মসজিদ নির্মাণের জন্য মসজিদের নামে স্বেচ্ছায় জমি ওয়াক্ফ হওয়া জরুরি

প্রকাশিত: ৬:০২ অপরাহ্ণ, জুন ৫, ২০২০

মসজিদ নির্মাণের জন্য মসজিদের নামে স্বেচ্ছায় জমি ওয়াক্ফ হওয়া জরুরি

ইসলামিক ডেস্কঃ

বাংলাদেশ মসজিদের দেশ। দেশের আয়তনের তুলনায় এত বেশি মসজিদ পৃথিবীর আর কোনো দেশে নেই। কারণ বাংলাদেশের মানুষ ধর্মভীরু। আর এই ধর্মভীরুতাকে কেন্দ্র করে অবৈধভাবে মসজিদ, মাদরাসা, মন্দির নির্মাণের ভয়াবহ সব তথ্য বেরিয়ে আসছে সাম্প্রতিক সরকারি জমি অবৈধ দখলমুক্ত করার অভিযানকালে। এক শ্রেণির ভূমিদস্যু সরকারি জমি এবং অসহায়-দুর্বল মানুষের জমি অন্যায়ভাবে জবরদখল করে, আর দখল পাকাপোক্তা ও নিরাপদ করার জন্য দখলি জমির কিছু অংশে মসজিদ, মাদরাসা বা মন্দির নির্মাণ করছেন। এটা কোন ধরনের ধর্মভীরুতা, তা আমাদের বোধগম্য নয়।

মসজিদ নির্মাণের জন্য মসজিদের নামে স্বেচ্ছায় জমি ওয়াক্ফ হওয়া জরুরি। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) মসজিদে নববীর জমি তাঁকে বিনা মূল্যে উপহার হিসেবে দিতে চাইলেও তিনি তা গ্রহণ করেননি। তিনি জমির মূল্য বাজারদর অনুযায়ী পরিশোধ করার পর মসজিদ নির্মাণ করেছেন। সৈয়দ আমির আলী লিখেছেন, ‘যে জমির ওপর মসজিদ নির্মাণের জন্য প্রস্তাব হয়েছিল, তা ছিল দুই ভ্রাতার। জমিটি তারা দান করে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু যেহেতু তারা ছিল এতিম। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের জমির মূল্য প্রদান করেছিলেন।’ (দ্য স্পিরিট অব ইসলাম, অনূদিত, পৃষ্ঠা ১১৭)
সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষে লেখা হয়েছে, ‘হাদিস অনুসারে মহানবী (সা.) মদিনায় মসজিদ নির্মাণকল্পে দুইজন অনাথ থেকে একখণ্ড জমি ক্রয় করেছিলেন।’ (সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ১৫৬)
সৈয়দ আলী আহসান লিখেছেন, ‘উষ্ট্রী থেকে অবতরণ করে রাসুলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, যেখানে উষ্ট্রী বসে পড়েছে সে জমিটি কার? তাঁকে জানানো হলো যে জমিটি দুটি অনাথ বালকের। বালক দুটি আসাদের তত্ত্বাবধানে ছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইঙ্গিতক্রমে আসাদ বালক দুটিকে রাসুলে খোদার সামনে নিয়ে এলেন। তিনি তাদের বলেন, তিনি জমিটি কিনে নিতে চান, এতে তাদের কি কোনো আপত্তি আছে? ছেলে দুটি বলল, ‘এই জমি হে আল্লাহর রাসুল, আমরা আপনাকে উপঢৌকন দিতে চাই।’ তিনি বলেন, তিনি বিনা মূল্যে জমিটি নেবেন না এবং আসাদকে বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করতে বললেন। (মহানবী, অনির্বাণ, ১৯৯৪ ইং, পৃষ্ঠা : ১০৭)
জবরদখলি জমিতে মসজিদ নির্মাণ করলে সেটি শরিয়তের বিধান মতে মসজিদ হিসেবে গণ্য হবে না।  এ বিষয়ে বিজ্ঞ মুফতিদের ফতোয়া হলো, ‘কারো মালিকানাধীন জমিতে জোরপূর্বক মসজিদ নির্মাণ করা জায়েজ নেই। মসজিদ নির্মাণ করতে হলে নির্ভেজাল জমি মসজিদের নামে ওয়াক্ফ হওয়া জরুরি। ওয়াক্ফবিহীন জমিতে মসজিদ নির্মাণ করা হলে সেটা শরয়ি মসজিদ হবে না। যদি কোনো জমির মালিক তাঁর জমি ওয়াক্ফ করতে রাজি না হন এবং জোরপূর্বক তাঁর জমিতে মসজিদ নির্মাণ করা হয়, তাহলে ওই মসজিদ ভেঙে জমি তার মালিককে ফেরত দিতে হবে। কোনো জমিতে মালিকের অনুমতি নিয়ে মসজিদ নির্মাণ করা হলে তাতে নামাজ পড়া জায়েজ হবে। অনুমতি ছাড়া মসজিদ নির্মাণ করা হলে তাতে নামাজ পড়া মাকরুহ হবে। ‘(ফাতওয়া হিন্দিয়া, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৪৮; রদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৩৯০; আদদুররুল মুখতার, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৮১)

