মৃত্যুভীতি গুনাহমুক্ত জীবনের সহায়ক

প্রকাশিত: ৮:৪৭ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২০

মৃত্যুভীতি গুনাহমুক্ত জীবনের সহায়ক

মাওলানা আজিমুল ইসলাম সেলিম বার্সেলোনা থেকেঃনি:সন্দেহে দুনিয়ার জীবন আখিরাতের তুলনায় খুবই ক্ষণস্থায়ী। প্রতিটি প্রাণীকে অবশ্যই মৃত্যু বরণ করতে হবে। কিন্তু আমরা মানুষ দুনিয়ার রঙ্গ-তামাশায় ডুবে প্রায়ই মৃত্যুর কথা বেমালুম ভুলে যাই।ভুলে যাই যে, আমাদের জীবনের জন্য একটি সময়-সীমা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। সে সময় এসে গেলে এক সেকেন্ড বৃদ্ধি করা হবে না,কমানো ও হবে না।

একটি মাত্র নির্দেশে আমাদের কত শত রঙ্গিন স্বপ্ন, উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রস্তুতি, বহু সাধনার ক্যারিয়ার, যত্নে গড়া ঘর-বাড়ি, সুন্দর দেহাবয়ব, দাম্পত্য জীবনের উষ্ণতা, পারিবারিক নিবিড় বন্ধন -সবকিছু পেছনে ফেলে চলে যেতে হবে না ফেরার দেশে। সেখান থেকে ফিরে আসার আর কখনো সুযোগ থাকবে না।

সে অবধারিত বাস্তবতা ও অন্তিম জীবনের কথা আমাদের হৃদয়ে জাগ্রত থাকলে সত্যি আমাদের জীবনটা অন্যরকম হত। দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী আবাসকে এতো এতো স্বপ্ন, রঙ্গিন কল্পবিলাস আর ভালবাসা দিয়ে না গড়ে চিরস্থায়ী আবাস ভূমিতে প্রসাদ তৈরির প্রতি বেশি মনোযোগী হতাম। আর সমাজটাও এত অন্যায় ও পাপাচারে হাবুডুবু খেতো না। বরং এক অনাবিল শুদ্ধতা ও পবিত্রতার আবেশে ভরে থাকত আমাদের চারদিক-পারিপার্শ্বিকতা।

হৃদয়পটে সর্বদা মৃত্যুর কথা জাগ্রত রাখা প্রত্যেক আদম সন্তানের কর্তব্য।কখন কার মৃত্যুর ডাক চলে আসবে, তা কারো জানা নেই। মৃত্যুর ডাক আসার না রয়েছে বয়স, না সিরিয়াল। সর্বদা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুুত থাকা প্রকৃত মুসলমানের কাজ।

একদিন আমাদের বাবা-মাকে কবরে শুইয়ে দিয়ে আসতে হবে, এই নিয়তি মেনে নেয়াটা বড় কষ্টের। প্রত্যেক বিবেকবান মানুষের জন্য সেদিন এক ভীষণ কষ্টের দিন। কিন্তু নিজের সন্তানকে কোনো দিন নিজের হাতে কাফনে জড়িয়ে কবরে শুইয়ে দিয়ে আসবো -এই চিন্তা কোনো বাবা-মা’র পক্ষে করা সম্ভব নয়। আদরের ছোট শিশু সন্তানকে কবর দেওয়ার মত কষ্টের অভিজ্ঞতা পৃথিবীতে আর একটিও নেই। রাসূল স. এর সাতটি সন্তান ছিল। ছয়টি সন্তানই অল্প বয়সে মারা গিয়েছিল। শুধুই ফাতিমা রা. বেঁচে ছিলেন। রাসূল স. নিজের হাতে ছয়-ছয়টি সন্তানকে কবর দিয়েছেন।

আল্লাহ তায়ালা সূরা আলে ইমরানের ১৮৫ নং আয়াতে বলেন,প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। আর কিয়ামতের দিন তোমাদের পরিপূর্ণ বদলা দেওয়া হবে। তারপর যাকে দোযখ থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সেই সফলকাম। আর পার্থিব জীবন ধোঁকার বস্তু ছাড়া কিছুই নয়।

