সিলেটিরা শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে পারে না!


মুহাম্মদ শামসুল ইসলাম:

সিলেটিরা শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে পারে না!
মুহাম্মদ শামসুল ইসলাম

ঐতিহাসিকভাবে শ্রীহট্ট নামে পরিচিত সিলেট অঞ্চল বর্তমান বাংলাদেশের পূর্ব দিকে অবস্থিত একটি ঐতিহ্যবাহী বিভাগ । মূলত সিলেট অঞ্চল প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান বাংলাদেশের সিলেট বিভাগসহ ভারতের আসামের করিমগঞ্জ,কাছাড়,এবং হাইলাকান্দি জেলা
জুড়ে বিস্তৃত ছিল। প্রাচীন সময় থেকে সিলেট অঞ্চল ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চল বা জেলা থেকে পৃথক ছিল, যার দরুন সিলেট অঞ্চলে আলাদা সংস্কৃতি গড়ে ওঠে যা বর্তমান বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে কিছু অসঙ্গতিপূর্ণ। পৃথক সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য থাকলেও পলিটিক্যাল বউন্ডারি সিলেট অঞ্চলকে প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশের সাথে সম্পৃক্ত করেছে। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির অন্যান্য জেলার লোকজন প্রায়ই বলে থাকে সিলেটের লোকজন শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে পারে না, কিংবা সিলেটের লোকজন অন্যান্য জেলার লোকজনের সাথে মিশে না বা সহজে মিশতে পারে না বা সম্পর্ক গড়ে না (বিয়ে,সাধী ইত্যাদিকে নির্দেশ করে)। প্রভৃতি অপবাদ/অভিযোগ (যা তাঁদের কাছে আমাদের দূর্বলতা) আমাকেও বহুবার শুনতে হয়েছে। এই অপবাদ/অভিযোগ পুরোপরি মিথ্যা না হলেও আনেকাংশে সত্য।
আমি বলবো এই অপবাদ বা অভিযোগ আমাদের কিঞ্চিৎ পরিমান দূর্বলতা নয়, বরং এই অপবাদ হলো সিলেটিদের হাজার বছরের পৃথক ভৌগোলিক অবস্থান, স্বতন্ত্র রাজনৈ্তিক ও সামাজিক সংস্কৃতি এবং নিজস্ব ভাষা বা কথ্য ভাষাগত ভিন্নতা প্রভৃতিকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
সিলেট অঞ্চলের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় , সহস্রাধিক বছর পূর্বে
পলিটিক্যাল বাউন্ডারি দ্বারা বর্তমান বাংলাদেশের অন্যান্য ভূমি থেকে রাজনৈ্তিক ,সামাজিক ও অন্যান্য দিক থেকে সিলেট অঞ্চল বাংলা থেকে পৃথক ছিল,এমন কি সিলেটিদের কথ্য ভাষা(নাগরি) ছিল ভিন্ন ।
কেন সিলেটিরা শুদ্ধ ভাষায় বা প্রমিত বাংলায় কথা বলতে পারর্দশি নয়? কেন সিলেট অঞ্চল রাষ্ট্রের অন্যান্য অঞ্চল থেকে নিজস্ব স্বকীয়তা বহন করে? সিলেট অঞ্চলের ইতিহাস ও ভাষার পর্যালোচনা করলে সহজে অনুমেয় যোগ্য।
• প্রাচীন/সুলতানি যুগঃ
