স্বাধীনতার স্বরূপ ও চেতনা

প্রকাশিত: ১১:৩৭ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৩১, ২০২০

স্বাধীনতার স্বরূপ ও চেতনা


শিকদার মুহাম্মদ কিব্রিয়াহ:

‘স্বাধীনতা’ শব্দটির বহুল ব্যবহৃত সাধারণ বা পরিচিত ইংরেজি প্রতিশব্দগুলো হচ্ছে Freedom, Independence, Liberation বা Liberty ইত্যাদি। freedom মানে ‘মুক্ত থাকা’ অর্থাৎ কোন বন্ধন বা নিয়ন্ত্রণে না থাকা। independence শব্দটি dependence শব্দটির বিপরীত শব্দ। dependence মানে ‘নির্ভরতা’ বা ‘পরনির্ভরতা’ আর independence মানে ‘অনির্ভরতা’ বা পরনির্ভর না থাকা। liberation বা liberty মানে ‘মুক্ত করা’ অর্থাৎ কোন বন্ধন বা নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করা। I’m free বা I’m independent বলা চলে, কিন্তু I’m liberate বলা চলে না, বলতে হয় I’m liberated(by ‘someone’) অর্থাৎ free ও independent সাবজেক্টিভ বা বিষয়ীবাচক তথা active mood-এ প্রযুক্ত হলেও liberated অবজেক্টিভ বা বিষয়বাচক তথা passive mood-এ প্রযুক্ত হয়। সুতরাং বুঝা যাচ্ছে যে, শাব্দিক ব্যুৎপত্তিগত অর্থব্যঞ্জনায় স্বাধীনতা শব্দটির প্রতিশব্দরূপে freedom, independence ও liberation ইত্যাদি পুরোপুরি সমানভাবে সমার্থব্যঞ্জক নয়। আবার, ‘স্বাধীনতা’ শব্দটির সরাসরি বিশ্লেষণ হল স্ব+অধীনতা। স্পষ্টত এখানে ‘অধীনতা’ উপস্থিত, ‘স্ব’ নামক এক সত্তার অধীনতা বা নিয়ন্ত্রণ এখানে স্বীকৃত হয়েছে; যা অবশ্যই free বা মুক্ত থাকার বিপরীত—মুক্তথাকা মানেই সব রকমের বন্ধন বা অধীনতার অস্বীকৃতি। তাহলে, ‘স্বাধীনতা’ ও ‘freedom’ শব্দদু’টি কীভাবে সমার্থবাচক হয়? independence শব্দটির অর্থ পরনির্ভর না থাকা, মানে স্বনির্ভর থাকা। স্ব মানে নিজ। ‘নির্ভরতা’ আর ‘অধীনতা’ এক্ষেত্রে সমার্থবাচক বিবেচিত হতেই পারে। এ কারণেই স্বাধীনতা শব্দটির যথার্থ গ্রহণযোগ্য ইংরেজি প্রতিশব্দ হতে পারে independence।
স্বাধীনতা শব্দটির শাব্দিক অর্থ ‘নিজের অধীনতা’। মুক্ত থাকা বা মুক্ত করা নয়। আর নিজের অধীনে থাকার মানে হচ্ছে ব্যক্তিসত্তার নিজের কামনা-বাসনা ও ইচ্ছাশক্তির অনুগত থাকা। সোজাকথায় নিজের যা ইচ্ছা তা-ই করা। কারও ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে গ্রাহ্য না করা। কোন ঈশ্বর, অবতার, প্রেসিডেন্ট, নেতানেত্রী, আইনকানুন, বিচার, প্রশাসন, মাতাপিতা, শিক্ষক, গুরুজন, রাষ্ট্র-সমাজ, ধর্ম-আদর্শ-নীতি, প্রথা-পদ্ধতি-প্রতিষ্ঠান, মানবাধিকার, নিয়ম-শৃঙ্খলা কিছুরই আনুগত্য করা যাবে না, যদি না নিজের ইচ্ছের অনুরূপ হয়। ব্যক্তির ইচ্ছে হলে অন্যের জমির ধান কেটে নেবে, অন্যের মেয়েকে রাস্তা থেকে তুলে নেবে, পকেটের টাকা হাতড়ে নেবে, প্রয়োজন মনে করলে খুনখারাবি করবে। আবার এসবের বিপরীতগুলোও করতে পারবে। কারও কিছু বলার বা করার থাকবে না—যদি স্বাধীনতার এ সরল আক্ষরিক অর্থ গৃহীত হয়।
