fbpx

ইসলামে প্রতারণার শাস্তি

প্রকাশিত: ৯:০৯ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২০, ২০২১

ইসলামে প্রতারণার শাস্তি

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার জন্য। অসংখ্য সালাত ও সালাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর, তার পরিবার-পরিজন ও সাহাবীগণের উপর। ইসলামের শাস্তি আইন একটি বাস্তবসম্মত আইন। অপরাধ দমনে এই আইনের কোনো বিকল্প নেই। তবে ইসলামের শাস্তি আইন ইসলামী রাষ্ট্র ছাড়া অন্য কোথাও প্রয়োগ করার প্রচেষ্টা বড় ধরনের জুলুম। অর্থাৎ ইসলামী আইন প্রয়োগ করতে হবে ইসলামী রাষ্ট্রে, অন্য কোথাও নয়।
ধোঁকা ও প্রতারণা একটি জঘন্য বিষয়। ইসলামে কোনো ধোঁকা ও প্রতারণার স্থান নেই। কোনো মুসলমান ধোঁকা দিতে পারে না। ধোঁকা মুনাফেকদের বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ তাআলা প্রতারণার জন্য কঠিন শাস্তির কথা বলেছেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময় মুনাফেকরা মুখে বলতো আমরা আল্লাহকে, আল্লাহর নবীকে এবং এই কোরআনকে মানি কিন্তু তারা বাস্তবে তা মানতো না। যার ফলে মহান আল্লাহ তাআলা এই আয়াত নাজিল করেন : ‘এমন কিছু লোক আছে যারা বলে আমরা আল্লাহকে এবং শেষ দিবসের প্রতি বিশ্বাস করি। প্রকৃতপক্ষে তারা বিশ্বাস করেনি, তারা আল্লাহকে ও মুমিন বান্দাদেরকে ধোঁকা দিতে চায়। (সত্য কথা এই যে) তারা নিজেদের ছাড়া অন্য কাউকে ধোঁকা দেয় না। এবং তাদের এই বিষয়ে কোনো উপলব্ধি নেই।’—(সুরা বাকারা, আয়াত : ৮, ৯)
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে প্রতারণা ও প্রতারক, উভয়ের ব্যাপারে কঠোর নিন্দা জ্ঞাপন করেছেন এবং তাদের জন্য অবধারিত ধ্বংসের ঘোষণা দিয়েছেন। এ সংক্রান্ত স্পষ্ট বর্ণনা পাওয়া যায় পবিত্র কালামের এই আয়াতে : “ধ্বংস তাদের জন্য, যারা মাপে কম দেয়। যারা মানুষের থেকে মেপে নেয়ার কালে পূর্ণ মাত্রায় গ্রহণ করে। আর যখন তাদের জন্য মাপে বা ওজন করে, তখন কম দেয়।”
এ এক কঠিন ঘোষণা, যারা ঠগবাজি করে, মাপে ও ওজনে মানুষকে কম দেয় তাদের জন্য। সুতরাং যারা পুরোটাই চুরি করে, আত্মসাৎ করে, এবং মানুষকে তাদের প্রাপ্য বস্তুতে ঠকায়, তাদের কী কঠিন অবস্থা হবে তা সহজেই অনুমান করা যায়। মাপে ও ওজনে কমপ্রদানকারীর তুলনায় এরা আল্লাহ তাআলার শাস্তির অধিক ভাগিদার, এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই।
আল্লাহর নবী শুয়াইব আ. তার সম্প্রদায়কে মানুষকে তার প্রাপ্য বস্তুতে ঠকানো এবং মাপে ও ওজনে কম প্রদানে সতর্ক করেছেন, যেমন আল্লাহ তাআলা তার সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বর্ণনা করেছেন।
এমনিভাবে আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতারণা থেকে সতর্ক করেছেন এবং প্রতারকের ব্যাপারে কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। একবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাবারের এক স্তুপের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। তিনি খাবারের স্তুপে হাত প্রবেশ করালেন, তার আঙুলগুলো ভিজে গেল। তাই তিনি বললেন, ‘হে খাবারওয়ালা, এটা কি ? সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল, তাতে বৃষ্টির পানি পড়েছিল। তিনি বললেন, তুমি কি তা খাবারের উপরে রাখতে পারলে না, যাতে মানুষ তা দেখে ? যে প্রতারণা করে, সে আমার দলভুক্ত নয়।’ অন্য রেওয়ায়েতে আছে ‘যে আমাদের সাথে প্রতারণার আশ্রয় নেয়, সে আমাদের দলভুক্ত নয়’। অপর রেওয়ায়েতে আছে ‘সে আমাদের দলভুক্ত নয়, যে প্রতারণার আশ্রয় নেয়।’
