সিনথেসিস

প্রকাশিত: ৯:৪৩ অপরাহ্ণ, জুলাই ১০, ২০২০

সিনথেসিস


শিকদার মুহাম্মদ কিব্রিয়াহ
শেষ অংশ:
আরিফ নরম কন্ঠে বলে—
আপু! তুমি তো আমার ভালের জন্যেই এটা করতে চাও, তাই না?
অবশ্যই। তোর কী মনে হয়! শানিত কন্ঠে আপা বলেন।
আমার জন্যে যতটা ভাবো, তার সিঁকি ভাগও নিজের জন্যে ভাবো না।
আপা হাসেন মিষ্টি করে—
তা যদি বুঝিস তবে আমার মতের উল্টো চলিস কেন!
উল্টো কোথায়—নীতিগত সমস্যা হলে—–
আরিফ শেষ করতে পারে না, আপা জ্বলে উঠেন—তোদের মত নীতিবাগিশরা দু’বেলা ঠিকমত খেতেও পারে না!
কিন্তু এতেই যদি তারা সন্তুষ্ট থাকে? আরিফের অনুচ্চ কন্ঠ।
এটা বাড়াবাড়ি—ফকিরের অহঙ্কার! স্পষ্ট তাচ্ছিল্য ঝরে আপার কন্ঠে।
তবে কী তাদেরকে অন্যায়ের সাথে আপস করতে বলছ!
আপস নয়, সমন্বয় করে চলতে বলছি।
কী রকম?
কেন তুইও তো বলিস বৃহত্তর স্বার্থে ক্ষুদ্র ব্যাপার বিবেচনা না করতে। বলিস না?
কিন্তু এটা তো ক্ষুদ্র ব্যাপার নয় আপু! একদম মৌলিক বিষয়—একেবারে জন্মকেই অস্বীকার!
অস্বীকার করতে বলছে কে! তুই উঠবি নাকি হাইকমিশনে—দেশজাতিকে উদ্ধার করবে কে! স্পষ্ট খোঁচা দেন আপা। আরিফ হাসে। কিন্তু পরক্ষণেই গম্ভীরকন্ঠে বলে—
মিথ্যে পরিচিতির রোজগার-সবকিছুই যে হারাম হবে আপা!
কেন? সে তো অবোধ-নাবালক। তার তো নিজের কোন ভূমিকা ছিল না, দায়ও তার নেই।
তাহলে দায়ী কে?
যারা নেবে তারাই দায়ী।
তাহলে জেনে-বুঝে দায়ী হচ্ছো কেন?
এটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। তোর কোন সমস্যা নয়।
ব্যক্তিগত হলেই কী অনৈতিক বিষয় নৈতিক হয়ে যায়! হারাম হালাল হয়ে যায়!
আমার ভাবনা আমি ভাববো। তোকে ভাবতে হবে না।
কিন্তু আমাকেও যে ভাবতে হচ্ছে আপা; কারণ আমার সম্মতি, সমর্থন ও সহযোগিতা থাকবে তো! দায় এড়িয়ে যাবার সুযোগ নেই যে!
তোর সম্মতি-অসম্মতির কোন দরকার হবে না—আমি জোর করেই নিয়ে যাব!
কিন্তু আমি যদি প্রতিরোধ না করি, তবে তো তা সম্মতিরই নামান্তর হবে।
তবে কী করতে চাস তুই! এক অবোধ আবেগ আপার জেদ বাড়িয়ে দিচ্ছে। চোখ টলমল করে ওঠে। অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে থাকেন। আরিফ জানে আলোচনার ধারা যখন বিষয় থেকে নিছক বিষয়ী হয়ে পড়ে, তখন আর গঠনমূলক মুক্ত বিতর্কের অবকাশ থাকে না। আপা এখন পুরোপুরি বিষয়ী হয়ে উঠেছেন আবেগী অহংবোধে। আরিফ আপার আবেগকে প্রশমিত করতে চায়। বলে হেসে হেসে—
আমি বাচ্চার একহাত ধরে টানবো, আর তুমি অন্যহাতে! ব্রিটেন-বাংলাদেশ যুদ্ধ। আমার আর কোন দায় থাকবে না! কী বলো?
