বিসর্জিত নৈতিকতায় অবক্ষয়ে সমাজ!

প্রকাশিত: ২:৩৬ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ১৪, ২০২১

বিসর্জিত নৈতিকতায় অবক্ষয়ে সমাজ!


মুহাম্মদ শামসুল ইসলাম

আমরা ক্রমেই এক নিষ্ঠুর সময়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি যেখানে মানবিকতা, নৈতিকতা, মূল্যবোধ, দয়া, মমতা এসব শব্দের কোনো অস্তিত্বই নেই! তার জায়গা দখল করে নিয়েছে অনৈতিকতা, অমানবিকতা, নিষ্ঠুরতা, স্বার্থপরতা, জিঘাংসা, হিংসা, বিদ্বেষ কিংবা এ জাতীয় সব নেতিবাচক শব্দের কালো হাত। প্রতিদিনের খবরের কাগজে এমন অনেক খবর আসে, যা দেখলে যে কোনো সভ্য মানুষের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ শুরু হয়।
বর্তমান সময়ে সামাজিক অপরাধগুলোর মাত্রা অতিক্রম করতে চলেছে। এ অবস্থায় এখনই লাগাম টেনে ধরা না গেলে আগামী ৫ বছরে ভয়াবহ রূপ নেবে সামাজিক অপরাধ। দেশে ভয়াবহ ব্যাধির মতো দানা বাঁধছে সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়। আর নীতিনির্ধারক মহলের অবহেলা আর নজরদারির অভাবে সামাজিক অবক্ষয়ের শিকার ব্যক্তিদের প্রাণহানির ঘটনা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। অর্থের প্রতি অতি লালসা এবং শ্রেণি, পেশা নির্বিশেষ সব মানুষের অসম প্রতিযোগিতা, নৈতিক মূল্যবোধের অভাব, সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক অস্থিরতা, অন্য দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা, দাম্পত্য কলহ ও স্বামী-স্ত্রীর প্রতি বিশ্বাসহীনতা, সামাজিক উন্নয়নে পদক্ষেপ না নেয়া, বিষণ্ণতা ও মাদকাসক্তি, অভিভাবকদের উদাসীনতা ইত্যাদি সামাজিক অপরাধের পেছনে দায়ী। “দেশে বর্তমানে ৮০ থেকে ৮৫ লাখ মানুষ অতিমাত্রায় বিষণ্ণতায় আক্রান্ত। বিষণ্ণতা থেকে যদি তাদের ফিরিয়ে আনা না যায় তবে সামাজিক অপরাধের মাত্রা আরো বেড়ে যাবে।“ (তথ্য দৈনিক প্রথম আলো)।

বর্তমান সময়ে আমাদের পরিবারগুলোতে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার চর্চা কতটা হয়? দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন সম্পর্ক সূত্রে ও কর্মকাণ্ডে নৈতিক মূল্যবোধ কতটা রক্ষিত হয়? এছাড়া পরিবারের সদস্যরা পরস্পরের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে কতটা সতর্ক? পরিবার তো শুধু খাওয়া ও শোয়ার জায়গা নয়, এর চেয়ে আরো বেশি কিছু। এ বিষয়ে সচেতনতার অভাবে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বাড়তে থাকে অভিযোগের মাত্রা। এখান থেকেই উৎপত্তি হয় ক্ষোভ, বিষণ্ণতা, বিশ্বাসহীনতা। পরিবারের সদস্যরাই সমাজে ছড়িয়ে পড়ে এবং সেখানে তাদের মানসিকতা ও কর্মকাণ্ডের প্রতিফলন ঘটে। চারদিকে যে সামাজিক অবক্ষয় ও তারুণ্যের অবক্ষয় চলছে তার কি কোনো প্রতিষেধক নেই? আমরা কি সমাজকে কখনোই কলুষিত মুক্ত করতে পারব না? পারব। তবে তার জন্য যারা সমাজকে কলুষিত করছে, সমাজের মানুষের নিরাপত্তা ও অধিকার ক্ষুণ্ণ করছে তাদের বিরুদ্ধে আমাদের রুখে দাঁড়াতে হবে। যে করেই হোক সামাজিক সুস্থতা ফিরে আনতে হবে।
মূলত এই সর্বগ্রাসী সামাজিক অবক্ষয়ের হাত থেকে বাঁচতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি। সেই সঙ্গে ধর্মীয় অনুশাসনের অনুশীলন, পরমত সহিষ্ণুতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত করাসহ সর্বক্ষেত্রে অশ্লীলতাকে শুধু বর্জনই নয়, প্রতিরোধ করা আজ আমাদের সবার দায়িত্ব হয়ে পড়েছে। যার শুরুটা হতে হবে গৃহাভ্যন্তর থেকেই। এটা সবারই মনে রাখা উচিত যে, সামাজিক সমস্যা দূর করতে রাষ্ট্রের সহযোগিতার হয়তো প্রয়োজন রয়েছে; কিন্তু মূল দায়িত্বটি কিন্তু পরিবার তথা সমাজকেই নিতে হবে। দিহান ও অনুশকার মধ‍্যেকার সংঘটিত ঘটনায় রাষ্ট্রের কি করণীয় ছিল? দ্বায় কার রাষ্ট্রের না অভিভাবকদের?
সর্বোপরি নৈতিক শিক্ষা গ্রহণ করে একজন আদর্শবান নাগরিক ও সত্যিকারের দেশপ্রেমিক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে পারলেই এই মরণব্যাধি অবক্ষয় থেকে জাতি, সমাজ এবং দেশকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।
লেখক, প্রভাষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, গোয়াইনঘাট সরকারি কলেজ।