বিশ্বেজুড়ে করোনার হানা: বিপদমুক্তির পর কি বদলাবে পৃথিবী?

প্রকাশিত: ১০:১৫ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৮, ২০২০

বিশ্বেজুড়ে করোনার হানা: বিপদমুক্তির পর কি বদলাবে পৃথিবী?


কাইয়ুম আব্দুল্লাহ লন্ডন থেকেঃ

মহামারি পৃথিবীর জন্য নতুন কিছু নয়। বিভিন্ন সময়ে দেশে দেশে ঘটে যাওয়া অনেক বড় বড় মহামারির ইতিহাস রয়েছে। তবে করোনাভাইরাসের ছোবল পুরো পৃথিবীকে যেভাবে লন্ডভন্ড করে যাচ্ছে অতীতে কোনো মহামারি সেভাবে বৈশ্বিক তান্ডব চালিয়েছে বলে জানা যায়নি। চীনের ওহান থেকে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাস আস্তে আস্তে পুরো বিশ্বকেই যে গ্রাস ফেলবে তা হয়তো কারোরই কল্পনায় ছিলো না। থাকলে তা প্রতিরোধ করার প্রস্তুতি কমবেশী পরিলক্ষিত হতো। বরং আমরা দেখেছি বিশ্বের প্রধান পরাশক্তি আমেরিকা ছিলো মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে মহা টেনশনে। অপর পরাশক্তি বৃটেন ছিলো ব্রেক্সিট কার্যকর করায় মহাব্যস্ত। আর আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশের ছিলো শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে রাজকীয় মহোৎসবের গ্রান্ট সূচনা এবং সেটির বছরব্যাপী প্রলম্বিত বাস্তবায়নের ব্যতিব্যস্ততা। এরই মধ্যে হাঁটি হাঁটি পা পা করে বলা যায় অরক্ষিত বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশে উপস্থিতি জানান দিতে সক্ষম হয় মারাত্মক প্রাণঘাতি ভাইরাস করোনা।

প্রায় চার মাস আগে অর্থাৎ গত বছরের ডিসেম্বরের শেষদিকে করোনাভাইরাসের র সূচনা হয় চীনের হুবেই প্রভিন্সের ওহানে। ৩১ ডিসেম্বর কিছু মানুষ নিউমোনিয়া রোগে আক্রান্ত হয়েছেন বলে মিডিয়াকে জানায় চীনের স্বাস্থ্য সংস্থা। ওহান, যেখানে জীবন্ত জীবজন্তু বেঁচাকেনার বাজার ছিলো। সেই বাজারে এসে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়া একজন মারাও যান কয়েকদিনের ব্যবধানে। ১১ জানুয়ারী মারা যাওয়া ব্যক্তিই হলেন করোনার প্রথম গ্রাস। এর এক সপ্তাহ পর আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়ে করোনা, চীনের ওহান ফেরত একজনের মাধ্যমে। এভাবে একে একে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ে করোনা। অবস্থা বেগতিক দেখে নড়েচড়ে বসে ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গেনাইজেশন (WHO)। বিশ্বজুড়ে জরুরী স্বাস্থ্য সচেতনতা ঘোষণার পাশাপাশি করোনাভাইরাসের নামকরণ করা হয় COVID:১৯ এবং কয়েকদিনের মধ্যেই একে বৈশ্বিক মহামারি ঘোষণা করা হয়।

প্রথমদিকে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা পার্শ্ববর্তী দেশ সিঙ্গাপুর, থাইল্যা-, কোরিয়া ও জাপানে সীমাবদ্ধ থাকলেও কিছুদিনের মধ্যেই তা ছড়িয়ে পড়ে ইউরোপ ও ইউকেতে। প্রথমে ইতালিতে ছড়িয়ে পড়ার মাধ্যমে সূচনা ঘটে ইউরোপে। এখনও ইউরোপের মধ্যে মৃতের সংখ্যার দিক থেকে ইতালি শীর্ষে। ফ্রান্স ও স্পেনেও পাল্লা দিয়ে বাড়ে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। আর প্রায় শুরুতেই পর্যদুস্ত করে ফেলে মধ্য এশিয়ার দেশ ইরানকে। ৩১ জানুয়ারী বৃটেনে প্রথম সংক্রমিত ব্যক্তির সন্ধান মিলে এবং ৫ মার্চ প্রথম করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যু হয় ইংল্যান্ডে। আস্তে আস্তে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে পুরো বৃটেনে, বাড়তে মৃতের সংখ্যাও। মার্চের শেষের দিকে (২৩ মার্চ) এসে লকডাউন ঘোষণা দিতে বাধ্য হয় ব্রিটিশ সরকার। লকডাউন করা হলেও করোনা থেকে রক্ষা পাননি খোদ রাষ্ট্রপ্রধান প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন কিংবা রাজ পরিবারের জৈষ্ঠ্য সদস্য প্রিন্স চার্লস। চার্লস আইসোলেশনে থেকে সুস্থ হয়ে ছাড়া পেলেও বরিসকে ফিরতে হয় মৃত্যুর দ্বার মাড়িয়ে।

