ভাষা আন্দোলনে চমকপ্রদ উদ্ভব প্রিয় স্বদেশ

প্রকাশিত: ৩:২২ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২১

ভাষা আন্দোলনে চমকপ্রদ উদ্ভব প্রিয় স্বদেশ


মুহাম্মদ শামসুল ইসলাম:
বিশ শতকের মাঝামাঝি অদ্ভুত রাষ্ট্র পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছিল প্রধানত ধর্মীয় উম্মাদনা মাধ্যমে। সাতচল্লিশ থেকে একাত্তর পর্যন্ত বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্ত ছিল অদ্ভুত রাষ্ট্র পাকিস্তানের। বাঙালিকে, বাংলাকে বিনষ্ট করাই ছিল পাকিস্তানি শাসকদের উদ্দেশ্য। পাকিস্তান ছিলো একটি মধ্যযুগীয় প্রগতিবিরোধী দেশ। ১৯৫২-এর ৮ ফাল্গুনে, ২১-এ ফেব্রুয়ারিতে, বৃহস্পতিবার,তাদের প্রগতিবিরোধী ভাষা আন্দোলনে পূর্ব বাংলায় ঢাকার রাজপথে ঝরে পড়ে ছাত্রদের রক্ত। তাদের অপরাধ তারা বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চেয়েছিল। রক্তে লাল হয়ে ওঠে বাংলাদেশ। সেদিনই বোঝা যায় পৃথিবীতে একটি নতুন স্বাধীন দেশের জন্ম আসন্ন। উনিশ বছর পরই জন্ম নেয় সে-দেশটি।ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ সৃষ্টি করে স্বধীন সার্বোভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটায়। বাঙালি জাতীয়তাবাদ হল একটি রাজনৈতিক অভিব্যক্তি যার মাধ্যমে প্রাচীন কাল থেকে দক্ষিণ এশিয়াতে বসবাসরত বাঙালি জাতি, তথা বাংলা ভাষাগত অঞ্চলের অধিবাসীদের বুঝানো হয়ে থাকে। বাঙালি জাতি উপমহাদেশের একটি অন্যতম জাতীয়তাবাদী চেতনায় প্রভাবিত এক প্রভাবশালী জাতি।
পাকিস্তানের প্রগতিবিরোধী কর্ম বাঙালি জাতীকে মুসলিম লীগের মুসলিম জাতীয়তাবাদ ও দ্বি-জাতি তত্ত্বভিত্তিক জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে সন্দিহান করে তোলে। তাই অধিকার প্রতিষ্টায় তারাঁ মুসলিম জাতীয়তাবাদ ও দ্বি- জাতি তত্ত্বভিত্তিক জাতীয়তাবাদ এর বদলে ভাষা আন্দোলন মাধ্যমে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ করে। এই জাতীয়তাবাদ পাকিস্তানের জন্মলগ্ম থেকেই রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষ করে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের পূর্ব বংলা ও পশ্বিম পাকিস্তান ভিত্তিক উপদল ও তাদের মধ‍্যকার ভাষা ও আঞ্চলিক রাজনীতি, স্বাধিকারের প্রশ্নে অব‍্যাহত মতানৈক্য এবং দ্বন্ধ দেশটিতে নতুন নতুন রাজনৈতিক দলের সৃষ্টি করে। কিন্তু পূর্ব বাংলায় ভাষা আন্দোলনে সৃষ্ট জাতীয়তাবাদ রাজনৈতিক দলগুলো মধ‍্যে ঐক্যবদ্ধ হতে বাধ‍্য করে এবং ১৯৫৫ প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের মাধ‍্যমে অংশগ্রহণ করে মোট ৩০৯ আসনের মধ‍্যে ২২৩ আসন লাভ করে নিরষ্কুশ সংখ‍্যা গরিষ্টতা অর্জন করে।
১৯৬৫ সালে ভারত- পাকিস্তান যুদ্ধের তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও পূর্ব পাকিস্তানের অরক্ষিত ব‍্যবস্থার প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্ত্বিতেই ছয় দফা দাবি যুক্তিযুক্ত করে তোলেন। পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দলগুলার কঠোর সমালোচনা সত্ত্বেও পূর্ব- পাকিস্তানে ছয় দফা আন্দোলন আকাশচুম্ভি জনপ্রিয়তা অর্জন করতে থাকে। সামরিক সরকার ভীত-স্বতন্ত্রীত হয়ে অ্নেক নেতা কর্মীকে গ্রেফতার করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তিন