আপা ওঠে চলে যান। এরপর থেকে এ ব্যাপারে কোন কথাই আর বলেন না। কিন্তু সময় কথা বলে ঠিকই। পৃথিবীর বয়স বাড়ে আরও আট মাস। জামিলা আপার রিটার্ন টিকিটের মেয়াদ আর মাত্র একমাস। কিন্তু আপা আরও কিছুদিন থেকে যেতে চান। আরিফের ভগ্নিপতি অনেক বোঝালেন কিন্তু তিনি অনড়। অবশেষে আরও দেড়মাস বাড়ানো হল। আপার মতলবটা তবে কী—আরিফ ভাবনায় পড়ে। এই ক’মাস তো কিছুই বলেন নি—গুম ধরে আছেন। ভেতরে ভেতরে তবে কী কোন প্লান করে বসে আছেন! টিকিটের মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ও সময় সবই তো স্পষ্টতই প্রশ্নবোধক। আরিফ জানে যুক্তির ওপর আবেগ প্রাধান্য পেলে হঠকারিতাই হয় সিদ্ধান্তগ্রহণের নিয়ামক-শক্তি। বিচলিত বোধ করতে থাকে আরিফ।

জামিলা আপা যথার্থই উপলব্ধি করতে পেরেছেন যে যুক্তিতর্কে এ বুদ্ধির ঢেকিটার সঙ্গে তিনি কুলিয়ে উঠতে পারবেন না—নীরবতাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। সময়মত তিনি জরুরি অবস্থা জারি করে দেবেন। মনে মনে এভাবেই পরিকল্পনা আঁটতে থাকেন। মৌটুসির ইডিডি ছিল গতকাল। কিন্তু কোন লক্ষণই নেই ওর আচরণে। দিব্যি এঘর-ওঘর করছে মধ্যাংশের বোঝা টেনে। আপা সন্দিগ্ধচোখে তাকান। কখনও এমনভাবে তাকান মনে হয় যেন গিলে খাবেন! আরিফ আপার অস্থিরতা ঠিকই অনুভব করে। ইতোমধ্যে আল্ট্রাসনোগ্রাফিতে দেখা গেছে ছেলেই হবে। আপার আগ্রহে যে উস্কানি ভাসছে, আরিফের নজরে তা ঠিকই ধরা পড়ে। কিন্তু দৃশ্যত আপা নির্লিপ্ত। ফুঁসছেন ভেতরে। সময় একদমই কম। ভীষণ চিন্তিত ও পেরেসান দেখছে তাকে আরিফ। জিজ্ঞেসও করতে পারছে না, বলতেও পারছে না কিছু। না, আরিফকে বলতে হয় না। আপাই বলেন—
কী রে আরিফ মৌটুসির ইডিডি তো চলে গেল; চেকআপ করিয়ে দেখ—–
এ রকম অনেকেরই হয়। পজিশন ঠিক আছে। দেখি কী হয়——নির্লিপ্ত জবাব আরিফের। ইচ্ছেকৃত। আপার অস্থিরতা টের পায়।
তবুও চেক করাতে অসুবিধা কী! আগ্রহ চেপেই বলেন সহজভাবে।
আচ্ছা দেখি।
ডাক্তার বলেছেন সব ঠিক আছে। চিন্তার কিছু নেই। অপেক্ষা করুন। কিন্তু আপা অপেক্ষা করবেন কীভাবে! প্রতিটি মূহুর্ত যাচ্ছে উৎকন্ঠায়। সংক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে তাকান মৌটুসির দিকে—যেন সে ইচ্ছে করেই আটকে রেখেছে। আজকালের মধ্যে কিছু না হলে হাইকমিশনে ওঠার কোন সুযোগই আর থাকবে না। অতঃপর মৌটুসির পেইন ওঠে। উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে আপার স্নায়ুতন্ত্র জুড়ে। আহা এখনও শেষ চেষ্টা করে দেখা যাবে। কিন্তু সময়? নিদারুণ সময়! মৌটুসিকে নিকটবর্তী ক্লিনিকে নেয়া হল। কিন্তু কয়েক ঘন্টার মধ্যেই ফিরে এল। ডাক্তার বললেন—ফলস পেইন। আপার মুখটা চুপসে যাওয়া বেলুনের মত হয়ে গেল। আরিফের ভীষণ কষ্টবোধ হতে থাকে আপার জন্যে। মুখে বলে না কিছু।