আশঙ্কা করা হচ্ছে, ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে বেশী মাশুল দিতে হতে পারে বৃটেনকে। আর বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর দেশ আমেরিকাকে ইতোমধ্যেই নাকাল করে তুলেছে অদৃশ্য শক্তি করোনা! মৃতের দিক থেকে সব দেশকে ছাড়িয়ে গেছে দেশটি এবং তা দমিয়ে রাখা যাচ্ছে না। যখন তখন যে কাউকে আঙ্গুল উঁচিয়ে হুমকি-ধমকি দিতে অভ্যস্ত দেশটির প্রেসিডেণ্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফেকাসে মুখ দেখলেই বোঝা যায় কতোটা অসহায়ত্ব নিয়ে দিন গুজরান করতে হচ্ছে তাকেও। বলা যায়, অনেকটা অরক্ষিত বিশ্বে করোনার অতর্কিত হামলা। চীন থেকে যে তা আস্তে আস্তে পুরো বিশ্বকে কাবু করে ফেলবে সেটিও অনেক বিশ্বনেতৃত্বের বিশ্বাস ছিলো না। থাকলে আগাম সতর্কতা লক্ষ্য করা যেতো। চীনে করোনা যখন তান্ডব চালাচ্ছে তখনও দেশটির সাথে যাতায়াত অক্ষুন্ন ছিলো প্রায় সবকটি দেশের। আস্তে আস্তে যখন একজন দুজন করে আক্রান্ত হতে শুরু করে তখনই টনক নড়ে সবার।

এই সেইদিনও বৃটেনের পার্লামেন্ট নির্বাচনে লেবার পার্টি ও দলটির যুদ্ধবিরোধী নেতা জেরেমি করবিনের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এইএইচএস) তথা স্বাস্থ্যসেবা খাত। আর সরকারী দল কনজারভেটিভ নেতা বরিস জনসনের একমাত্র লক্ষ্য ছিলো ব্রেক্সিট বাস্তবায়ন। এতো গেলো বৃটেনের কথা। বিশ্বের অন্যান্য দেশের দিকে তাকালেও অভিন্ন দৃশ্য পরিলক্ষিত হবে। বিশেষ করে শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যকার মারণাস্ত্রের প্রতিযোগিতা। স্বাস্থ্য, সুরক্ষা কিংবা মানবিক কার্যক্রমের চেয়ে প্রতিরক্ষা খাতের নামে মারণাস্ত্রের মজুদ, বিস্তৃতি ও বাণিজ্যই প্রধান্য পেয়েছে। অথচ বিপুল অস্ত্রশস্ত্রের সম্ভারে সমৃদ্ধ দেশগুলো আজ সাধরণ জনগণ দূরে থাক তাদের স্বাস্থ্যকর্মীদেরই সুরক্ষা দিতে হিমশিম খাচ্ছে।

করোনার প্রলয়ঙ্করী প্রাদুর্ভাবে যখন পুরো পৃথিবী প্রায় পর্যদুস্ত তখন মানবিক বিষয়গুলো সাধারণ্যে খুব বেশী আলোচিত হচ্ছে। বলাবলি হচ্ছে – করোনা পরিত্রাণের পর হয়তো বিশ্ব কিছুটা হলেও মানবিক হবে। কিন্তু মানুষতো স্বভাবে ভুলপ্রবণ। বিপদে যা-ই হোক, বিপদ কেটে গেলে সব ভুলে যায়। তাই এই মহাদুর্যোগ কেটে গেলেও মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট বদলাবে বলে মনে হয়না। অপরকে দাবিয়ে রেখে নিজের জয়যাত্রা অব্যাহত রাখার সব চেষ্টা যে চলবে না তাও মনে করি কীভাবে? এই সেদিন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন হাসপাতালে যাওয়ার সময় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে ওঠেছিলো – নিউক্লিায়ারের কোড থাকবে কার হাতে? তাছাড়া অতীতের ছোট বড় দুর্যোগ থেকেও মানুষ যে কোনো শিক্ষা নেয়নি বা বদলায়নি তাওতো ভেবে দেখতে হবে।

বিশ্বের কোনো বিজ্ঞানীই এখনো বলতে পারছেন না করোনা থেকে কখন মুক্তি পাওয়া যাবে। বিভিন্ন দেশ ভ্যাকসিন আবিষ্কারের প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে মানুষ আশাবাদী যে, করোনার ভয়ঙ্কর গ্রাস থেকে অদূর ভবিষ্যতে মুক্তি পাবে বিশ্ব। ততদিনে হয়তো আরো অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে, প্রাণ যাবে অসংখজনের। আর অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের আভাসতো ইতোমধ্যেই প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। তাই আপাতত করোনা থেকে পৃথিবীর নিরাময়ই প্রধান প্রত্যাশা। সবাই ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন।