সিনথেসিস

প্রকাশিত: ১১:১২ অপরাহ্ণ, জুলাই ৯, ২০২০

সিনথেসিস


শিকদার মুহাম্মদ কিব্রিয়াহ

দ্বিতীয় অংশ:
আরিফ চিন্তিত। রাণীগঞ্জে তাদের এ-ই নিশ্চিন্তপুরে বিষয়টি এতটাই সাধারণ যে, কেউ এটি নিয়ে অবশ্যই উল্টো চিন্তা তো করবেই না, বরং খুশিমনে মেনে নেবে। ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতার ঝড় বইয়ে দেবে। কিন্তু আরিফ যুক্তিবাদী নৈতিক যুবক। সে ভাবে, চাষ করবে নিজের জমিতে একজন—ফলন নিয়ে যাবে আরেকজন! অন্তত আইনগতভাবে। তারই ঔরষজাত সন্তানের মা হবেন তারই বড়বোন জামিলা বেগম! কী ভয়াবহ মিথ্যে! একেবারে নির্লজ্জ মিথ্যের নিকৃষ্ট বেসাতি। বিষয়টির অন্তর্গত স্বরূপ উপলব্ধি করে তার অন্তরাত্ম কেঁপে যায়। আপনমনে ভাবে—আপু তুমি কী কখনও কল্পনা করে দেখেছ এ লোমহর্ষক মিথ্যের দৃশ্যগত দিক! দেখো নি। দেখতে চাইবেও না। কারণ, তোমার কাছে তোমার ভাইয়ের বস্তুগত কল্যাণটাই আদর্শ। মৌলিক বিবেচ্য—পদ্ধতিটা গৌণ। নিছকই একটা মিথ্য—অন্যসব সাধারণ মিথ্যের মতই।
জামিলা আপার ছোট সন্তানের বয়স দু’বছর। দেশে বছরখানেক থেকে গেলে যে-কোন নবজাতককে দেশে ভূমিষ্ঠ নিজের বাচ্চা বলে প্রমানিত করা কঠিন কিছু না। কিন্তু আরিফ কীভাবে এ অসৎ পদ্ধতিটাকে মেনে নিতে পারে? তার শুভবুদ্ধির আদর্শবাদী মন একে মেনে নেবার কোন যুক্তিই খুঁজে পায় না। না খেয়ে মরে যাবে, তবুও এ অন্যায়-অনিয়মকে সে প্রশ্রয় দিতে পারে না। বিষয়টির নীতিগত দিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে সে আপার চিঠির জবাব দেয়—স্পষ্টভাবেই তার নেতিবাচক সিদ্ধান্তের কথা জানায়। আপা চিঠিটার আকৃতি দেখেই মর্মার্থ বুঝে নেন। ভাইকে তো তার জানাই আছে। তবুও একবার দায়সারাভাবে পড়ে নেন। ভাবেন, আচ্ছা দেশে যাই আগে!
দীর্ঘ এক বছরের ছুটি নিয়ে জামিলা আপা’রা দেশে এলেন মহাসমারোহে। আরিফ’রা সবাই এয়ারপোর্টে গেল। বেশ ক’বছর পর আসা। বাচ্চা’রা বেশ বড়োসড়ো হয়েছে। সে কী খুশি সবাই। শহরের বাসায় ওঠেন আপা’রা। সপ্তাহখানেক পর আসেন বাপের বাড়ি। হৈ চৈ করে কাটে দিন। ঐ ব্যাপারে আরিফের সঙ্গে কোন আলাপ করেন না আপা। আরিফও চায় না আলাপটা উঠুক। অবশ্য আপা ইতোমধ্যে জেনে গেছেন আরিফের স্ত্রী মৌটুসির কোন কোন জন্মনিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া অব্যাহত নেই। মুচকি হাসলেন। আশাবাদে প্রীত হলেন। তিনমাস পর। এক মেঘলা সকালে মৌটুসি ওয়াক-ওয়াক করে ওঠে। শুনলেন সবাই। হাসলেন। অর্থপূর্ণ হাসির হল বিনিময়। চোখের তারায় তথ্যের ঝিলিক। সব লক্ষণাদি মিলিয়ে যা দাঁড়াল—আরিফ বাবা হবে! সুখবর। কিন্তু এ সুখবরটাই বিপত্তির কারণ হয়ে গেল—তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি করল ঐদিন রাতেই। রাতের খাবার পর জামিলা আপাই আলোচনার সূত্রপাত করেন। কোন ভূমিকা ছাড়াই বলেন—
ছেলে না হওয়া পর্যন্ত আমি যাচ্ছি না!
ছেলে হবে! জানলে কীভাবে! আরিফ হাসে।
ছেলেই হবে। ছেলে হোক আর মেয়েই হোক—আমি নিয়ে যাবোই। স্পষ্ট উচ্চারণে অঙ্গীকারের দৃঢ়তা। আরিফের চিন্তা হয়। বলে—
তুমি কী আমার চিঠিটা পড়ো নি!
পড়ার কী দরকার! তুই কি লিখবি সে কী আমি জানি না। একমাইল লম্বা লেকচার পড়ার আমার সময় নেই! কৃত্রিম তাচ্ছিল্য আপার কন্ঠে।

