ক্যারিসমেটিক  বঙ্গবন্ধু

প্রকাশিত: ৩:৫২ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৮, ২০২১

ক্যারিসমেটিক  বঙ্গবন্ধু

মুহাম্মদ শামসুল ইসলাম

সমাজবিজ্ঞানী আলী আশরাফ ও এল এন শর্মা, তাঁদের Political Sociology: A grammar of new politics গ্রন্থে, সম্মোহনী/ক্যারিসমেটিক নেতৃত্বের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে,    “Charismatic authority  is inherent in outstanding individuals are rare leaders generally produced in time of crisis”. অসামান্য গুণাবলীর অধিকারী, আকর্ষণীয় মনোভঙ্গি, বীরোচিত, অনুকরণীয় চারিত্রিক দৃঢ়তা ও সততার বলে এ-প্রকার নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এ-ধরনের নেতৃত্ব সমর্থককুলের মননে এমন গভীর প্রত্যয়, শ্রদ্ধা ও আনুগত্যের জন্ম দেন যে, অনুসারিগণ মনে করেন, তাদের নেতা ভুল করতে পারেন না। তিনি একটি জনসমাজ বা গোষ্ঠীর একচ্ছত্র প্রতিক হিসেবে স্বীকৃতি পান। ইতিহাসে এরূপ নেতৃত্বের সংখ্যা খুব বেশি নেই। নেপোলিয়ন বোনাপার্ট, চেগোয়েভারা,মাও সে তুং, জর্জ ওয়াশিংটন, চার্চিল, আব্রাহাম লিংকন, মওলানা ভাসানী, মোহনদাস করচাঁদ গান্ধী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম সর্বাগ্রে  উচ্চারণযোগ্য। এসব নেতা জাতীয় সঙ্কটকালে মুক্তির দূত হিসেবে আবির্ভূত হন।

বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির ইতিহাসে এসেছিলেন এমন এক অনির্বাণ ব্যক্তিত্ব যাঁর অলোক সামান্য সম্মোহনী নেতৃত্বে সমগ্র বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষ একটি লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হয়েছিলো। বাঙালি জাতির ভাগ্যাকাশে যখন তমসাচ্ছন্ন ‘বিদিশার নিশা’ এ-জনপদের প্রতিটি প্রাণ যখন দিশাহীন পথের যাত্রী। পশ্চিম পাকিস্তানী ঔপনিবেশিক চক্রের ষঢ়যন্ত্র আর শোষণের যাতাকলে পিষ্ট হয়ে জাতির জীবন-জীবিকার ঝুলি যখন শূন্য, এমনি এক সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সুপরিকল্পিত উপায়ে, নিয়মতান্ত্রিকতা বজায় রেখে, একজন সুদক্ষ কুশলী খেলোয়াড়ের মতো গেম থিওরি এপ্লাই করে, একের পর এক রাজনৈতিক কর্মসূচী প্রদান করে ধীর পায়ে এগিয়ে যান স্বায়ত্বশাসন থেকে স্বাধীনতার পথে। এই বাংলার রাজনৈতিক মল্লভূমে  (Political arena) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের আবির্ভাব এক অভিনব ও যুগান্তকারী ঘটনা তাঁর গণমনোহারি ক্যারিশমা এতটাই প্রবল প্রভাবক ছিল যে, তিনি পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ থেকে জনতাকে বাঙালি জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। যে পাকিস্তান এদেশেরই মুসলিম নেতা-জনতা, ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনায় প্রতিষ্ঠা করেছিলো। সেই পাকিস্তাানের ভিত চুরমার করে দিয়েছিলেন ‘জয়বাংলা’ শ্লোগানের মাধ্যমে। আজ বঙ্গবন্ধুর মূল্যায়ন যে যেভাবেই করুন না কেন, আমাদের যে শ্রেষ্ঠ অর্জন ‘স্বাধীনতা’ তা এদেশের জনতাকে সঙ্গে নিয়ে তাঁরই শ্রান্তিহীন সংগ্রামের ফসল। আর এ অর্জন সম্ভব হয়েছিলো তাঁর যুগোপযোগী সম্মোহনী/ক্যারিসমেটিক নেতৃত্বের বল।বঙ্গবন্ধুর সম্মোহনী নেতৃত্বের সমর্থন পাওয়া যায় রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক রওনক জাহানের, Bangladesh Politics: Problems and issues গ্রন্থে। তিনি বলেন,  “By all accounts Sheikh Mujibur Rahman was a charismatic figure in 1970“