ঐতিহাসিক সৈয়দ মুর্তাজা আলী’র মতে পঞ্চম হতে ষষ্ঠ শতাব্দীর মধ্যে নাক লম্বা, মাথা মোটা, গৌর বর্ণের আর্যরা সিলেট অঞ্চলে এসেছে। আর্যরা আসার পূর্বে অস্ট্রিক ও মঙ্গোলীয় নরগোষ্টি ছিল এ অঞ্চলের আদিম আধিবাসী। প্রাচীন বাংলায় সিলেট অঞ্চল গৌড় রাজ্যের অর্ন্তভূক্ত ছিল। গৌড় রাজ্য সিলেট শহরের প্রাণ কেন্দ্রে ইহার অবস্থান ছিল। ঐতিহাসিক অচ্যুতচরণ চৌধুরীর মতে প্রাচীন লাউড় রাজ্য কামরুপ হতে পৃথক (৭৫০ খ্রিঃ) হওয়ার পর প্রায় দশম শতকে লাউড় রাজ্য, জৈন্তিয়া ও গৌড় রাজ্যে বিভক্ত হয়ে স্বাধীন ভাবে শাসিত হয়। উক্ত রাজবংশের উত্তরসূরি রাজা গোড়ক অত্রাঞ্চলের অধীকার প্রাপ্ত হয়ে তার নামানুসারে রাজ্যের নাম রাখেন গৌড় রাজ্য। ইহার অবস্থান সিলেট শহর ও শহরের উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণে বহু দুর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এক সময় ইটা রাজ্য (ইটা রাজ্য সিলেটের প্রাচীন ইতিহাসের এক অংশ। বর্তমান সিলেট জেলাধীন বিয়ানীবাজার থানার অর্ন্তগত ঐতিহাসিক গ্রাম নিদনপুর হতে ‘ভাস্করবর্মনের তাম্রলিপি’ পাওয়ার কারণে এই গ্রাম শ্রীহট্টের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে), তরফ রাজ্য ( তরফ রাজ্য সিলেট বিভাগের বর্তমান হবিগঞ্জ সদর, মাধবপুর, লাখাই, বাহুবল, চুনারুঘাট, শ্রীমঙ্গল, নবীগঞ্জ এবং বাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল, ও নেত্রকোণা জেলার জোয়ানশাহী পরগনা নিয়ে তরফ রাজ্য বিস্তৃত ছিল), প্রতাফগড় রাজ্যসহ আরো অনেকটি রাজ্য গৌড়ের অধীনস্থ ছিল। রাজনৈতিক, ভৌগৌলিক, সামাজিক ও সাহিত্যিক দিক দিয়ে গৌড় রাজ্য সিলেট ইতিহাসকে সবদিকে প্রসিদ্ধ ও বাংলার অন্যান্য অঞ্চল থেকে আলাদা করেছে। তাই প্রাচীন কাল থেকে সিলেটিরা নিজস্ব রাজ্যের রাজা/শাসক দ্বারা শাসনের মাধ্যমে স্বতন্ত্র সংস্কৃতি, নিজস্ব জীবন-ব্যবস্থা এবং রাজ্যের অভ্যন্তরে সিলেটি ভাষা চর্চা/নিজস্ব স্বতন্ত্র ভাষা আলাদা বৈশিষ্ট্যের অধিকারি করে তুলে। তৎকালিন সময়ে সিলেটের অধিবাসীরা ব্যবসা-বানিজ্যসহ সর্বক্ষেত্রে বর্তমান ভারতের অসাম, কাছাড় ডিস্টিক, করিমগঞ্জ ডিস্টিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতো। তৎকালিন পূর্ববাংলা/বর্তমান বাংলাদেশের কোন অঞ্চলের সাথে গভীর সম্পর্ক না থাকায় প্রমিত বাংলা ভাষা চর্চা ব্যাহত হয় সিলেট অঞ্চলে।
• মধ্য যুগ ও মুঘল শাসনঃ
বিভিন্ন মতানুসারে খ্রিস্টীয় ১৩০৩ সালে হযরত শাহ জালাল(রহ) ৩৬০ জন সঙ্গী সহ দিল্লির সুলতানে প্রেরিত সিকান্দর গাজীর সাথে গৌড় রাজ্যে উপনীত হন। হযরত শাহ জালাল (রহ) আধ্যাতিক সাধনায় বিনা সমরে গৌড়ে প্রবেশ করেন এবং গৌড় রাজ্য মুসলমানদের দ্বারা অধিকৃত হয়। এভাবেই গৌড় রাজ্য দিল্লীর সুলতানের অধিকারে আসে। কিন্তু সিলেট অঞ্চল মুঘল শাসক দিল্লির সুলতানের (মুসলমানের) অধিকারে চলে গেলেও ভাষায় ও জীবন যাপনে ঠিক পূর্বের মতো অবিকল স্বতন্ত্র‍্যতা বিদ্যমান থাকে।
ব্রিটিশ শাসনঃ
