শবে কদরের দর্শন

প্রকাশিত: ৭:৩৯ অপরাহ্ণ, মে ১৩, ২০২০

শবে কদরের দর্শন

ধর্ম ডেস্কঃইসলামে স্বীকৃত যেসব দিবস-রজনী বরকতময় ও মহিমান্বিত, এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে শবে কদর বা লাইলাতুল কদর। কদরের এক অর্থ মাহাত্ম্য ও সম্মান। কেউ কেউ এখানে এ অর্থই উদ্দেশ্য নিয়েছেন। অন্যান্য রাতের তুলনায় এ রাত মহিমান্বিত হওয়ার কারণে এটাকে লাইলাতুল কদর তথা মহিমান্বিত রাত বলা হয়।
আবু বকর ওয়াররাক (রা.) বলেন, এ রাতকে লাইলাতুল কদর বলার কারণ হচ্ছে, আমল না করার কারণে এর আগে যার সম্মান ও মূল্য মহিমান্বিত থাকে না, সে এ রাতে তাওবা ইস্তিগফার ও ইবাদত বন্দেগির মাধ্যমে মহিমান্বিত হয়ে যায়। তিনি আরও বলেন, এ রাতে আল্লাহ যে কিতাব অবতীর্ণ করেছেন, সেটা মহিমান্বিত ও সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানি কিতাব এবং যে নবীর ওপর অবতীর্ণ, তিনিও মহিমান্বিত ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী, আর যে উম্মতের জন্য অবতীর্ণ করেছেন, তারা মহিমান্বিত ও সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মত।
কদরের আরেক অর্থ হচ্ছে সংকীর্ণতা। এ হিসেবে লাইলাতুল কদর নামকরণ করা হচ্ছে, এ রাতে সূর্যাস্তের পর থেকে সুবহে সাদিক পর্যন্ত ঊর্ধ্বগত থেকে পৃথিবীর বুকে এত বেশি কল্যাণ ও বরকত অবতীর্ণ হয়, যা ভূপৃষ্ঠে সংকুলান হয় না।
কদরের আরেক অর্থ তাকদির ও আদেশ। এ রাতে পরবর্তী এক বছরের অবধারিত তাকদির ব্যবস্থাপক ও প্রয়োগকারী ফেরেশতাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এতে প্রত্যেক মানুষের হায়াত, রিজিক, ইত্যাদির পরিমাণ নির্দিষ্ট ফেরেশতাকে লিখে দেওয়া হয়।
শবে কদর কোন রাতে?
এ সম্বন্ধে সাহাবায়ে কিরামের যুগ থেকে মতভেদ চলে আসছে। এ প্রসঙ্গে প্রায় ৪০টি বক্তব্য আছে। মুসলিম শরিফে হজরত উবায় ইবনে কাআব (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রয়েছে, শবে কদর হলো রমজানের ২৭তম রাত। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.), হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) হজরত মুয়াবিয়া (রা.) প্রমুখ সাহাবি থেকেও অনুরূপ বক্তব্য বর্ণিত আছে।

কোরআন-হাদিসের সুস্পষ্ট বর্ণনাদৃষ্টে প্রতীয়মান হয় যে শবে কদর রমজান মাসে আসে; কিন্তু এর সঠিক কোনো তারিখ নির্দিষ্ট নেই। বুখারি ও মুসলিম বর্ণিত হাদিসের আলোকে বলা যায়, শেষ ১০ দিনের বেজোড় রাতগুলো শবে কদর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
হাদিসের আলোকে আরও জানা যায়, রাসুল (সা.)-কে যখন এর তারিখ ভুলিয়ে দেওয়া হয়, তখন তিনি বলেছিলেন, সম্ভবত এতে তোমাদের কল্যাণ নিহিত আছে। অর্থাত্ যদি এ রাত নির্দিষ্ট করে দেওয়া হতো তবে অনেক অলস প্রকৃতির মানুষ শুধু এ রাতে ইবাদত বন্দেগিতে নিয়োজিত হতো। অবশিষ্ট সারা বছর ইবাদত বন্দেগি না করে আল্লাহ তাআলার রহমত থেকে বঞ্চিত থাকত। দ্বিতীয়ত, এ রাত নির্দিষ্ট করা হলে কোনো ব্যক্তি ঘটনাক্রমে রাতটিতে ইবাদত করতে না পারলে সে দুঃখ ও আক্ষেপ প্রকাশ করতে করতে অনেক সময় নষ্ট করে দেবে। এতে সে মাহে রমজানের বরকত থেকে বঞ্চিত হয়ে যাবে। এ রাত যেহেতু নির্দিষ্ট করা হয়নি, সে জন্য এ রাতের সন্ধানে আল্লাহর সব বান্দা প্রতি রাতে ইবাদত বন্দেগি করে থাকে এবং প্রত্যেক রাতের জন্য পৃথক পৃথক পুণ্য অর্জন করতে থাকে।
কোরআন মাজিদ শবে কদরে অবতীর্ণ হয়:
সুরা কদরের প্রথম আয়াত: ‘নিশ্চয় আমি কদর রাতে কোরআন নাজিল করেছি।’ এ আয়াত থেকে পরিষ্কার জানা যায়, শবে কদরে কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে। লাওহে মাহফুজ থেকে শবে কদরে এই কোরআন অবতীর্ণ হয়। এরপর হজরত জিবরাইল (আ.) ধীরে ধীরে ২৩ বছরে তা রাসুল (সা.)-এর কাছে পৌঁছাতে থাকেন। এ কথাও বলা যেতে পারে, এ রাতে কয়েকটি আয়াত অবতরণের মাধ্যমে কোরআন অবতরণের ধারাবাহিকতা সূচনা হয়। এরপর অবশিষ্ট কোরআন পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে অবতীর্ণ হয়।
শবে কদর এ উম্মতের বৈশিষ্ট্য:
শবে কদর এ উম্মতের জন্য আল্লাহ পাকের মহান দান। এটাকে কেবল এ উম্মতেরই বৈশিষ্ট্য। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা শবে কদর আমার উম্মতকেই দান করেছেন; পূর্ববর্তী উম্মতকে নয়।
ইমাম মালিক (রহ.) সূত্রে বর্ণিত আছে, যখন রাসুল (সা.)-কে আল্লাহর পক্ষ থেকে সংবাদ দেওয়া হলো যে আপনার উম্মতের বয়স অন্যান্য উম্মতের তুলনায় কম হবে, তখন তিনি আল্লাহর সমীপে নিবেদন করলেন, হে আল্লাহ! তাহলে তো পূর্ববর্তী উম্মত দীর্ঘ জীবন পেয়ে ইবাদত ও সত্কর্মের মাধ্যমে যে স্তরে উপনীত হয়েছে, আমার উম্মত সে স্তর লাভ করতে পারবে না। এর পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা রাসুল (সা.)-কে লাইলাতুল কদর দান করেন এবং এটাকে হাজার মাসের চেয়েও উত্তম বলে ঘোষণা দেন। আল্লাহ পাক আমাদের সবাইকে শবে কদরের কল্যাণ লাভ করার তাওফিক দান করুন। আমীন।

?আলিম রাজ
সভাপতি
বাঁচন রক্তদান গ্রুপ,ওসমানীনগর।