বেলা দুটোয় ফ্লাইট। দশটায় বের হতে হবে। কিন্তু বিপত্তি বাঁধালো মৌটুসি। ব্যথায় ককিয়ে ওঠে। সব লক্ষণও স্পষ্ট। আপার মাঝে এখন কোন উত্তেজনা নেই। কাঁদছেন। ব্যর্থতার জন্যে নয়—অসুস্থ মা, ভাইবোন, সংকটাপন্ন মৌটুসি, আত্মীয়-স্বজন, আর দেশগ্রামের সোঁদামাটির গন্ধভরা স্মৃতিকে পেছনে ফেলে যাবার আর্তি ছাড়া এখন আর কোন অনুযোগ নেই তার। কেবল নবজাতকের মুখটা দেখে যেতে পারলেই খুশি হতেন তিনি। কিন্তু তা আর হল না। ঠিক দুটোয় আপাদের বহনকারী বিমান আকাশে চাকা গুটিয়ে নিল পেটের ভেতর; আর দুটো পাঁচ মিনিটে মৌটুসির পেট থেকে বেরিয়ে এল এক ফুটফুটে ছেলে। বাংলাদেশের সবচেয়ে নবীন নাগরিক। প্রায় ছ’হাজার টাকার বৈদেশিক ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে চিৎকার করে ওঠে—হুঁয়া! হুঁয়া!
নতুন প্রজন্মের আগমনকে উপভোগ করতে পারে না আরিফ। আপার জন্যে মনটা ছটফট করতে থাকে। বারবার আপার নিরাশ মুখটি ভেসে ওঠে। আপা শুধু কী আপা? আপা নন তিনি—তিনিই তো আরিফের প্রকৃত অভিভাবক। অকাল পিতৃহীন আরিফকে আজকের এই পজিশনে টেনে আনতে এই আপাই বাবার ভূমিকা পালন করেছেন। তৃতীয়বিশ্বের এই দরিদ্র দেশটিতে আপার অব্যাহত সহযোগিতা না থাকলে কীভাবে কী হত ভেবেই পায় না আরিফ। তার মানবিক মনটা কেঁদে ওঠে। অস্ফূট আবেগ গুমরে মরে বুকের গহনে।
পরদিন বিকেল। ঘন্টাখানেক আগে লন্ডনের বাসায় পৌছেছেন আপা’রা। দীর্ঘ সফরক্লান্ত। চা খাচ্ছেন সবাই। ফোন বেজে ওঠে। আপাই অভ্যেসমত রিসিভার তুলে নেন—
হ্যালো!
আপা! আরিফ বলছি—ভালোয় ভালোয় পৌছতে পেরেছ তো?
হ্যাঁ হ্যাঁ কোন প্রবলেম হয় নি। ওদিকের খবর কী? মৌটুসি—
ছেলে হয়েছে। নর্মালি। সবাই ভাল আছে।
আলহামদুলিল্লাহ।
শোন আপা! তোমার পছন্দ করা নামটি রেখেছি ছেলের।
কেন! আমার দেয়া নাম কেন! তোর ছেলের নাম তুই রাখবি। আপার কন্ঠে অভিমানের অনুরণনটা স্পষ্ট।
ওরে বাপরে রাগ পড়ে নি দেখছি! আচ্ছা আপু শোন! আমি একটা সূত্র আবিষ্কার করেছি।
সূত্র! কীসের?
সূত্রটা হচ্ছে, তুমি আর বার্থ কন্ট্রোল করবে না।
কী যা-তা বলছিস?
হ্যাঁ, ঠিকই বলছি—তোমার তো মেয়েভাগ্য। কন্ট্রোল না করলে তোমার মেয়েই হবে। আর মেয়ে যখন বড় হবে, ভাইপো’র সঙ্গে বিয়ে দেবে। তখন ইমিগ্রান্টে আর কোন অসুবিধা থাকবে না।
ফাজলামো রাখ! আপা হাসতে থাকেন। বলেন আস্তে করে—আল্লাহর হুকুম হলে![শেষ]