মসজিদ আল্লাহর ঘর। একমাত্র আল্লাহর ইবাদতের জন্যই মসজিদ নির্মিত হতে হবে। কোনো অসৎ উদ্দেশ্যে যদি মসজিদ নির্মাণ করা হয়, তাহলে সেটা শরিয়তের বিধানানুসারে মসজিদ হিসেবে গণ্য হবে না। এমন একটি মসজিদ রাসুলুল্লাহ (সা.) গুঁড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন, যা ইসলামের ইতিহাসে মসজিদে জেরার নামে পরিচিত। মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) সুরা তাওবার ১০৭-১১০ নম্বর আয়াতের তাফসির প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘মদিনায় আবু আমের নামের এক ব্যক্তি জাহেলি যুগে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছিলন এবং আবু আমের রাহেব পাদ্রি নামে খ্যাত ছিল। তার পুত্র বিখ্যাত সাহাবি হানজালা (রা.)-এর লাশ ফেরেশতারা গোসল দিয়েছিলেন।
ওই পাদ্রি আজীবন ইসলামবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকে। সে রোমান সম্রাটকে মদিনায় অভিযান চালিয়ে মুসলমানদের দেশান্তরিত করার প্ররোচনা দিয়েছিল। সে মদিনার পরিচিত মুনাফিকদের কাছে চিঠি লেখে যে রোমান সম্রাট কর্তৃক মদিনা অভিযানের চেষ্টায় আমি আছি। কিন্তু যথাসময় সম্রাটকে সাহায্য করার লক্ষ্যে সম্মিলিত শক্তি তোমাদের থাকা চাই। এর পন্থা হলো এই যে তোমরা মদিনায় মসজিদের নাম দিয়ে একটি গৃহ নির্মাণ করো, যাতে মুসলমানদের অন্তরে কোনো সন্দেহ না আসে। অতঃপর সে গৃহে নিজেদের সংগঠন করো এবং যতটুকু সম্ভব যুদ্ধের সরঞ্জাম সংগ্রহ করে সেখানে রাখো। এবং পারস্পরিক আলোচনা ও পরামর্শের পর মুসলমানদের বিরুদ্ধে কর্মপন্থা গ্রহণ করো।
তারা কোবা মসজিদের অদূরে একটি মসজিদ নির্মাণ করে। তারা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে গিয়ে বলে যে কোবা মসজিদে দুর্বল ও অসুস্থ লোকদের যাওয়া দুষ্কর। তা ছাড়া মসজিদটি এত প্রশস্ত নয় যে এলাকার সব লোকের সংকুলান হতে পারে। তাই আমরা দুর্বল লোকদের সুবিধার জন্য একটি মসজিদ নির্মাণ করেছি। আপনি যদি তাতে এক ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন, তবে আমরা বরকত লাভে ধন্য হব। মহানবী (সা.) তখন তাবুক যুদ্ধের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ছিলেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিলেন যে এখন সফরের প্রস্তুতিতে আছি। ফিরে এসে নামাজ আদায় করব। কিন্তু তাবুক যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে যখন তিনি মদিনার নিকটবর্তী এক স্থানে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, তখন সুরা তাওবার কয়েকটি আয়াত নাজিল হয়। আয়াতগুলো রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে ওই মসজিদে যেতে নিষেধ করা হয়। এতে মুনাফিকদের ষড়যন্ত্র ফাঁস করে দেওয়া হয়। আয়াতগুলো নাজিল হওয়ার পর সাহাবিরা ওই মসজিদ ধ্বংস করে দেন। এ ঘটনা তাফসিরে কুরতুবি ও মাজহারি থেকে উদ্ধৃত করা হয়েছে। (মা’আরেফুল কোরআন, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৫৬৬-৫৬৭)      

পবিত্র কোরআন, হাদিস ও ইতিহাসের বিবরণ থেকে স্পষ্ট জানা যায়, অবৈধভাবে জমি দখল করে মসজিদ-মাদরাসা নির্মাণ করাকে ইসলাম সমর্থন করে না। আর অবৈধ দখলকে নিরাপদ করার অসৎ উদ্দেশ্যে মসজিদ, মাদরাসা বা কবরস্থান নির্মাণ করা ধার্মিকের কাজ নয়।


লেখক : সাংবাদিক, গ্রন্থকার ও পেশ ইমাম, রাজশাহী কলেজ কেন্দ্রীয় মসজিদ

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

faster