ইবনু শামাসা আল-মাহরী (রহঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা একদা আমর ইবনুল আছ রা.-এর মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে দেখতে গেলাম। তখন তিনি অনেকক্ষণ যাবত কাঁদলেন এবং মুখমন্ডল দেয়ালের দিকে ফিরিয়ে নিলেন। তাঁর পুত্র তাঁকে রাসূল স. প্রদত্ত বিভিন্ন সুসংবাদ উল্লেখপূর্বক সান্তনা দিয়ে বললেন, আব্বা! রাসূল স. কি আপনাকে অমুক সুসংবাদ দেননি? রাসূল স. কি আপনাকে অমুক সুসংবাদ দেননি? রাবী বলেন, তখন তিনি পুত্রের দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, আমার সর্বোৎকৃষ্ট পাথেয় হচ্ছে ‘লা ইলাহা ইল্লালাহু ওয়া আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ’ এ কালিমার সাক্ষ্য দেয়া। আর আমি অতিক্রম করেছি আমার জীবনের তিনটি পর্যায়। এক সময় তো আমি এমন ছিলাম যে, রাসূল (ছাঃ)-এর বিরুদ্ধাচারণে আমার চেয়ে কঠোরতর আর কেউই ছিল না। আমি যদি রাসূল স.-কে কবযায় পেতাম তাকে হত্যা করতাম, এ ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয় ভাবনা। যদি সে অবস্থায় আমার মৃত্যু হত, তবে নিশ্চিত আমাকে জাহান্নামে যেতে হত। এরপর আল্লাহ যখন আমার অন্তরে ইসলামের অনুরাগ সৃষ্টি করে দিলেন, তখন আমি রাসূল স.-এর নিকটে উপস্থিত হয়ে অনুরোধ জানালাম যে, আপনার ডান হাত বাড়িয়ে দিন, আমি বায়‘আত করতে চাই। রাসূল স. তাঁর ডান হাত বাড়িয়ে দিলেন, তখন আমি আমার হাত টেনে নিলাম। রাসূল স. বললেন, আমর! কি ব্যাপার? আমি বললাম, পূর্বেই আমি শর্ত করে নিতে চাই। রাসূল স.জিজ্ঞেস করলেন, কি শর্ত করবে? আমি উত্তরে বললাম, আল্লাহ যেন আমার সব গোনাহ মাফ করে দেন। রাসূল স. বললেন, আমর! তুমি কি জানো না যে, ইসলাম পূর্বের সকল পাপ মিটিয়ে দেয়। হিজরত পূর্বেকৃত গোনাহসমূহ মিটিয়ে দেয় এবং হজ্জও পূর্বের সকল গোনাহ মিটিয়ে দেয়। আমর রা.বলেন, এ পর্যায়ে আমার অন্তরে রাসূল স. অপেক্ষা অধিক প্রিয় আর কেউ ছিল না। আমার চোখে তিনি অপেক্ষা মহান আর কেউ ছিল না। অপরিসীম শ্রদ্ধার কারণে আমি তার প্রতি চোখ ভরে তাকাতেও পারতাম না। আজ যদি আমাকে তাঁর দেহ আকৃতির বর্ণনা করতে বলা হয়, তবে আমার পক্ষে তা সম্ভব হয়ে উঠবে না। কারণ চোখভরে আমি কখনোই তাঁর প্রতি তাকাতে পারিনি। ঐ অবস্থায় যদি আমার মৃত্যু হত তবে অবশ্যই আমি জান্নাতী হওয়ার আশাবাদী থাকতাম। পরবর্তীকালে আমরা নানা বিষয়ের সাথে জড়িয়ে পড়েছি।তাই জানি না, এতে আমার অবস্থান কোথায়? সুতরাং আমি যখন মারা যাব, তখন যেন কোন বিলাপকারীরা অথবা আগুন যেন আমার জানাযার সাথে না থাকে। আমাকে যখন দাফন করবে তখন আমার উপর আস্তে আস্তে মাটি ফেলবে এবং দাফন সেরে একটি উট যবাই করে তার গোশত বণ্টন করতে যে সময় লাগে, ততক্ষণ আমার কবরের পাশে অবস্থান করবে। যেন তোমাদের উপস্থিতির কারণে আমি আতঙ্কমুক্ত অবস্থায় চিন্তা করতে পারি যে, আমার প্রতিপালকের দূতের কি জবাব দেব’। (মুসলিম :১২১; আত-তারগীব : ১০৯৭; মিশকাত:২৮)।

প্রত্যেক মানুষের অন্তরে মৃত্যুর ভয় থাকা জরুরী। কারণ মৃত্যুর ভয় মানুষকে সকল অন্যায় থেকে বাঁচাতে পারে। এজন্য আমাদেরকে বেশী বেশী মৃত্যুকে স্মরণ করতে হবে। হে! আল্লাহ আমাদের মৃত্যুর ভীতি দিয়ে সকল পাপ থেকে রক্ষা করুন-আমীন!

লেখক: খতিব, দারুল আমাল জামে মসজিদ

বার্সেলোনা, স্পেন।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

faster