পাকিস্তান মুসলিমলীগের তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। ১৯৪৯  সালে যখন আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন তিনি ছিলেন এর প্রথম যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক। তাঁর বয়স ছিল।১৯৫৬ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক সরকারের শিল্প, বাণিজ্য ও দুর্নীতি দপ্তরের মন্ত্রী হন। তিনি আওয়ামী লীগ থেকে ১৯৫৫ সালে পাকিস্তানের দ্বিতীয় গণপরিষদের  সদস্য নির্বচিত হন। ১৯৬৩ সালে গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর পরলোকগমনের পর আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব শূন্যতায় ভুগতে থাকে। এমতাবস্থায়, বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগকে পুনঃর্গঠিত ও উজ্জীবিত করার প্রয়াস চালান এবং কার্যত  দলের নেতৃত্ব নিজের হাতে গ্রহণ করেন। আওয়ামী লীগে তাঁর নেতৃত্ব সুসংহত করে তিনি ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলন শুরু  করেন, যা আওয়ামী লীগকে নিয়ে আসে পাদপ্রদীপের আলোয় আর তিনি নিজে পরিণত হন ছয় দফার একজন জনপ্রিয় প্রবক্তায়  এবং ছয়দফা ছিল বঙ্গবন্ধুর সম্মোহনী নেতৃত্বে পরিণত হওয়ার টার্নিং পয়েন্ট। ছয়দফা আন্দোলন স্তব্ধ করার জন্যে, তাঁর অনুপম  রাজনৈতিক ক্যারিয়ার বিনাস করার জন্যে, সামরিক জান্তা আয়ূব সরকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর বিরুদ্ধে আগরতলা  ষঢ়যন্ত্র মামলা দায়ের করে তাঁকে করারুদ্ধ করে রাখে। ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত তিনি কারাগারে ছিলেন এতে তাঁর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়ে একেবারে তুঙ্গে উঠে। ১৯৬৯ সালে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় আয়ূব সরকার। তখন রমনা রেসকোর্সে ছাত্র-সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে এক বিশাল গণ-সংবর্ধনার আয়োজন করা হয় এবং তাকে পূর্ব বাংলার জনগণের পক্ষ থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেয়া হয়।

সত্তরের নির্বাচনে ১৬৯ টি আসনের মধ্যে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর দল ১৬৭টি আসন অধিকার করে যে ভূমিধ্বস বিজয় অর্জন করেনতাতে তাঁর নেতৃত্ব প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় এবং তিনি গণ্য হন পূর্ব বাংলার একচ্ছত্র, অপ্রতিরোধ্য ও অসমান্তরাল নেতা হিসেবে। ১৯৭১ সালের ৭মার্চের ভাষণ তাঁর জীবনের আরেক অন্যন্য কৃতি। এ-ভাষণের মধ্যদিয়ে তিনি হয়ে উঠেন বাঙালি জাতির এক মহানায়ক- হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি ।শেখ মুজিব ছিলেন সেই ব্যক্তি জীবনব্যাপী যিনি এই জাতির স্বার্থে তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের চেষ্টা চালিয়ে ছিলেন। বিরাজ করেছিলেন এ-জাতির আশা আকাঙ্খার মূর্ত প্রতীক হিসেবে। তিনি ছিলেন সেই বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতীক যা এক সর্বব্যাপী আন্দোলনের রূপ পরিগ্রহ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের সোপান রচনা করে দিয়েছিলো। স্বাধীন  সার্বভৌম বাংলাদেশ শেখ মুজিবের কীর্তি হিসেবে চিরদিন ইতিহাসের পাতায় অমলিন হয়ে থাকবে।

তথ‍্যসুত্র:

দেশ দেশান্তর–ফারুক চৌধুরী

Bangladesh Awamiledge ( অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ)

জাদুকরি নেতূত্বে শেখ মুজিব-অজয় দাস গুপ্ত।

লেখক, প্রভাষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, গোয়াইনঘাট সরকারি কলেজ, সিলেট

faster