বস্তুত মানুষের মৃত্যু জীবনের চেয়েও বেশি সত্য!

প্রকাশিত: ১১:২৬ অপরাহ্ণ, মার্চ ৮, ২০২১

বস্তুত মানুষের মৃত্যু জীবনের চেয়েও বেশি সত্য!

এখন পর্যন্ত যতগুলো ডেথ ডিক্লেয়ার করতে হয়েছে আইসিইউতে তার বেশিরভাগই বয়স্ক মানুষ। তবে যে কয়েকজন মানুষকে চলে যেতে দেখেছি যৌবনে তাদের চেহারা কেন জানি চোখে ভাসে এখনো, তাদের আর্তনাদ এখনো কানে বেজে উঠে।

৩৭ বছর বয়সী মহিলা প্রায় ১ মাস আইসিইউতে থাকার পর মারা গেলেন। মৃত্যুর মাত্র দুই ঘন্টা আগেও যখন তার সামনে যাই, শুধু বারবার বলছিলেন…”আমার কষ্ট অর, খুব কষ্ট অর, আমারে বাচাও”!

৩২ বছরের তরতাজা যুবক, ঔষধ কোম্পানিতে চাকরির সুবাদে থাকতেন সিলেটে। খুব বেশিদিন হয়নি বিয়ে করেছেন, ১ বছর বয়সের একটা বাচ্চা আছে, ১ মাসেরও বেশিদিন থাকলেন আইসিইউতে। কিন্তু শেষমেশ তাকেও চলে যেতে হলো। তার এক সহকর্মী সার্বক্ষণিক সাথে ছিলেন। ভেবেছিলাম ভাই হয়তো, নইলে এই আইসিইউতে কে এইভাবে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অন্যের জন্য পড়ে থাকবে। যখন আর কোনো আশা অবশিষ্ট নেই, তিনি আমার সামনে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাদলেন।আমি তখন জানলাম তিনি রোগীর ভাই নন সহকর্মী। রোগীর বাচ্চাকে একবার নিয়ে আসতে পারবেন কিনা আইসিইউতে জানতে চাইলেন।
কি উত্তর দিবো বুঝতে পারছিলাম না!

মহিলার বয়স মাত্র ২৫, বাচ্চা জন্ম দেয়ার ১০ দিনের মাথায় অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। সুনামগঞ্জের কোনো দূর্গম এলাকার বাসিন্দা। কয়েক হাসপাতাল ঘুরে কোভিড সন্দেহে এই আইসিইউতে ভর্তি হয়েছিলেন। ৩ দিনের মাথায় মারা গেলেন। এক নবজাতক শিশুকে রেখে ছেড়ে দিতে হলো পৃথিবীর মায়া।

এখনও এইরকম দুইজন ভর্তি আছেন। একজন পুরুষ আরেকজন মহিলা। বয়স যথাক্রমে ২২ এবং ২৪।
এদের কষ্ট, মৃত্যুর ভয়, আর একটু শান্তিতে শ্বাস নেয়ার আকুতি যদি আপনি আমি সামনে থেকে দেখি তাহলে হয়তো বুঝবো, যে আল্লাহ তায়ালার কি নিয়ামতের মধ্যে আমার ডুবে আছি।

যে ঘটনাগুলো বললাম, সেগুলো একটি কোভিড আইসিইউর ঘটনা। জীবন মৃত্যুর মাঝখানে থাকা মানুষগুলোর চিকিৎসার জন্য যেখানে আমাদের যেতে হয়। এক গভীর চিন্তাবোধ যেখানে আমাদের গতানুগতিক জীবনবোধকে সজোরে নাড়া দিতে পারে, যদি আমরা একটু চিন্তাশীল হই!

কিছুদিন আগে এক পরিচিত জন বলছিলেন,
“আগে যাও ছিল, করোনা ফরোনা এখন আর নাই”।

ইচ্ছে হচ্ছিল বলি, মৃত্যু বলতে আসলে কিছুই নাই, সব গুজব, কই আশেপাশে তো ইদানীং কাউকে মরতে দেখিনি(!!)

আমরা মৃত্যুকে ভুলে থাকতে চাই। অথচ মৃত্যু আমাদের জীবনের চেয়েও বেশি সত্য। আমাদের সংসার, সন্তান, অর্থকড়ি, ক্যারিয়ার, সম্মান, আমাদের এই জীবন, এই স্বপ্ন, বাস্তবতা…. সবকিছু….সবকিছুই কোনো না কোনভাবে অনিশ্চয়তায় পরিপূর্ণ। শুধুমাত্র আমাদের মৃত্যু নিশ্চিত, শতভাগ নিশ্চিত। এখানে কোনো সন্দেহ নেই, সংশয় নেই, নেই কোনো অনিশ্চয়তা।

সুতরাং আমার যারা মৃত্যুর পর আবার জেগে উঠার ব্যাপারে নিশ্চিত, পরম করুনাময়ের সামনে দাঁড়িয়ে হিসাব দেয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত….

আমাদের উচিত চিন্তা করা, যে আমরা কি করছি আর আমাদের কি করার কথা। নিজেদের সংশোধন করার একমাত্র স্থান এই পৃথিবী।

আর যারা অনিশ্চিত কিংবা সন্দিহান….
তাদের উচিত চিন্তাভাবনা করা।
চিন্তাভাবনা মানুষের বিশেষত্ব, পশুপাখির নয়!

এই মানবজীবন হাসি-তামাশার জন্য হতে পারেনা।
কখনোই না….!

ডাঃ জুবায়ের সিদ্দিকী

faster