বাংলায় ইসলামীকরণের ইতিহাস

প্রকাশিত: ৩:৩৬ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২৪, ২০২০

বাংলায় ইসলামীকরণের ইতিহাস


মুহাম্মদ শামসুল ইসলাম
বাঙালি মুসলমান হলো একটি জাতিগত, ভাষাগত ও ধর্মীয় সম্প্রদায় যারা বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ,আসাম ও ত্রিপুরা রাজ‍্যের বৃহত্তম সংখ্যা লঘু সম্প্রদায়। মূলত “বাঙালি ও মুসলিম “ সংস্কৃতির সম্মিলনে বাঙালি মুসলিম সম্প্রদায় গঠিত হয়ছে।এজন্য ভারতবর্ষের মুসলিম মূলত Converted Muslim ।সবচেয়ে অবাক করা বিষয়,ভারতববর্ষে পাঁচ হাজার বছর যাবত আর্য(বাহ্মম সম্প্রদায়) বসবাস করছে,অথচ চারপাশে আর্য (বাহ্মম সম্প্রদায়) ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়সহ ক্ষুদ্র ধর্মীয় জাতিগোষ্ঠীর মধ্যভাগে তথা বাংলায় মুসলিম সম্প্রদায়ের আর্বিরভাব ও বিকাশ সত্যিই বিস্ময় জাগায়!কিভাবে সম্ভব হলো? হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর ওফাতের মোটামুটি এ্রকশ বছরের মধ্যেই উত্তর-পশ্চিম ভারতে ইসলামের অনুপ্রবেশ ঘটে এবং আরব বণিকরা বাংলাসহ ভারতের উপকূলবর্তী অঞ্চলের সংস্পর্শে আসে। কিন্তু বাংলায় মুসলমানদের রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার জন্য আরও প্রায় পাঁচশ বছর লেগে যায়। মুসলিম সম্প্রদায়ের বিকাশে নিম্নে আলোচিত তিনটি কারণকে আমি চিহ্নিত করেছি।
১।ভৌগোলিক অবস্থানঃ
বাংলা পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ(Delta),পৃ্থিবীর কয়েকটি Active Land এর মধ্যে Bengal অন্যতম একটি Active land । Active land মানে এই ভূমিটি এখনো পুরোপুরি তৈ্রি/ গঠিত হয়নি। এক লক্ষ বছর পূর্বে (টারসিয়ারি যুগে) প্রবল ভূ-আলোড়নে থেসিস সাগর থেকে যখন হিমালয় পর্বত(hill) উথিত হয়,তখন এই ভূমিরূপ তৈরি হয়।For this,this land like a soccer.হিমালয় পর্বত থেকে বঙ্গোপসাগরের দিকে ঢালু।অথ্যাৎ হিমালয় পর্বত থেকে উৎপন্ন নদীগুলো বাংলা তথা বাংলাদেশের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গপোসাগরে পড়ছে।নদী প্রবাহিত হওয়ায় বাংলার ভুমি পৃথিবীর অন্যতম উর্বর ভূমি।তাই এখানে বসবাস করা পূথিবীর মধ্যে সবচেয়ে (Sceure ) নিরাপদ ও সহজ ছিল। বসবাসের অফুরন্ত সুবিধা সম্বলিত এই উর্বর ভূমিতে ইউরোপীয় বণিকসহ মধ‍্যপ্রাচ‍্য তথা আরবীয় বনিকরা আসতো। অধিকাংশ বণিকগণ এখানে বিয়ে করে স্থায়ীভাবে বসবাসসহ ধর্মপ্রচারে আত্মনিয়োগ করতেন।University Of Dhaka এর ইতিহাস বিভাগের Professor Dr.Aksadul Alom এর মতে “৮ম শতাব্দি থেকে আরব ও পারস্য বণিকগণ বাংলায় আসতো বাণিজ্য করতে। তারা কেউ কেউ এই উর্বর ভূমিতে স্থায়ী ভাবে বসবাসের পাশাপাশি ধম প্রচার করতো । প্রথমদিকে মুসলিম ব্যবসায়ীরা ৮ম শতাব্দীতে বাংলায় ব্যবসা ও ইসলামীকরণে এসেছিল বলে মনে করা হয়। তারা মূলত ব্যয়বহুল অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করেছিল। বাংলা তখন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল। অষ্টম শতক থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে, বাঙালির সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। মুসলমানরা সংখ্যায় খুব কম ছিল এবং প্রধানত উপকূলের কাছে বাস করত”।কমপক্ষে সপ্তম-অষ্টম শতাব্দীতে আরব ও পার্সিয়ান মিশনারি এবং আরব বণিকগণ দ্বারা বাংলায় ইসলামের সূচনা হয়েছিল।৯ম শতাব্দির ১টি প্রাচীন (ক্ষুদ্র)মসজিদ ভারতের ক্যারেলায় এখনো আছে।
২।বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয়ঃ