আরিফ তার আপাকে চেনে। চেনবে না কেন! আপন বড়বোন। শুধু কী তাই—চেনে, আপার স্বভাবকে চিরে চিরে চেনে। এ-ই আপাই তার প্রথম জীবনের পাঠশালা। কালেমা-কালাম-নামাজ, বর্ণমালা, ফ্যাশন-স্টাইল, কথাবলার ঢং, চিঠিলেখার নমুনা সবকিছুই তো এ-ই আপাই। আপার নান্দনিক অভিজ্ঞতা, প্রেমে না পড়ার রক্ষণশীল কৌশল, বান্ধবীদের খুনসুটি—চোখ টিপাটিপিতে রহস্যের জটখোলা। এমন অজস্র প্রকাশ্য-গোপন আলোচনার নির্লিপ্ত সাক্ষী সে। আর এসব জীবন-ঘনিষ্ঠ সাক্ষ্য তাবৎ আপাদের মনস্তত্ত্বপাঠে আরিফকে সূত্র-সহযোগিতা করে। আরিফের বড়আপা জামিলাই হচ্ছেন আরিফের তেত্রিশ বসন্তের অভিজ্ঞতার সবচেয়ে সুন্দর কনে। বিয়ের আগে আপাকে কনেদেখার ঘটনা ঘটেছিল মাত্র একদিনই। আরিফের স্মৃতিতে ঝলমল একরাত।
সেদিন রাতটা ছিল ভীষণ কালো। বাইশ বছরের আগের এক স্মারক রাত। অন্ধকার আকাশে ছড়ানো-দীঘল অবয়ব—উঠানের পাশের নাড়কেল গাছটিকেও দেখা যাচ্ছে না। এমনই কালোরাতের আঁধার চিরে আরিফদের প্রাঙ্গনে পা রাখেন এক সুদৃশ্য লন্ডনি সাহেব। মধ্য আকৃতির নাদুশনুদুশ সুন্দর মানুষ। আপাকে দেখতে এসেছেন। আরিফের মনটা অমাবস্যার মতই কালো হয়ে গেল—আপাকে এই লোকটা নিয়ে যাবে বিয়ে করে পাল্কীতে চড়িয়ে! লোকটাকে তার শত্রু মনে হচ্ছে। চুপ মেরে খাটের কোণায় বসে সন্দিগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে আজনবীর দিকে। দেখতে দেখতে শত্র ভাবাপন্ন লোকটাকে কেমন যেন আপন-আপন মনে হতে শুরু করল। বেশ সুন্দর লোকটা। আপাকে ডাকা হল। আরিফের বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে। আপার জন্যে দুঃখ হয়। যুবকমানুষ সামনে পড়লে যে-আপা দৌড়ে পালাতেন, সেই আপা এখন একটা অপরিচিত লোকের সামনে এসে দাঁড়াবেন আর লোকটা হা-করে তাকে দেখবে! কুরবানির গরুর মত। লোকটাকে আবার তার অসহ্য মনে হতে থাকে। দেখতে সুন্দর হলে কি হবে—লোকটা আসলেই খারাপ।
আপা আসেন। পাঁচ গজ দূরত্ব যেন পাঁচ যুগ হেঁটে। সুধীর বিনম্র পদক্ষেপ। লন্ঠনের উস্কে দেয়া হলুদাভ আলোর স্ফূরণ আপার ঘি-রঙা শাড়িতে উপচে পড়ে। মাথাটা শরমরাঙা আনত, মুখটা ঢলে-পড়া চাঁদ। আপা যেন এক মায়াবী ভুবন। অনাস্বাদিত সৌন্দর্যের সুস্নিগ্ধা আধেয়া। যে আধেয়া আলো ছড়াবে ভুবনে ভুবনে। কোন সে দুর্বিনীত পুরুষ এ আলোর মায়াবী মাতম উপেক্ষা করতে পারে! লন্ডনী সাহেবটির পলক কেন পড়ে নি তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা আজ বাইশটি বছর পর আরিফ এভাবেই—স্মৃতির মনিটর টিপে টিপে আনুপূর্বিক ঘটনার বিশ্লেষণে উপলব্ধি করে। দশ বছরের আরিফের অনভিজ্ঞ অনুভূতি আপার মাঝে যে বিস্ময়-সৈন্দর্য প্রত্যক্ষ করেছিল, সে প্রতীতির ছিল না কোন প্রতিপক্ষ। নরম কাদায় পড়া সেই বিমুগ্ধতার ছাপ সর্বকালীন শ্রেষ্ট সুন্দরের মানবীমীমূর্তিতে প্রতিবিম্বিত হতে থাকে। অনুভূতির পরতে পরতে সুপুষ্ট হওয়া সেই ভালোলাগাবোধ সকল কালের সকল বোধ-অভিজ্ঞতার মধ্যে অনন্য হয়ে ঝলমল করতে থাকে। আপা অনন্যা। আরিফের বাইশে যেমন, বত্রিশেও তেমন। সেই আপা আবেগে আলো ঢালা। কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গিতে একমুখী। আরিফের চিঠি কোন কাজে আসে নি। কেন? আরিফ জানে। তাই আপার আবেগের সাথে একাত্ম হওয়ার কৌশল নেয়। [চলমান]