স্বাধীনতার শাব্দিক অর্থগতভাবে যদি ব্যক্তিক ‘স্বাধীনতা’ স্বীকৃত ও গৃহীত হয়, তবে ব্যক্তিক ইচ্ছাই হবে তার আচরণের নিয়ামক। প্রত্যক ব্যক্তির বিচিত্র ইচ্ছার বাস্তবায়নে সূচিত হবে দ্বন্দ্ব ও সংঘাত। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্বব্যবস্থা ধসে পড়বে। যার ক্ষমতা বেশি, সে বিজয়ী হবে তার নিজের ইচ্ছার বাস্তবায়নে। অন্যরা হবে অনিবার্যভাবে মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত, নিগৃহীত ও নির্যাতিত। ব্যক্তিক স্বেচ্ছাচারিতা সামাজিক, রাষ্ট্রিক ও আন্তর্জাতিক স্বৈরতন্ত্রে পরিণতি পাবে। “জোর যার মুল্লুক তার” নীতিতে নিরেট ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠিত হবে দানবীয় আগ্রাসী রূপে। নৈতিকতা, মানবতা ও সভ্যতার চিহ্নটুকুও মুছে যাবে পৃথিবী থেকে। হিংস্রতা, বর্বরতার পাশবিকতায় চরম নৈরাজ্যকর বিশৃঙ্খল-বিপর্যস্ত অবস্থা সর্বত্র অস্তিত্বশীল হবে।
পরিবেশ, পরিস্থিতি ও পরিণতি যা-ই হোক, শাব্দিক অর্থেই ব্যক্তিক স্বাধীনতাকে আপাত স্বীকার করে নেয়া যেতে পারে; যদি সত্যিকার অর্থেই ব্যক্তি স্বাধীন তথা স্ব+অধীন বলে প্রমাণিত হতে পারে। ব্যক্তির নিজের অধীনতা কেবল তখনই যৌক্তিক বলে বিবেচিত হতে পারে, যখন ব্যক্তি কোনভাবে কারও কাছে দায়বদ্ধ বা নির্ভর নয় বলে প্রমাণিত করতে পারবে। আর এভাবেই তার পূর্ণাঙ্গ সত্তার ওপর নিরঙ্কুশ অধিকার ও নিয়ন্ত্রণ যৌক্তিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে। ধরা যাক একজন ব্যক্তির বয়স ২৫। তিনি একটি রাষ্ট্রের নিবন্ধিত নাগরিক। প্রশ্ন হল, পঁচিশ বছর দশমাস আগে যখন তার মা’র জরায়ুতে লক্ষ লক্ষ শুক্রাণু নিক্ষিপ্ত হয়েছিল, যেগুলোর মাত্র একটি ডিম্বাণুর সাথে নিষিক্ত হয়ে ভ্রূণ সৃষ্টি করেছিল; সেই শুক্রাণগুলোর নিক্ষেপ, একটিমাত্র শুক্রাণুকে নিষেকের জন্যে বাছাই এবং নিষিক্তকরণের কাজগুলো কী তিনি নিজেই করেছিলেন? নিজেকে মানুষরূপে সৃষ্টি করা, ঐ মা ও জরায়ু ইত্যাদি নির্বাচনসহ সকল সিদ্ধান্ত কী তিনি নিজের ইচ্ছায় গ্রহণ করেছিলেন এবং সিদ্ধান্তের বাস্তবায়নে সব রকম ভূমিকা নিজেই পালন করেছিলেন? মাতৃগর্ভে নিজের নিরাপত্তা ও ভরণপোষণের ব্যবস্থা কী নিজে করেছেন? জন্মের পর তার বেড়ে ওঠা-লালনপালন তথা অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা, নিরাপত্তাসহ যাবতীয় আবশ্যক চাহিদা কী নিজেই মিটিয়েছেন? প্রশ্নগুলোর উত্তর হ্যাঁ-বাচক হলে তার জন্ম তার স্বেচ্ছাকৃত, পরিকল্পিত ও প্রস্তুতকৃত—কারও কোন প্রকার ইচ্ছা বা ভূমিকা এক্ষেত্রে কোনভাবেই কার্যকর ছিল না। অতএব, প্রশ্নগুলোর ইতিবাচক উত্তরের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্তে আসা যাবে যে, ব্যক্তিসত্তাটির নিজের ওপর নিরঙ্কুশ অধিকার ও নিয়ন্ত্রণ আছে। এ হিসেবে যুক্তিসংগত কারণেই তিনি নিজে নিজেরই অধীন অর্থাৎ স্বাধীন।
বাস্তব জগতে এ ধরনের কোন মানুষের অস্তিত্ব চিন্তারও অতীত। কারণ, কোন ব্যক্তি বা প্রাণীই নিজেকে সৃষ্টি করতে পারে না। পরিণত হওয়া পর্যন্ত নিজে নিজের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারে না। আর পারে না বলেই নিজেকে নিরঙ্কুশভাবে নিজের বলে দাবিও করতে পারে না। এটিই যুক্তিসিদ্ধ কথা।
