সিনথেসিস

প্রকাশিত: ৯:১২ অপরাহ্ণ, জুলাই ৬, ২০২০

সিনথেসিস

শিকদার মুহাম্মদ কিব্রিয়াহ :বড় আপার চিঠি পড়ে বিস্মিত আরিফ। বলছেন কী আপু! এমন একটি প্রস্তাব কীভাবে মেনে নিতে পারে সে! আশ্চর্য! আপুটা যে কী! তিরিশ বছর ধরে ভাইটাকে জেনে আসছে—–আপারই-বা কী দোষ দেবে; বিষয়টা তো এ অঞ্চলে ব্যাপকভাবে প্রচলিত। চাচাকে বাবা ডেকে, খালাকে মা ডেকে হরদম ইমিগ্র্যান্ট হচ্ছে শত-শত ছেলেমেয়ে। কাগজী বাবা’রা-মা’রা একবারও চিন্তা করেন না কবে-কীভাবে তারা ঐ সন্তানের জনক-জননী ছিলেন বা হলেন! বিষয়টির অন্তর্গত কুৎসিত-নিকৃষ্ট বাস্তবতার স্বরূপটি একবারও ভেবে দেখার প্রয়োজন বোধ করেন না কেউ, বরং এ-ই জারজ মাতাপিতা’রা পরহিতকর মানসিকতায় নির্দ্বিধায় কাজটি করে যাচ্ছেন আর আত্মীয়-স্বজন-পরিজন দ্বারা প্রশংসিতও হচ্ছেন। এভাবেই একটি অসৎ-অনৈতিক কাজ সামাজিকভাবে মানবিক কাজের মর্যাদায় স্বীকৃত হয়ে আছে। ব্রিটিশ সিটিজেনশীপপ্রাপ্ত এ-দেশীয় মানুষদের মহানুভবতায় গরিব আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশী-পরিজনের ভাগ্যের দরজা খুলে যাচ্ছে—বদলে যাচ্ছে জীবন জীবনযাত্রার মান। রেমিটেন্স বাড়ছে দেশের। এর চেয়ে মহৎ কাজ আর কী হতে পারে?আরিফও এতদিন এ প্রচলিত সত্যটিকে সাধারণ চিন্তার আলোকেই হয়ত দেখে এসেছে। কিন্তু বিষয়টি তার ওপর এখন এসে পড়ায় গভীরভাবে একে বিবেচনা করার দায়বোধ এসে গেছে তার। কাজটার পরিণতি তো ভালোই। মানুষের কল্যাণসাধন। তাহলে খারাপ হবে কেন? যার পরিণাম ভাল, সে-ই কী ভাল নয়? নিজেকে প্রশ্ন করে আরিফ। যদি তা-ই হয়, তবে তো ধনীর সম্পদ লুঠ করে গরিবকে দান করলেও ‘ভাল’ বলতে হবে। কিন্তু লুন্ঠন বা ডাকাতী তো ভালো কাজ হতে পারে না। নৈতিক বা সৎ হতে পারে না। আরিফের চিন্তা সিদ্ধান্তে আসে যে, সৎ উদ্দেশ্য, পদ্ধতিগত সততা আর শুভ পরিণাম বা ফলাফল এ-তিনটির সমন্বয়েই কোন একটি কাজ শুভ বা নৈতিক হতে পারে। সুতরাং আপুর উদ্দেশ্য সৎ বা ভাল হলেও পদ্ধতি তো সৎ নয়; তাহলে কীভাবে মেনে নিতে পারে সে!আরিফের বড় আপা দেশে আসছেন। এবার এসে বছরখানেক থাকবেন। এমনই পরিকল্পনা করেছেন। ইতোমধ্যে আরিফের ঘরে জন্ম নেবে ছেলে। আর যাবার সময় আপা এ ছেলেটাকে নিয়ে যাবেন সঙ্গে করে। না, বাক্সে ভরে নয়; নিয়মমাফিক কাগজপত্র তৈরি করে—ভিসা নিয়েই। ব্রিটেন-অভিবাসী হবে আরিফের নবজাতক। সমৃদ্ধ জীবনের নিশ্চিত গ্যারান্টি পাবে আরিফ। উন্নত জীবনযাপন করবে—প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। আরিফের পড়ন্ত জীবন সুখ-স্বচ্ছন্দ্যে, স্বাদ-আহ্লাদে পূর্ণতা পাবে। লাভটা তো সবই আরিফের। কিন্তু আপার লাভটা কী? কোন লাভ নেই। বরং এ সন্তানকে বড় করতে, লেখাপড়া করাতে, উপার্জনক্ষম করে তুলতে সব দায়িত্ব তো তাকেই বহন করতে হবে। অর্থগত কোন প্রাপ্তির প্রত্যাশা বা প্রয়োজন কোনটাই নেই। আপার প্রাপ্তি নিছকই মনস্তাত্ত্বিক। আত্মগত শান্তির প্রাপ্তি। ভাইয়ের প্রতি দায়িত্বশীলতা পালনের তৃপ্তির প্রাপ্তি। সংবেদনশীল আত্মতৃপ্তি ছাড়া আর কিছুই নয়। সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলেন তিনি ইমিগ্র্যান্ট মেয়ের সাথে আরিফের বিয়ে দিয়ে ব্রিটেন নিয়ে যেতে। কিন্তু বোকাটি বুঝতে চায় নি! এ নাকি তার আদর্শের পরিপন্থী। তার চিন্তারও অতীত। দেশ-জাতি-জনতার জন্যে কাজ করবে সে! আপা গোস্বা করেন—”একদিকে কাঁথা টান দিলে অন্যদিকে বাতাস ঢোকে! উনি করবেন দেশসেবা!” বিদেশ এলেই যেন তাকে দেশবিরোধী হয়ে যেতে হবে! আরিফ সম্মত হয় নি। যুক্তির পর যুক্তি দেখিয়েছে। আপা হাল ছেড়ে দেন—”বান্দা তোর নাই হুঁস, মোর কী দোষ!” এভাবেই ভাইপ্রীতির প্রথম প্রজেক্টটা আপার ফেল করে। এবার দ্বিতীয় প্রজেক্ট। সূক্ষ্ণ পরিকল্পনা—দীর্ঘমেয়াদী। [চলবে]