৮৬ বছর পর বিখ্যাত ‘আয়া সোফিয়ায়’ আজানের ধ্বনি

প্রকাশিত: ৩:০৩ অপরাহ্ণ, জুলাই ১১, ২০২০

৮৬ বছর পর বিখ্যাত ‘আয়া সোফিয়ায়’ আজানের ধ্বনি<br><br>

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

প্রায় দেড় হাজার বছর আগে গির্জা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ইস্তাম্বুলের বিশ্বখ্যাত হাজিয়া সোপিয়া জাদুঘরকে আবারও মসজিদ বানানোর ঘোষণা দিয়েছে তুরস্ক। গতকাল শুক্রবার তুরস্কের আদালত হাজিয়া সোফিয়া’র জাদুঘর মর্যাদা নাকচ করে দেওয়ার এক ঘণ্টা পর প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েব এরদোয়ান সেটিকে মসজিদ করার ঘোষণা দেন। আর তা অনুসরণ করে প্রায় ৮৬ বছর পর সেখানে প্রথমবারের মতো নামাজ আদায় হয়েছে। তুরস্কের কর্মকর্তারা বলছেন, মসজিদ বানানো হলেও সেখানে পর্যটকদের ভ্রমণ সুবিধা অব্যাহত থাকবে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি’র প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
শুক্রবার তুরস্কের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক আদালত কাউন্সিল অব স্টেট’র রায়ে বলা হয়েছে, ‘মসজিদ হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করে জাদুঘর হিসেবে ব্যবহারের যে সিদ্ধান্ত ১৯৩৪ সালে মন্ত্রিসভা নিয়েছিল তা আইনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।’ রায়ে বলা হয়, চুক্তি অনুযায়ী স্থাপনাটিকে মসজিদ হিসেবে বরাদ্দ দেওয়া হয় ফলে অন্যকিছু হিসেবে এর ব্যবহার আইনগতভাবে সম্ভব নয়।
এদিকে ইস্তাম্বুলের সেই বিখ্যাত গির্জা হাজিয়া সোফিয়াকে আবারো মসজিদে পরিণত করার ঘোষণায় নিন্দা জানিয়েছে রাশিয়াসহ কয়েকটি দেশ। দেশটির আদালতের এমন রায়ের কিছুক্ষণের মধ্যেই রাশিয়ার অর্থোডক্স চার্চ এর নিন্দা জানিয়েছে।
রাশিয়ার পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির উপ-প্রধান ভ্লাদিমির ঝাবারভ তুরস্কের এই সিধান্তকে ‘ভুল’ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তিনি বলেন, এটিকে মসজিদে পরিণত করায় এতে বিশ্ব মুসলিমদের কোনো লাভ হবে না। বরং এতে সংঘর্ষ বয়ে আনবে।
এছাড়াও এই সিদ্ধান্তকে গ্রিস সভ্য বিশ্বে তুরস্কের উসকানি হিসেবে উল্লেখ করেছে। এক বিবৃতিতে গ্রিসের সংস্কৃতিমন্ত্রী লিনা মেন্ডনি বলেন, এরদোয়ান যে জাতীয়তাবাদ দেখালো তা তার দেশকে ছয় শতাব্দী পিছনে নিয়ে গেল।
এছাড়া সাইপ্রাস তুরস্কের এই রায়ের কড়া নিন্দা জানিয়েছে। দেশটি আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার প্রতি তুরস্ককে শ্রদ্ধা জানাতে আহ্বান করে। সেইসঙ্গে ইউনেস্কো জানিয়েছে, তারা হাজিয়া সোফিয়ার মর্যাদা পর্যালোচনা করে দেখবে। এজন্য তারা তুরস্ককে একটি সংলাপে বসার আহ্বান জানান।
হাজিয়া সোপিয়ার ইতিহাস
হাজিয়া সোপিয়ার জটিল ইতিহাসের শুরু ৫৩৭ সালে। ওই সময়ে গোল্ডেন হর্ন উপত্যকা তদারকি করতে বাইজানটাইন সম্রাট জাস্টিনিয়ান বিশালাকৃতির এই গির্জাটি নির্মাণ করেন। বিশালাকারের গম্বুজসহ এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় চার্চ ও ভবন বলে মনে করা হয়।
১২০৪ সালে ক্রুসেডারদের অভিযানকালে সামান্য কিছু সময় বাদ দিলে কয়েক শতাব্দী ধরেই ভবনটি বাইজানটাইনদের নিয়ন্ত্রণে থেকেছে। তবে ১৪৫৩ সালে বাইজানটাইন সম্রাটদের পরাজিত করে অটোমান শাসক দ্বিতীয় সুলতান মাহমুদ ইস্তানবুল (পুরনো কন্সটান্টিপোল) শহর দখল করে নেন। আর বিজয়ী শাসক হাজিয়া সোপিয়ার অভ্যন্তরে জুমার নামাজ আদায় করেন।
তার কিছু দিনের মধ্যেই অটোমান শাসকেরা ভবনটিকে মসজিদে পরিণত করেন। তখন এতে বহিরাবরণসহ চারটি মিনার যুক্ত করা হয়। ভবনটির গায়ে থাকা খ্রিষ্ট ধর্মের নানা প্রতিকৃতি ও স্বর্ণের মোজাইক ঢেকে দিয়ে আরবি ক্যালিগ্রাফি বসানো হয়।
পরের কয়েক শতাব্দী ধরে মুসলিম অটোমান সাম্রাজ্যের প্রাণকেন্দ্রে থাকার পর ১৯৩৪ সালে মুস্তফা কামাল আতাতুর্কের সরকার এটিকে জাদুঘরে পরিণত করেন। বর্তমানে এটি ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য। ওই সময়ে কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে তুরস্ক বেশ কিছুটা ধর্মনিরপেক্ষ হওয়ার উদ্যোগ নেয়। আজকের দিনে তুরস্কের সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র হাজিয়া সোপিয়া। প্রতিবছর প্রায় ৩৭ লাখ পর্যটক বিশ্ব ঐতিহ্য কেন্দ্রটিতে ভ্রমণ করে থাকেন।
হাজিয়া সোপিয়াকে মসজিদে রুপান্তরের ঘোষণায় স্বাক্ষর করেন প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান। টুইটারে ওই ঘোষণার প্রকাশ করে তিনি লিখেছেন, ‘এতে লাভও হতে পারে।’ প্রেসিডেন্টের ঘোষণার পর হাজিয়া সোপিয়ায় প্রথমবারের মতো নামাজ আদায় করা হয়। তুরস্কের মূলধারার সবগুলো চ্যানেল ওই নামাজ সম্প্রচার করে।