আবার, পরিণত হওয়ার পরও তার সৃষ্টি ও সৃষ্টি-পরবর্তী অপরিণত অবস্থার সামগ্রিক বিষয়কে সে অস্বীকারও করতে পারে না। কেননা এ অস্বীকৃতি তার অস্তিত্বেরই অস্বীকৃতির নামান্তর। সেজন্যেই, পরিণত হওয়ার পরও তার সৃষ্টি ও সৃষ্টি-পরবর্তী সার্বিক বিষয়ে সে অপরাপর সত্তার কাছে দায়বদ্ধ। দায়বদ্ধতা আনুপাতিকভাবে পরাধীনতার শামিল। সুতরাং স্বাধীনতার শাব্দিক অর্থে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ধারণা একেবারেই অবাস্তব ও অসম্ভব।
“মানুষ জন্মগতভাবে স্বাধীন”—প্রবাদপ্রতিম এ উক্তিটি যে কতটা সারশূন্য, অযৌক্তিক ও অলীক, আমাদের ইতঃপূর্বেকার আলোচনায় তা সুস্পষ্ট হয়েছে বলেই মনে করি। প্রকৃত বিষয়টি হল, ব্যক্তিত্বের বিকাশ ও স্বনির্ভরতা অর্জনের পূর্ব পর্যন্ত মানুষ কার্যত পুরোপুরিই পরনির্ভর বা পরাধীন। এখন প্রশ্ন হল, প্রাপ্তবয়স্কতার মানদণ্ডে ব্যক্তিত্বের বিকাশ ও স্বনির্ভরতার ধর্তব্য জীবনপর্বে ব্যক্তিক ইচ্ছা ও কর্মের স্বাধীনতা কী নিরঙ্কুশ? ব্যক্তি কী যা ইচ্ছে তা-ই করতে পারে? যা ইচ্ছে তা-ই ভোগ করতে পারে? যা হতে চায় তা-ই হতে পারে? নিজেই নিজের নিরাপত্তা দিতে পারে? বিপদ-আপদ, প্রাকৃতিক ঘটনা-দুর্ঘটনা, অসুস্থতা বা ইচ্ছা, চাহিদা, কামনা-বাসনা ও রূচিবিরোধী সবকিছু থেকে মুক্ত থাকতে পারে বা শতভাগ প্রতিরোধ করতে পারে? ব্যক্তি কী তার আন্তরিক ইচ্ছের অনুরূপ সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে পরিপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারে? মৃত্যুকে ঠেকিয়ে অনন্তকাল জীবিত থাকতে পারে?
আত্মসচেতন ব্যক্তিমাত্রই জানেন যে, জবাব প্রতিটি ক্ষেত্রেই নেতিবাচক। অর্থাৎ ব্যক্তিমাত্রই প্রকৃতি-পরিবেশ ও পরিস্থিতিগত কারণে প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রিত। ইচ্ছার বাস্তবায়ন, কর্মপ্রবৃত্তায়ন ও ফলাফল ভোগ ও উপভোগে সে নিরঙ্কুশভাবে স্বনির্ভর বা স্বাধীন তো নয়ই, বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরনির্ভর বা পরাধীন। সুতরাং প্রাপ্তবয়স্কতার পূর্বে যেমন সে স্বনিয়ন্ত্রিত নয়, তেমনই প্রাপ্তবয়স্কতার সক্ষম সময়েও সে তার জৈবিক-মানবিক বা পাশবিক যে-কোন ইচ্ছেপূরণের প্রশ্নে পূর্ণাঙ্গ তো নয়ই বরং খুবই সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে। স্পষ্টতই ব্যক্তিস্বাধীনতার ধারণা, বাস্তবতা ও দাবী আক্ষরিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। তাহলে, যে স্বাধীনতার জন্যে যুগ-যুগান্তরের সংগ্রাম, অগণন মানুষের জীবন ও রক্তক্ষয়, প্রতিটি ব্যক্তিসত্তা, জাতিসত্তা, মানবতা ও সভ্যতার প্রাণের দাবী, যে স্বাধীনতাকে দাবিয়ে রাখার জন্যে প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই সব রকমের অপকৌশল, ষড়যন্ত্র, বলপ্রয়োগ, আগ্রাসন, নির্যাতন, হত্যা ও ধর্ষণের ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টির অপচেষ্টা চলে আসছে; সেই স্বাধীনতার স্বরূপ, তাৎপর্য, লক্ষ্যমাত্রা ও বাস্তবতা কী?
