বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চ ভাষণের সফল পরিণতি বাংলাদেশ

প্রকাশিত: ৩:০৯ অপরাহ্ণ, মার্চ ৬, ২০২১

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চ ভাষণের সফল পরিণতি বাংলাদেশ


মুহাম্মদ শামসুল ইসলাম:

১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী জন প্রতিনিধিদের নিকট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় পুরো পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গণে চরম অস্থিরতার সৃষ্টি হয়। দেশ যখন এক ভয়াবহ রাজনৈতিক সংকটের মধ‍্যে দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছিল, উদ্বেগ, উত্তেজনায় সমগ্র পূর্ব পাকিস্থান যখন উৎকন্ঠিত, ঠিক সে সময় আওয়ামী লীগের পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বিকাল ৩টায় ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ( বর্তমান সোহরাওয়ার্দী ময়দান) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উপস্থিত দশ লক্ষাধিক জনতার সম্মুখে ১৮ মিনিটের এক ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ প্রদান করেন- যা বিশ্ব ইতিহাসে ৭ ই মার্চের ভাষণ নামে বিখ‍্যাত হয়ে আছে।
একটি ভাষণের মাধ্যমে তিনি একটি নিরস্ত্র জাতিকে সশস্ত্র বাঙালি জাতিতে রূপান্তর করেছিলেন। ঐতিহাসিক ভাষণের মাধ্যমে স্বাধীনতার বীজ তিনি বপন করেছিলেন। “এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম। ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকো”- এই বক্তব্যের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু একটা গেরিলা মুক্তিযুদ্ধের দিক নির্দেশনা দিয়েছিলেন। লাঠি, ফেস্টুন হাতে লাখ লাখ মানুষ উত্তপ্ত স্লোগানে মুখরিত থাকলেও শেখ মুজিবের ভাষণের সময় সেখানে ছিল পিনপতন নিরবতা। ভাষণ শেষে আবার স্বাধীনতার পক্ষে স্লোগান মুখর হয়ে উঠেছিল ঢাকার রাস্তাগুলো।
কবি নির্মলেন্দু গুণ বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণকে দেখেছেন অমর কবিতা হিসেবে৷ আর বঙ্গবন্ধুকে অভিহিত করেছেন কবি হিসেবে৷ তিনি তাঁর “স্বাধীনতা এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো”’ কবিতার শেষাংশে লিখেছেন, “শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে,/রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্তপায়ে হেঁটে/ অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন/ তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল, হৃদয়ে লাগিল দোলা/জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার সকল দুয়ার খোলা/কে রোধে তাঁহার বজ্রকণ্ঠ বাণী?/গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর-কবিতাখানি/এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম/ এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’৷”
পশ্চিমা বিশ্ব তাঁকে বলেছে “পোয়েট অফ পলিটিক্স”। তাঁর ভাষণ শুনে নিউজ উইক তাঁকে পোয়েট অব পলিটিক্স বলেছে, কারণ, তাঁর ভাষণে শব্দায়ন মানুষকে সম্মোহিত করতো, এবং ধরে রাখতো।
বিশ্বের অনেক রাজনৈতিক নেতার আলোচিত ভাষণ রয়েছে। তবে কোনও নেতার ভাষণ এমন সংগ্রাম মুখর ১০ লক্ষাধিক মুক্তিকামী নিরস্ত্র মানুষের সামনে হয়নি। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ এই ভাষণটির মাধ্যমে তিনি নিরস্ত্র বাঙালি জাতিকে সশস্ত্র জাতিতে রূপান্তর করেন এবং মুক্তিযুদ্ধের দিকনির্দেশনা দেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ এখন আন্তর্জাতিক সম্পদ। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর এই ভাষণকে বিশ্বপ্রামাণ্যের ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
৭ই মার্চের ভাষণ বর্তমান প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখায়- অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে কিভাবে প্রতিবাদী হতে হয়, কীভাবে মাথানত না করে অবিচল থাকতে হয়, কিভাবে এগিয়ে যেতে হয়। ভাষণটি যতবার শোনা হয়, ততবারই নতুন ভাবনা তৈরি হয়। এর প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য একেকটি স্বতন্ত্র অর্থ বহন করে, নতুন বার্তা দেয়। ১৮ মিনিটের একটি ভাষণ একটি দেশের স্বাধীনতা অর্জন ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, তার জ্বলন্ত প্রমাণ এই কালজয়ী ভাষণ।
বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চর ভাষণ পশ্চিম পাকিস্তানের নিকট “রেড সিগন‍্যাল“ হলেও পূর্ব পাকিস্তানের কাছে ছিল “গ্রীন সিগন‍্যাল“। তারঁ এ বজ্রকন্ঠের ভাষণ বাঙালি জাতিকে অনপ্রাণিত করে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়তে। পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে এ ভাষণ প্রতিদিন বাজিয়ে শুনানো হতো বাঙালির মনোবলকে অটুট রাখার জন‍্য। সার্বিক বিচারে বলা যায় ৭ই মার্চর ভাষণ বাঙালি জাতির স্বাধীনতা আন্দোলনে মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।
লেখক,প্রভাষক,রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,গোয়াইঘাট সরকারি কলেজ,সিলেট।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

faster