সুতরাং রাসূলের উক্তি ‘আমাদের দলভুক্ত নয়’ প্রতারণার বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে যথেষ্ট। প্রতারণা, প্রতারণার নোংরা এলাকায় পা বাড়ানো, তার ভয়াবহ ঘেরাটোপে আটকে পড়া থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য এ উক্তিই আমাদেরকে সরল পথ দেখাবে।
অপর এক আয়াতে মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, তারা যদি তোমাকে ধোঁকা দিতে চায়, তবে আল্লাহই তোমার জন্য যথেষ্ট। তিনিই নিজ সাহায্যে মুমিনদের দ্বারা তোমাকে শক্তিশালী করেছেন।—(সুরা আনফাল, আয়াত : ৬২)
ওই আয়াতসমূহে মহান আল্লাহ তাআলা ধোঁকাবাজদের মুখোশ উন্মোচন করে দিয়েছেন। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় তারা মুখের কথার মাধ্যমে আল্লাহ ও মুমিন বান্দাকে ধোঁকা দিতে চায়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা নিজেরাই ধোঁকার শিকার হয়েছে। কেননা, এ ধোঁকার পরিণাম তাদের জন্য অশুভ হবে। তারা মনে করছে নিজেদেরকে মুসলিম পরিচয় দিয়ে তারা কুফরের পার্থিব পরিণতি থেকে রক্ষা পেয়েছে। অথচ আখেরাতে তাদের জন্য কঠিন আজাব অপেক্ষা করছে।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ধোঁকা ও প্রতারণাকারী সম্পর্কে কঠোর বাক্য উচ্চারণ করেছেন। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ধোঁকাবাজ ও প্রতারণাকারী জাহান্নামে যাবে।—(শুআবুল ঈমান বাইহাকী, হাদিস : ৬৯৭৮)
ইসলামী শাস্তি আইনের মূল উদ্দেশ্য কাউকে শাস্তি দেয়া নয়; বরং অপরাধ সংঘটনের সুযোগকে বাধাগ্রস্ত করা। এ কারণেই মানব রচিত আইনে যেখানে অপরাধ সংঘটনের পরেই কেবল শাস্তির ব্যবসস্থা রাখা হয়েছে, সে ক্ষেত্রে ইসলাম অপরাধ সংঘটনের আগেই এর সব উপায়-উপকরণ ও পনন্থা রোধ করে দেয়ার প্রতিই সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করেছে। এ রকম প্রতিবন্ধকতা ও নিরাপত্তামূলক ব্যবসস্থা গ্রহণের পরও কেউ অপরাধে লিপ্ত হয়ে পড়লে তখন ইসলাম তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়েছে।
ইসলাম শুধু অপরাধ ও শাস্তি বর্ণনা করেই ক্ষান্ত হয়নি; বরং প্রত্যেক অপরাধ ও শাস্তির সাথে আল্লাহভীতি ও পরকালের চেতনা উপস্থাপন করে মানুষের ধ্যানধারণাকে এমন এক জগতের দিকে ঘুরিয়ে দেয়, যার কল্পনা মানুষকে যাবতীয় অপরাধ ও গোনাহ থেকে পবিত্র করে দেয়। জনমনে আল্লাহতায়ালা ও পরকালের ভয় সৃষ্টি করা ছাড়া জগতের কোনো আইন, পুলিশ ও সেনাবাহিনীই অপরাধ দমনের নিশ্চয়তা দিতে পারে না।
যারাই আল্লাহ, নবী, মুমিন বান্দাদেরকে ধোঁকা দেবে তারাই কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হবে। তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত দিলের মধ্যে মজবুত ঈমান লালন করবে এবং ঈমানের কথাই প্রকাশ করবে আর সে অনুযায়ী আমল করবে। তাহলেই সে প্রকৃত মুমিন হতে পারবে। মুখে এক কথা আর অন্তরে আর এক কথা—এটা কোনো মুমিনের শান হতে পারে না। মুমিনের বৈশিষ্ট্যই হলো সে কখনও ধোঁকা দেবে না এবং ধোঁকার শিকার হবে না। যুগে যুগে ধোঁকাবাজ ছিল, এখনও আছে। তাই মহান আল্লাহ তাআলার কাছে এই কামনা করি, তিনি যেন আমাদেরকে ধোঁকা ও প্রতারণার কাজ থেকে হেফাজত করুন এবং প্রকৃত মুমিন হওয়ার তৌফিক দান করুন। আমিন।

Advertisements
Advertisements

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