মানুষ সামাজিক জীব। এজন্যেই সে আত্মসুখবাদী তথা আত্মস্বার্থবাদী হতে পারে না। নিজের সুখ, স্বার্থ বা কল্যাণই তার একমাত্র কামনা বা ইচ্ছার বিষয় হতে পারে না। নিজের সুখ-স্বার্থ ও কল্যাণের জন্যে সে অন্যের সুখ-স্বার্থ-কল্যাণ বিনষ্ট করতে পারে না। নিজের অধিকার অর্জনের পাশাপাশি অন্যের অধিকারের প্রতিও তাকে সমানভাবে শ্রদ্ধাশীল ও যত্নশীল থাকতে হবে। এ কারণেই ‘স্বাধীনতা’ শব্দটির ‘স্ব’ একান্তভাবে ব্যক্তিসত্তার ব্যক্তিকেন্দ্রিক ইচ্ছা-অনিচ্ছার অর্থজ্ঞাপক নয়, বরং ব্যক্তিসত্তা কর্তৃক গৃহীত, অনুমোদিত বা স্বীকৃত একটি সামাজিক বা সামষ্টিক আদর্শব্যবস্থা; যেটির অধীনে ব্যক্তি তার নিজের ও অন্যান্য সকলের মৌলিক ও মানবীয় নাগরিক অধিকার সংরক্ষণের পাশাপাশি স্বীয় ব্যক্তিত্বের কাঙ্ক্ষিত বিকাশ ও উন্নতি-অগ্রগতির উপযুক্ত পরিবেশ পাবে বলে মনে করে। অর্থাৎ ব্যক্তি ও সমষ্টির অধিকার সংরক্ষণ ও উন্নতি-অগ্রগতির নিমিত্তার্থক আইনগত কাঠামোর অধীনেই ব্যক্তি তার ইচ্ছা-অনিচ্ছার প্রতিফলন ঘটাবে।
স্পষ্টতই এটি নিরঙ্কুশ ব্যক্তিস্বাধীনতা নয়। এটি সীমিত ও সংবিধিবদ্ধ। এজন্যেই যা ইচ্ছা তা-ই করার নামই স্বাধীনতা নয়। এটা স্বেচ্ছাচার। স্বেচ্ছাচারিতা স্বাধীনতার প্রতিবন্ধক। কারণ, এটি অন্যের স্বাধীনতা তথা অধিকার হরণ করে। এটা নৈরাজ্যকর। বিশৃঙ্খল, বর্বর ও মানবতা-সভ্যতা বিধ্বংসী। এটা ফলত স্বাধীনতাহীনতার অনিবার্য পরিণতিতে ব্যক্তিমানুষকে পরাধীন করে তোলে।
প্রকৃতপক্ষে, স্বাধীনতা মানেই আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের পাশাপাশি আত্মবিকাশের সর্বোত্তম সামাজিক তথা রাষ্ট্রিক পরিবেশ সংরক্ষণ। এজন্যে, সর্বস্তরে জনসচেতনতা, দায়িত্বশীলতা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও পরিবেশ সংরক্ষণ ও আইনের শাসনের প্রতি আনুগত্য স্বাধীনতার শর্ত। রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও নীতিবিজ্ঞানে স্বাধীনতার এই দ্বিতীয় অর্থটিই ইতিবাচকরূপে গৃহীত হয়, আক্ষরিক অর্থবোধক প্রথমটি নয়। অধ্যাপক Gettel বলেন, ” Liberty is the positive power of doing and enjoying those things which are worthy of enjoyment and work.” রাষ্ট্রবিজ্ঞানী লাস্কি বলেন, ” By liberty I mean the eager maintenance of that atmosphere in which men have the opportunity to be their best selves. Liberty, therefore, is a product of rights”( A Grammar of Politics, p, 143) অর্থাৎ “স্বাধীনতা বলতে আমি সেই পরিবেশ সযত্নে সংরক্ষণ করাই বুঝি, যেখানে মানুষ তাদের সত্তার সর্বোত্তম বিকাশের সুযোগ পাবে। সুতরাং স্বাধীনতা অধিকারসমূহেরই সৃষ্টিবিশেষ।”—লাস্কি।
স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীলতা অনিবার্যভাবে একটি আরেকটির পরিপূরক। আধুনিক ও প্রচলিত অর্থে স্বাধীনতা বলতে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাষ্ট্রের নাগরিক সংবিধিবদ্ধভাবে রাষ্ট্রীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে যেসব অধিকার ভোগ করে থাকে, রাষ্ট্র কর্তৃক সেসব অধিকার ভোগ করার উপযুক্ত পরিবেশ সংরক্ষণ করাকেই বুঝানো হয়ে থাকে। রাষ্ট্রের নাগরিক যেমন রাষ্ট্রের সংবিধান ও আইন মেনে চলতে বাধ্য, রাষ্ট্রও তেমনি নাগরিক অধিকার সুরক্ষা দিতে দায়বদ্ধ।
আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান অনুসারে, ব্যক্তিস্বাধীনতার বিবেচ্য বিষয়গুলো হল: স্বাধীন চিন্তা ও মত প্রকাশের অধিকার তথা বাক স্বাধীনতা, জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যরক্ষার অধিকার, শিক্ষার অধিকার, অর্থনৈতিক অধিকার তথা সম্পদ অর্জন-উৎপাদন ও বন্টন, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি, সরকারি কাজে অংশগ্রহণ ইত্যাদি, ধর্মীয় অধিকার, সংগঠন ও ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার তথা ভোটাধিকার ও নির্বাচনে প্রার্থীতা, সরকারের সমালোচনা, মিছিল-সমাবেশ ইত্যাদি এবং ন্যায়বিচার ইত্যাদি। এসব বিষয় নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের—রাষ্ট্রের আইনগত কর্তৃপক্ষের অর্থাৎ গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের। সরকার রাষ্ট্রের নাগরিকদের ব্যক্তিস্বাধীনতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অধিকার পূরণে ব্যর্থ হলে জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-সমাবেশ-মিছিল ইত্যাদির মাধ্যমে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করতে পারে এবং নির্বাচনের মাধ্যমে ব্যর্থ সরকারের পরিবর্তন করতে পারে, নতুন সরকার প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। জনগণের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার সুরক্ষার জন্যে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার কোন বিকল্প নেই। কেননা রাজতন্ত্র, সমাজতন্ত্র বা কম্যুনিজম, সামরিকতন্ত্র বা অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী অগণতান্ত্রিক সরকারের শাসনব্যবস্থা একনায়কতান্ত্রিক বা একদলীয় হওয়ার কারণে সর্বাত্মকবাদী বা ফ্যাসিবাদী স্বৈরশাসনে ব্যক্তিস্বাধীনতা তথা নাগরিক অধিকার বিঘ্নিত হয়। এ ধরনের শাসনে চরম বলপ্রয়োগনীতি কার্যকর করা হয়। জনগণের স্বাধীনতা বলতে কিছুই আর থাকে না। জনগণের স্বাধীনতা সুরক্ষার একমাত্র উপায় হচ্ছে শুদ্ধ ও সার্বভৌম গণতান্ত্রিক পদ্ধতির কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।
একটি কল্যাণরাষ্ট প্রতিষ্ঠার জন্যে প্রয়োজন রাষ্ট্র ও জনগণের অংশগ্রহণমূলক মিশ্র অর্থব্যবস্থা। কেননা, পুঁজিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থায় পুঁজিপতিদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে সাধারণ ও শ্রমিক শ্রেণির মানুষ। আবার, সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাষ্ট্রীয় সম্পদের কর্তৃত্ব ও পরিচালনার একচ্ছত্র অধিকার থাকে ক্ষমতাসীন পার্টির হাতে, ফলে এটা রাষ্ট্রীয় বা পার্টির পুঁজিবাদে কার্যত পরিণত হয়। সাধারণ মানুষ ও শ্রমিক শ্রেণি স্বরূপত পার্টি বা সরকার দ্বারা শোষিতই থেকে যায়। (১), সরকারের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণমুক্ত স্বাধীন, সৎ, নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন(২), পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন বিচারবিভাগ(৩), নির্বাচনের আগে সরকারের পদত্যাগ(৪), রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানের ক্ষমতার গুণগত ভারসাম্য(৫), সংবিধান-সংরক্ষণ, সশস্ত্রবাহিনী নিয়োগ, পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা, বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশন ইত্যাদি রাষ্ট্রপ্রধানের হাতে ন্যস্ত থাকা(৬), জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে একই দিনে প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচন করা(৭), সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ, জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ব্যবস্থা করা(৮), সকল ক্ষেত্রে সরকারের দায়বদ্ধতা, সততা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা(৯), সংবাদপত্রসহ মিডিয়ার স্বাধীনতা(১০), সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখা(১১), দুর্নীতিমুক্ত সরকার পরিচালনা(১২), সরকারি কর্মচারি তথা প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীকে শতভাগ রাজনীতিমুক্ত রাখা(১৩), সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে নিরঙ্কুশ ভিত্তিতে সুসংহত রাখা। কারণ, জাতীয় স্বাধীনতা অন্যান্য সকল স্বাধীনতার ভিত্তি (১৪) এবং জাতীয় ঐক্য ও সংহতিকে উত্তরোত্তর জোরদার করা, পরদেশপ্রীতি ও অহেতুক আনুগত্য-প্রদর্শন না করা, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাকগলান বা হস্তক্ষেপের সুযোগ না দেয়া এবং জাতীয় ঐক্য ও সংহতির বিভাজনধর্মী সকল তৎপরতা থেকে রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত রাখা(১৫)।