মাসে আটবার গ্রেফতার হন,আবশেষে আগড়তলা ষড়যন্ত্র মামলা করে 8মে তাকেঁ গ্রেফতার করে দীর্ঘ সময়ের জন‍্য কারা অভ‍্যন্তরে রাখা হয় । বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হলেও পূর্ব- পাকিস্তানে ছয় দফা আন্দোলন আরও জোরালো হয়ে ওঠে। মামলা চলাকালীন আবস্থায় ১৯৬৯সালের ২০ জানুয়ারি আসাদুজ্জামান নামে এক ছাত্রকে হত‍্যা, ১৫ফ্রেরুয়ারি জেলে সার্জেন্ট জহুরুল হককে এবং ১৮ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ‍্যাপক ড.শামসুজ্জোহাকে হত‍্যার প্রতিবাদে পূর্ব পাকিস্তান ব‍্যাপক গণআন্দোলন দেখা দেয়। যা পরবর্তীতে ঐতিহাসিক গণঅভ‍্যুত্থানে রূপ নেয়।
গণঅভ‍্যুত্থানে জনগণের স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ এবং আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন চুড়ান্ত পর্যায়ে যখন উপনীত হয়,বাঙালিকে দামিয়ে রাখা দুরুহ হয়ে পড়, তখন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ১৯৬৯ সালে ২১শে ফেব্রুয়ারি এক বেতার ভাষণে আগরতলা মামলা প্রত‍্যাহার ও রাজবন্দিদের মুক্তি দেয়া সহ মৌলিক গণতন্ত্রের ভোটাধিকারের পরির্বতে সার্বজনীন ভোটাধিকার ও জাতীয় পরিষদের সাধারণ নির্বাচন দেওয়ার অডিন‍্যান্স জারি করে। ৫২সালের সৃষ্ট জাতীয়তাবাদ দিয়ে বাঙালি জাতি ৫৪এর নির্বাচনে বিজয়, ৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলনের মাধ‍্যমে ৬৯এ আইয়ুব বিরোধী গণঅভ‍্যুত্থান সৃষ্টির মাধ‍্যমে বাঙালির মধ‍্যে জাতীয় চেতনা ও ঐক্যে গড়ে তোলে,তাই সে চেতনা বা জাতীয়তাবাদকে কাজে লাগিয়ে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলোকে পর্যুদস্ত করে এবং আওয়ামীলীগ নিরস্কুশ সংখ‍্যাগরিষ্টতা অর্জন করে। নির্বাচনে আওয়ামীলীগ সংরক্ষিত মহিলা অসনসহ মোট ৩১৩ টি আসনের মধ‍্যে ১৬৭ টি আসন লাভ করে একক সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জন করে।কিন্তু ইয়াহিয়া-ভুট্রো গোপন ষড়যন্ত্র করে ক্ষমতা হস্থান্তর না করার নীল নকশা প্রণায়ন করে। যার দরুণ পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ‍্যেকার সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে এবং মুক্তিযুদ্ধের ম্যধ‍্যমে ক্রমাবনতির চুড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে । একটি শক্ত জমিতে দাঁড়িয়ে ১৯৭১ সালে বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় হয়েছিল। জাতি হিসেবে বাঙালির যে সংগ্রামী চেতনা গড়ে উঠেছে তার মূলে রয়েছে ভৌগোলিক ভাঙ্গাগড়া ও অবস্থানের অবদান। অবদান রয়েছে এদেশের জলবায়ু, আবহাওয়া, মুখের ভাষা এবং বাংলা অঞ্চলের মানুষের রোমাঞ্চকর ইতিহাসের। সে ইতিহাস বাঙালি জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাস, নানা ঘাত প্রতিঘাতের ইতিহাস।ভাষা আন্দোলনে সৃষ্ট জাতীয়তাবাদের মাধ্যমে বিশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জাতীয়তাবাদী নেতা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এবং তার মহান আদর্শে ১৯৭১ সালে সে সংগ্রামী ইতিহাস রূপান্তরিত হয় স্বাধীনতার জীবনপন যুদ্ধে।
লেখক, প্রভাষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, গোয়াইনঘাট সরকারি কলেজ, সিলেট।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

faster