন

মুহাম্মদ শামসুল ইসলাম:

রূপের রাণী নয়ানাভিরাম সৌন্দর্য্যের আধার প্রকৃতির সৃষ্ট পাহাড়কণ‍্যা কানাইঘাটের লোভাছড়া। প্রকৃতি যেন তাঁর মনের মাধুরি মিশিয়ে রামধনুর সাত রং দিয়ে রূপের ঢালি সাজিয়ে রেখেছে লোভাছড়ার প্রতিটি পরতে পরতে।
মহান দার্শনিক সক্রেটিসের “Know thyself” (নিজেকে জানো) এবং বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া…” এই অনুভূতি থেকে প্রেরণা নিয়ে আমি ও বড় ভাই বাবলু আহমদ সকাল নয়টা ত্রিশ মিনিটের সময় গোলাপগঞ্জ বাজার  হইতে মোটর বাইক যোগে কানাইঘাটের পাহাড়কণ‍্যা খ‍্যাত লোভাছড়ার উদ্দেশ্য  যাত্রা শুরু করি। র্দীঘক্ষণ ড্রাইবের পর সকাল দশটা ত্রিশ মিনিটের সময় ঐতিহ্যবাহী কানাইঘাট বাজারে পৌছলাম।
(তবে কেউ  ইচ্ছে করলে গোলাপগঞ্জ বাজারের নুরজাহান সিএনজি পাম্প হইতে সিএনজি চালিত আটো টেক্সি করে অনাসায়ে কানাইঘাট বাজারে পৌছাতে পারবে,ভাড়া জন প্রতি ষাট টাকা।)
যাত্রা পথের ক্লান্ত শরীরের অবসাদ দূর করতে চা-এর কাপে চুমুক দিতেই আমাদের সাথে যোগ দেন প্রাক্তন কলিগ বন্ধুবর মাসুক আহমদ। বিশ মিনিটের বিরতি দিয়ে কানাইঘাট উত্তর বাজারের নদী ঘাট থেকে নৌকা নিয়ে ছুটলাম পাহাড় ও নদীর সঙ্গম স্থল লোভাছড়ার সান্নিধ্যে। আকাঁ-বাঁকা সাপের মতো ও কুয়াশায় আচ্ছাদিত সুরমা নদীর শান্ত শীতল পানির উপর দিয়ে দূর্বার গতিতে ছুটে চলল আমাদের পাগলা তরী। শীত বুড়ির প্রভাবে তর্জন-গর্জন হারিয়ে নিরব নিস্তব্ধ হয়ে সবোধ বালকের মতো বয়ে চলছে সূরমা নদী। নদী নিরব হলেও তাঁর প্রাচুর্য‍্যতার উপস্থিতি সর্বত্র দৃশ‍্যমান। নদীর ধারের শীতকালীন সবুজ সবজির খেতগুলোর আপার সৌন্দর্য্য শীতের প্রকৃত শুষ্কতা যেন স্তব্দ হয়ে গেছে। র্শষের খেতগুলো মনে হয় হলদে সাগর, যেতায় হিমেল হাওয়া ঢেউ খেলে যায় প্রতিনিয়ত। বর্ষা মৌসুমের নদীর অস্থির তান্ডবের স্বাক্ষর উভয়ই পাড়ে পরিলক্ষিত হয়। এমন নান্দনিক সৌন্দর্য‍্যের গভীরে কখন যে হারিয়ে যাই , বাবলু ভাইর ডাকে সম্বিৎ ফিরে পেয়ে অনুধাবিত হলাম আমরা খরস্রোতা লোভানদীতে প্রবেশ করছি।সম্মুখ পানে দৃষ্টিনন্দন অবারিত সবুজের হাতছানি দিয়ে ডাকছে ভারতের সুউচ্চ পাহাড় শ্রেণি। পাহাড় মেঘ আর স্বচ্ছ নদীর পানির সঙ্গে যেন নীল আকাশের মিতালি। সর্পিল নদী উচু-নিচু পাহাড়ের গাঁ বেয়ে একেঁ-বেকেঁ বহমান।বৈচিত্র্যময় পাহাড়ের নান্দনিক দৃশ‍্য উপভোগ করতে করতে বেলা এগারটা চল্লিঁশ মিনিটে লোভাছড়াতে পৌছে যাই।
লোভাছড়াতে  পায়ের স্পর্শ পেতে  অনুভব করলাম এটি পাথর সমৃদ্ধ এলাকা।সামনে এগিয়ে চা বাগানে পবেশ করতে মনোহরণী সৌন্দর্য্য হৃদয়ে প্রশান্তির ছোঁয়া বয়ে গেল।সবুজ চা পাতায় প্রতিফলিত সূর্য রশ্মিকে মনে হয়, কে যেন মুক্তার  দানা ছড়িয়ে রেখেছে।সেই দানা থেকেই রামধনুর সাত রঙ্গের আভাগুলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। মীরাপিং শাহার মাজার, মোঘল রাজা-রাণীর পূরাকৃর্তি দর্শন শেষে উপস্তিত হই প্রাচীন দিঘী/লেকের পাড়ে। দিঘী/লেক প্রচীন হলেও বর্তমানে সংস্কারের উপস্থিতি লক্ষণীয়।
খাসিয়া পাহাড়ের পাদদেশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে বেশ কিছু বালু ভরা স্বচ্ছ খাল। টাঙ্গাইলপূর পাহাড়ি এলাকায় এমনি এক খালের উপর ঝুলন্তসেতু /টাঙ্গাইলসেতু লোভাছড়ার এক অনন‍্য দর্শনীয় স্থান, যথাযথ সংস্করণের অভাবে প্রায় ঝরাজীর্ন ঝুলন্ত সেতুটি এখনো  ব্রিটিশ শাসনের কালের স্বাক্ষী। প্রাকৃতিক লেক, ঝর্ণা ও পাহাড়িদের ঘরের মাটির দেয়ালে তৈরি আলপনা উপভোগ করতে করতে আলু (আরারুটের ) সুশোভিত বাগানে প্রবেশ করি। আলু (আরারুটের) দীর্ঘ বাগান পরিদর্শন শেষ হতে না হতে শুরু হয় রেমা (ঝাড়ু তৈরির পাখা) বাগান। রেমা বাগানের সৌন্দর্য্যকে অতিক্রমের পর সাক্ষাৎ হয় সামাজিক বনায়নের। প্রাকৃতিক আপার সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে করতে কখন যে বিকেল চারটা বেজে যায় আমরা বোঝতে পারিনি। এবার ফেরার পালা।
তাই,সৃষ্টিকর্তাকে এই সকল অকৃপণ প্রার্চুয‍্যপূর্ণ আয়োজনের জন‍্য বারংবার ধন‍্যবাদ জানাচ্ছিলাম।
লেখক, প্রভাষক,রাষ্ট্রবিঞ্জান বিভাগ,গোয়াইনঘাট সরকারি কলেজ, সিলেট।

faster