অধিকার ও কর্তব্য পরস্পরের পরিপূরক। অধিকার ভোগ করতে হলে কর্তব্য পালন করতে হয়। আবার, কর্তব্য আদায় করতে হলে অধিকার দিতে হয়। রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক মূলত এ রকম। রাষ্ট্র নাগরিকের ব্যক্তিস্বাধীনতা-সংশ্লিষ্ট অধিকার তথা আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ও আত্মবিকাশের অধিকার পূরণ করবে, আর বিনিময়ে নাগরিক তার নাগরিক দায়িত্ব ও কর্তব্যসমূহ পালন করবে। যুক্তিসংগত কারণেই একজন নাগরিককে অবশ্যই তার অধিকার, দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সজ্ঞান ও সচেতন থাকতে হবে। অন্যথায় তাকে অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে হবে—স্বাধীনতা হারাতে হবে এবং কর্তব্যে অবহেলা বা দায়িত্ব পালন না করার দায়ও নিতে হবে। [চলমান]
রাষ্ট্রের নাগরিকদের অধিকার তথা ব্যক্তিস্বাধীনতা সংরক্ষণে রাষ্ট্রের সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে নাগরিক অধিকারগুলো লিপিবদ্ধ থাকা আবশ্যক। রাষ্ট্রের নাগরিক কোনভাবে এসব অধিকার থেকে বঞ্চিত হলে আইনগতভাবে যাতে ব্যবস্থা নিতে পারে—সংবিধিবদ্ধ নাগরিক অধিকার ফিরে পেতে পারে, সেজন্যে সরকার তথা রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ, প্রভাব ও হস্তক্ষেপমুক্ত স্বাধীন বিচারব্যবস্থা থাকতে হবে। বিচারপ্রার্থীতার স্বাধীন তথা কর্তৃপক্ষীয় বা রাজনৈতিক ভীতি-প্রদর্শন, হামলা, অপহরণ, ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যামামলা, রিমাণ্ড, চাঁদাবাজি, ধর্ষণ, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ইত্যাদির আশঙ্কা থেকে মুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত হতে হবে।
বিচারবিভাগ শাসনবিভাগ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক ও স্বায়ত্তশাসিত না থাকলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা আদৌ সম্ভব নয়। এজন্যেই গণতন্ত্রের সফলতার অনিবার্য শর্ত হল বিচারবিভাগের স্বাধীনতা। নাগরিক অধিকার সুরক্ষায় আইনের শাসন নিশ্চিত হতে হবে সাম্যের ভিত্তিতে। রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান, মন্ত্রী-আমলা-আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা নির্বিশেষে আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ সুনিশ্চিত হতে হবে। পাশাপাশি, রাষ্ট্রের নাগরিক তথা দেশের জনগণের অধিকার রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত রাষ্ট্রের কর্মচারি ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা এবং জনগণের পক্ষ থেকে দেশ পরিচালনার ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত দায়িত্বশীল সরকারের জন্যে সাংবিধানিকভাবে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রাখা এবং তা কার্যকর করা। স্বাধীন বিচারবিভাগের মাধ্যমে এটি স্বচ্ছ ও সৎভাবে কার্যকর হলে রাষ্ট্রে সরকারি, প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি বিকশিত হবার ও অস্তিত্বশীল হবার সুযোগ থাকবে না। সরকার ও সরকারের অধীন সকল বিভাগ, প্রশাসন ও প্রতিষ্ঠান প্রকৃত অর্থেই জনকল্যাণ ও জনসেবার মাধ্যমে নাগরিক অধিকার ও জনগণের আইনগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে। সরকার ও প্রশাসন নিরপেক্ষ, ন্যায় ও নীতিনিষ্ঠ, সৎ, সেবাধর্মী ও দুর্নীতিমুক্ত থাকলে সামাজিক বিভিন্ন ধরনের অপরাধ সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। মোটকথা, প্রকৃত গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত বৈধ সরকার দ্বারা সাংবিধানিকভাবে আইনের শাসন, দুর্নীতিমুক্ত সরকার ও প্রশাসন এবং নিরপেক্ষ-ন্যায়বিচার নিশ্চিত হলেই সংরক্ষিত হবে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার।