১২০৪ সালে ইখতিয়ার আল-দীন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি (তুর্কি বংশোদ্ভূত একজন মুসলিম) বাংলা দখল করার জন্য লক্ষ্মণ সেনের (বাংলার রাজা) বিরুদ্ধে আক্রমণ শুরু করেছিলেন। খিলজির সেনাবাহিনী সেনের সেনাবাহিনীর তুলনায় খুব কম (কমপক্ষে পাঁচগুণ কম) ছিল। আকস্মিক আক্রমণে নিজের অঞ্চল রক্ষার পরিবর্তে লক্ষ্মণ সেন লড়াই না করে পালিয়ে যান (হঠাৎ করে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি) তাছাড়া আরব বণিকরা প্রায়ই ঘোড়া নিয়ে বানিজ্য ও ঘোড়া বিক্রি করতে আসতো,সেজন্য লক্ষ্মণ সেনের সৈন্যরা ভাবছিল বণিকরা আসছে, ছোট্ট ছোট্ট দলে বিভক্ত হয়ে তারা আসতেছিল,কিছু কিছু অংশ জঙ্গলের ভিতর দিয়ে আসছিল ,কেউ কেউ বলেন লক্ষ্মণ সেন পিছনের দরজা দিয়ে পালিয়েছেন, (এই Information এর Real Source পাওয়া যায়না)। সুতরাং, খিলজি বেশ সহজেই জিতেছে।মুসলিম ইতিহাসে তাকে “হিরো” হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজী ১২০৪ সালে বাংলা বিজয় করেন এবং ১২০৬ সালে দিল্লি সুলতানি প্রতিষ্ঠার পরে ভারতীয় ইসলামী মিশনারিরা বাংলায় সফল দাওয়াত এবং ধর্মান্তরিত সংখ্যার দিক থেকে তাদের সর্বশ্রেষ্ঠ সাফল্য অর্জন করেছিল।
৩।সূফিগণের আগমনঃ
বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পরে শত শত সুফি সাধক ইসলাম প্রচারের জন্য এখানে আসেন। ইসলাম ধীরে ধীরে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠ হতে কয়েক শতাব্দী লেগেছিল।সুফি সাধুগণ মূলত বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলে ইসলাম প্রচার করেছিলেন। এ কারণেই বাংলার পূর্ব অংশ পশ্চিমের চেয়ে মুসলিম জনসংখ্যা বেশি ।উল্লেখযোগ্য মুসলিম দরবেশদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন হযরত শাহ জালাল। তিনি ১৩০৩ সালে এখানে এসে সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ এবং আশেপাশের অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করেছিলেন। ব্রিটিশ শাসনামলে ইসলামে ধর্মান্তরিত অব্যাহত ছিল। আসলে এটি এখনও চলছে। বাংলাদেশে প্রতি বছর হাজার হাজার বাঙালি ইসলামে ধর্মান্তরিত(ধর্মান্তরিত মানে ,জোর করে নয়,তারা ইচছাকৃত ভাবে,ইসলামে সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়েছে ,এমন বোজিয়েছি আমি)হয়। মুসলমানদের জন্মের হার বেশি তবে উচ্চ ধর্মান্তরের হারও বাংলাদেশে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে অবদান রাখে। উদাহরণস্বরূপ, পূর্ব বাংলায় সুফিদের প্রায়শই “ধর্মান্তরকরণ” এর এজেন্ট হিসাবে চিহ্নিত করা হয়, তবু পশ্চিমবঙ্গেও অনেক সুফী ছিল।সুফিগণ তো বাংলার চাইতে ভারতে বেশি আসছিল,তবে কেনো বাংলায় বেশি ইসলামীকরণ হলো? অনেকর ধারণা “তলোয়ার তত্ত্ব” এর প্রতিফলন।তদুপরি যদি “তরোয়াল ধর্ম” বা “তলোয়ার তত্ত্ব” কিছুটা সচল থাকত (যা তারা ছিল না) তবে যৌক্তিকভাবে পূর্ব বদ্বীপের পরিবর্তে পশ্চিমাদের পক্ষে আরও প্রাসঙ্গিক/ ধর্মান্তরিত হওয়া উচিত ছিল। সুফিগণ তো বাংলার চাইতে ভারতে বেশি আসছিল,তবে কেনো বাংলায় বেশি ইসলামীকরণ হলো?
উপরের কারণ ছাড়া, পৃথিবীর Imagine land, সহজে খাদ্য উৎপাদন,জীবন-যাপন নিরাপদ,ভৌগো্লিক অবস্থান সুবিধাজনক,মানুষের ইসলাম গ্রহণে আগ্রহ, ইসলাম প্রচারের অনুকূল পরিবেশ ও দরিদ্র অঞ্চল (ইসলাম সবসময় দরিদ্র অঞ্চল দিয়ে প্রবেশ করে)প্রভৃতি কারণে বাংলায় ইসলামের প্রসারই ঘটে। বর্তমানে বাংলাদেশে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতি। জনসংখ্যার হিসাবে মোট জনসংখ্যার ৯০% মুসলিম এবং বাংলাদেশকে ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানের পরে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসাবে চিহ্নিত।
লেখক, প্রভাষক, রাষ্ট্রবিঞ্জান বিভাগ, গোয়াইনঘাট সরকারি কলেজ, সিলেট।

faster