অগণতান্ত্রিক বা অবৈধভাবে ক্ষমতাসীন কোন সরকারের শাসনে জনগণের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার সংরক্ষিত থাকার কোন সম্ভাবনা নেই। কারণ, অবৈধ সরকার তার অবৈধ শাসনকে টিকিয়ে রাখা বা প্রলম্বিত করার জন্যে সব রকমের অবৈধ পন্থা অবলম্বন করে বৈধতা নেবার চেষ্টা করে। এজন্যে, গোয়েবলসীয় কায়দায় মিথ্যাচার, ষড়যন্ত্র, প্রশাসনকে অপব্যবহার, ভোটহরণ, বিরোধীদল দমন, মামলা, রিমান্ড, হামলা, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধকরণ, অপরাধচক্র ও পেশিশক্তির তোষণ, মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদির মাধ্যমে সাধারণ মানুষ ও দেশকে কার্যত ফ্যাসিস্ট শাসনে জিম্মি করে ফেলে। রাষ্ট্র পরিণত হয় একটি দলীয় সর্বাত্মকবাদী রাষ্ট্রে। ব্যক্তিস্বাধীনতা বা নাগরিক অধিকার এ ধরনের সর্বাত্মকধর্মী রাষ্ট্রে মারাত্মকভাবে লঙ্ঘিত হয়। কঠোর নিয়ন্ত্রণবাদী এসব রাষ্ট্র পরিণত হয় মূলত একটি কারাগারে। যেমন, বর্তমান উত্তর কোরিয়া সর্বাত্মকবাদ বা একনায়কতান্ত্রিক স্বৈরশাসনের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। গনক্ষোভ যখন বিক্ষোভে রূপ নিতে শুরু করে, তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে চালান হয় দমননীতির স্টিমরোলার। সৃষ্টি হতে থাকে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির। তখন মানবতার ধ্বজা ধরে মধ্যস্থতার নামে মাতব্বরি করার সুযোগ পায় দেশি-বিদেশি সুবিধাবাদী গোষ্ঠী। আর এভাবে জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বও পরনির্ভর হয়ে পরাধীনতাকে ধারণ করতে থাকে চেতনে-অবচেতনে। আত্মঘাতী এ চেতনা বা অবচেতনা এক সময় সর্বগ্রাসী স্বরূপে আবির্ভূত হয়। এজন্যেই ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রথম ও প্রধান শর্তই হল জাতীয় স্বাধীনতা। আর জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সুরক্ষার শর্ত হল জাতিসত্তার স্বাতন্ত্র্যভিত্তিক চেতনার ঐক্যবিধায়ক দেশপ্রেম।
স্বাধীনতা ব্যক্তিসত্তার সহজাত বোধ। ব্যক্তি সব সময়ই স্বাধীনচেতা। কিন্তু এ বোধ সবার মাঝে সমানভাবে অনুভূতিশীল হয় না। পরাধীনতা বা পরনির্ভরতার আনুপাতিক প্রভাব ও প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিসত্তায় স্বাধীনতার এ বোধ বা চেতনার মাত্রাগত তারতম্য হয়ে থাকে। আর্থ-সামাজিকভাবে দুর্বল একজন স্বল্পক্ষম বা অক্ষম ব্যক্তি যদি সক্ষম এক বা একাধিক ব্যক্তির অনুগ্রহ-আনুকূল্যে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করতে থাকে দীর্ঘকাল ধরে, কোনভাবেই স্বনির্ভর সক্ষমতা অর্জন করতে না পারে; তবে অব্যাহত পরনির্ভর জীবনচর্চার কারণে তার ব্যক্তিত্বচেতনা তথা স্বাধীনতার বোধ ক্রমশ লোপ পেতে থাকে। অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদী পরনির্ভরতা বা পরাধীনতার কারণে ব্যক্তিত্ববোধের চেতনার স্তরগুলো দুর্বলতর হতে থাকে। সচেতন মন থেকে অবচেতন মনে এবং এক সময় অবচেতন মন থেকে অচেতন মনে হারিয়ে যায়। এভাবে এ-ই বোধ বা চেতনার বিলুপ্তি ঘটে। ব্যক্তিত্ববোধের স্থলে প্রতিষ্ঠিত হয় ব্যক্তিত্বহীনতার বোধ।
ব্যক্তিত্ববোধের বিলুপ্তির ফলে ব্যক্তিসত্তার মধ্যকার সম্ভাবনাগুলো তো বিকশিত হয়-ই না, উপরন্তু ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। ব্যক্তি পরিণত হয় একটি অথর্ব, অনুর্বর ও অনুৎপাদনশীল ব্যক্তিমানুষে। এ ধরনের ব্যক্তিসত্তায় কর্তৃত্ব-নেতৃত্ব আর সৃষ্টিশীলতার অনুভূতির পরিবর্তে কেবল আনুগত্য আর অনুকরণের চেতনা তৈরি হয়। ক্রমশ এটি তার স্বভাবগত হয়ে ওঠে। আর এ স্বভাবচর্চার পরিপ্রেক্ষিতে নির্মিত হতে থাকে তার ব্যক্তিত্বের পরাধীন স্বরূপ। ব্যক্তিচেতনার ক্ষেত্রে এটি যেমন সত্য, তেমনি সত্য জাতিসত্তার চেতনার ক্ষেত্রে।
একজন ব্যক্তিত্বহীন ব্যক্তি যখন তার ভাল-মন্দ তথা কল্যাণ-অকল্যাণ চিন্তার বোধবর্জিত হয়—করণীয়-বর্জনীয় নির্ধারণ করার ব্যাপারে প্রায়ই অন্যের মুখাপেক্ষী হয় এবং তার ব্যক্তিগত বিষয়ে অন্যের হস্তক্ষেপ-নির্ভর হয়, তখন সে-ই ‘অন্যব্যক্তি’ পরামর্শ-সহযোগিতা ও অনুগ্রহ-অনুদানের নামে অনধিকার চর্চা করে, অন্যায় আনুগত্য ও স্বার্থ আদায় করে নিতে থাকে, কিন্তু পরনির্ভর ব্যক্তিটি ততদিনে প্রতিরোধ করার সব রকমের যোগ্যতা, অধিকার ও ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। একইভাবে একটি রাষ্ট্রের নাগরিকরা যখন তাদের মৌলিক নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার পরও প্রতিবাদহীন থাকে, অধিকার ফিরে পাবার জন্য সচেষ্ট না হয়, ত্যাগ স্বীকার করতে না চায়, ভাগ্যের ওপর সবকিছু ছেড়ে দেয়, তবে সে-ই রাষ্ট্রের নাগরিকরা স্বৈরশাসনের অধীনে স্থায়ীভাবে তাদের ন্যায্য অধিকার ও স্বাধীনতা হারায়।
ব্যক্তিত্বহীন ব্যক্তিসত্তার মতো যে জাতিরাষ্ট্র স্বনির্ভরতা অর্জন করতে পারে না, অন্য রাষ্ট্রের অনুগ্রহ-অনুদানের ওপর টিকে থাকে বা থাকতে চায়, সে-ই রাষ্ট্রকেও দাতাদেশগুলোর স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্নমুখী আব্দার মেনে নিতে হয়—জাতীয় স্বার্থের বিপক্ষে হলেও কেবল নির্ভরতার কারণেই তা মেনে নিতে হয়। দাতাদেশগুলো নানাভাবে অনধিকার চর্চা করে, অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নাক গলায়—হস্তক্ষেপ করে। এজন্যেই প্রত্যেকটি স্বাধীন রাষ্ট্রের উচিত স্বনির্ভরতা অর্জন করার জন্যে সর্বশক্তি নিয়োগ করা। দেশের সকল নাগরিকের মেধা-যোগ্যতার বিকাশ ঘটিয়ে কর্মক্ষম ও উৎপাদনশীল মানবসম্পদ ও জনশক্তিতে পরিণত করা। এ লক্ষ্য অর্জনে গণতান্ত্রিক পরিবেশ এবং দুর্নীতিমুক্ত সৎ সরকার ও প্রশাসনের মাধ্যমে নাগরিক অধিকার ও স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করা। জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সুরক্ষায় জাতিসত্তার ভৌগোলিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক, নৃতাত্ত্বিক ও ভাষাতাত্ত্বিক স্বাতন্ত্র্যের ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্য ও সংহতিকে জোরদার করা, বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ রোধ করা, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রতিবেশী-আধিপত্যবাদী বা সাম্রাজ্যবাদী কারও নাক গলানোর বা হস্তক্ষেপ করার কোন সুযোগ না দেয়া এবং সর্বোপরি স্বাধীন-সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা।
অস্তিত্বের অনুভব আর ব্যক্তিত্ব বিকাশের বোধ-ই হচ্ছে ব্যক্তিত্বশীলতা বা স্বাধীনতার চেতনা। সচেতন মনের সক্রিয় স্তরে এর অবস্থান। অবচেতন বা অচেতন স্তরে নয়। অবচেতন মনে নিষ্ক্রিয় আর অচেতন মনে এ চেতনা সুপ্ত অবস্থায় থাকে—একেবারে বিলোপ হয়ে যায় না। ঘাত-প্রতিঘাত, সংক্ষোভ-সংঘাতের মধ্য দিয়ে অচেতন মনে সুপ্ত বা লুপ্তপ্রায় অথবা অবচেতন মনে নিষ্ক্রিয় এ চেতনা আবারও জেগে ওঠে—সচেতন মনের সক্রিয়তায় অস্তিত্বশীল হয়ে ওঠে। মোটকথা, স্বাধীনতা বা ব্যক্তিত্ববোধের চেতনা ব্যক্তিসত্তার স্বরূপগত। একে অস্বীকার করা বা অবদমিত করা একটি অপ্রাকৃতিক ও মানবতাবিরোধী অপরাধ। প্রতিটি ব্যক্তিসত্তার যেমন তার অস্তিত্বচেতনা তথা সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতার ভিত্তিতে অধিকার, দায়িত্ব ও কর্তব্য এবং ব্যক্তিত্বের বিকাশ সম্পর্কে পরিপূর্ণ আত্মসচেতন, সতর্ক ও সচেষ্ট থাকা আবশ্যক, তেমনি আইনগত কর্তৃত্ব তথা প্রচলিত অর্থে রাষ্ট্রের শাসককেও জনগণের স্বাধীনতা, জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌম সুরক্ষায় আন্তরিক ও দায়িত্বশীল হতে হবে। [শেষ]