১৮৭৪ সালে ‘উত্তর-পূর্ব সীমান্তসহ সিলেট অঞ্ছল নিয়ে অ-নিয়ন্ত্রণ প্রদেশ হিসাবে আসাম অঞ্চলটি প্রথম বঙ্গ থেকে পৃথক হয়েছিল। ১৯০৫ সালে সিলেট অঞ্চলটি পূর্ব বঙ্গ নামে নতুন প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল এবং ১৯১২ সালে এটি আসাম প্রদেশের অঞ্ছল হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। খাসিয়া-জৈন্তিয়া পাহাড়, গারো পাহাড়, নাগা পাহাড়, গোয়ালপাড়া এবং সিলেট-কাছার সহ প্রায় ৫৪,১০০ মাইল নিয়ে আসামের পরিধি বিস্তৃত ছিল । ঐতিহ্যগতভাবে বিশ্বাস করা হয়, ব্রাহ্মী লিপি থেকে আসমিয়া ও সিলেটের নাগরি লিপির উদ্ভব হয়, যা পরস্পরের সহোদর হিসেবে পরিগণিত। এমনকি আসমিয়া ভাষা ও সিলেটের ভাষার মধ্যে যথেষ্ট সাদৃশ্য বিদ্যমান। অসমীয়া ভাষা ভারতের আসাম রাজ্যের সরকারি ভাষা এবং রাজ্যের সমস্ত কর্মকাণ্ডে এটি ব্যবহৃত হত। সেজন্য জন্য সিলেটিরা প্রমিত বাংলা উচ্চারণের চেয়ে আসমিয়ার ভাষার সহোদর সিলেটি ভাষা(নাগরি) উচ্চারণে বেশি অভ্যস্ত।
• নাগরি বা সিলেটি ভাষাঃ
সিলেটি ভাষা মূলত বর্তমান ভারতের আসাম রাজ্যর বরাক উপত্যকা,বদরগঞ্জ ও করিমগঞ্জ জেলায় প্রচলিত এবং বর্তমান বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে ব্যবহৃত একটি ইন্দো-আর্য ভাষা। ২০২০ সালে কানাডাভিত্তিক ওয়েবসাইট “ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিসওগ্রি)-এ প্রকাশিত বিশ্বের ১০০টি কথ্য ভাষার তালিকায় স্থান পায় সিলেটি ভাষা। যেটি ১ কোটি ১৮ লাখ কথ্য ভাষাভাষী মানুষ নিয়ে পৃথিবীর ৯৭ তম বৃহৎ ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি প্রাপ্ত। বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলটি পূর্বাঞ্চলীয় এলাকা হওয়ায় এবং বাংলা ভাষার প্রমিত রীতির ভিত্তি নদীয়া তথা পশ্চিমাঞ্চলীয় আঞ্চলিক বাংলা ভাষা হওয়ার দরুন বাংলা ভাষার মূল রীতির সাথে এর যথেষ্ট পার্থক্য দেখা যায়। এজন্য সিলেটিরা প্রমিত বাংলা উচ্ছারণে এতো পারদর্শি হয় না। যা অন্যান্য জেলার লোকের কাছে দূর্বলতা মনে হলেও সিলেটিদের নিকট গৌ্রবের। কারণ এটি তাঁদের ঐতিহ্য।
লেখক, প্রভাষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, গোয়াইনঘাট সরকারি কলেজ, সিলেট।

ঐতিহাসিকভাবে শ্রীহট্ট নামে পরিচিত সিলেট অঞ্চল বর্তমান বাংলাদেশের পূর্ব দিকে অবস্থিত একটি ঐতিহ্যবাহী বিভাগ । মূলত সিলেট অঞ্চল প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান বাংলাদেশের সিলেট বিভাগসহ ভারতের আসামের করিমগঞ্জ,কাছাড়,এবং হাইলাকান্দি জেলা
জুড়ে বিস্তৃত ছিল। প্রাচীন সময় থেকে সিলেট অঞ্চল ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চল বা জেলা থেকে পৃথক ছিল, যার দরুন সিলেট অঞ্চলে আলাদা সংস্কৃতি গড়ে ওঠে যা বর্তমান বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে কিছু অসঙ্গতিপূর্ণ। পৃথক সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য থাকলেও পলিটিক্যাল বউন্ডারি সিলেট অঞ্চলকে প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশের সাথে সম্পৃক্ত করেছে। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির অন্যান্য জেলার লোকজন প্রায়ই বলে থাকে সিলেটের লোকজন শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে পারে না, কিংবা সিলেটের লোকজন অন্যান্য জেলার লোকজনের সাথে মিশে না বা সহজে মিশতে পারে না বা সম্পর্ক গড়ে না (বিয়ে,সাধী ইত্যাদিকে নির্দেশ করে)। প্রভৃতি অপবাদ/অভিযোগ (যা তাঁদের কাছে আমাদের দূর্বলতা) আমাকেও বহুবার শুনতে হয়েছে। এই অপবাদ/অভিযোগ পুরোপরি মিথ্যা না হলেও আনেকাংশে সত্য।
আমি বলবো এই অপবাদ বা অভিযোগ আমাদের কিঞ্চিৎ পরিমান দূর্বলতা নয়, বরং এই অপবাদ হলো সিলেটিদের হাজার বছরের পৃথক ভৌগোলিক অবস্থান, স্বতন্ত্র রাজনৈ্তিক ও সামাজিক সংস্কৃতি এবং নিজস্ব ভাষা বা কথ্য ভাষাগত ভিন্নতা প্রভৃতিকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
সিলেট অঞ্চলের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় , সহস্রাধিক বছর পূর্বে
পলিটিক্যাল বাউন্ডারি দ্বারা বর্তমান বাংলাদেশের অন্যান্য ভূমি থেকে রাজনৈ্তিক ,সামাজিক ও অন্যান্য দিক থেকে সিলেট অঞ্চল বাংলা থেকে পৃথক ছিল,এমন কি সিলেটিদের কথ্য ভাষা(নাগরি) ছিল ভিন্ন ।
কেন সিলেটিরা শুদ্ধ ভাষায় বা প্রমিত বাংলায় কথা বলতে পারর্দশি নয়? কেন সিলেট অঞ্চল রাষ্ট্রের অন্যান্য অঞ্চল থেকে নিজস্ব স্বকীয়তা বহন করে? সিলেট অঞ্চলের ইতিহাস ও ভাষার পর্যালোচনা করলে সহজে অনুমেয় যোগ্য।
• প্রাচীন/সুলতানি যুগঃ
ঐতিহাসিক সৈয়দ মুর্তাজা আলী’র মতে পঞ্চম হতে ষষ্ঠ শতাব্দীর মধ্যে নাক লম্বা, মাথা মোটা, গৌর বর্ণের আর্যরা সিলেট অঞ্চলে এসেছে। আর্যরা আসার পূর্বে অস্ট্রিক ও মঙ্গোলীয় নরগোষ্টি ছিল এ অঞ্চলের আদিম আধিবাসী। প্রাচীন বাংলায় সিলেট অঞ্চল গৌড় রাজ্যের অর্ন্তভূক্ত ছিল। গৌড় রাজ্য সিলেট শহরের প্রাণ কেন্দ্রে ইহার অবস্থান ছিল। ঐতিহাসিক অচ্যুতচরণ চৌধুরীর মতে প্রাচীন লাউড় রাজ্য কামরুপ হতে পৃথক (৭৫০ খ্রিঃ) হওয়ার পর প্রায় দশম শতকে লাউড় রাজ্য, জৈন্তিয়া ও গৌড় রাজ্যে বিভক্ত হয়ে স্বাধীন ভাবে শাসিত হয়। উক্ত রাজবংশের উত্তরসূরি রাজা গোড়ক অত্রাঞ্চলের অধীকার প্রাপ্ত হয়ে তার নামানুসারে রাজ্যের নাম রাখেন গৌড় রাজ্য। ইহার অবস্থান সিলেট শহর ও শহরের উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণে বহু দুর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এক সময় ইটা রাজ্য (ইটা রাজ্য সিলেটের প্রাচীন ইতিহাসের এক অংশ। বর্তমান সিলেট জেলাধীন বিয়ানীবাজার থানার অর্ন্তগত ঐতিহাসিক গ্রাম নিদনপুর হতে ‘ভাস্করবর্মনের তাম্রলিপি’ পাওয়ার কারণে এই গ্রাম শ্রীহট্টের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে), তরফ রাজ্য ( তরফ রাজ্য সিলেট বিভাগের বর্তমান হবিগঞ্জ সদর, মাধবপুর, লাখাই, বাহুবল, চুনারুঘাট, শ্রীমঙ্গল, নবীগঞ্জ এবং বাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল, ও নেত্রকোণা জেলার জোয়ানশাহী পরগনা নিয়ে তরফ রাজ্য বিস্তৃত ছিল), প্রতাফগড় রাজ্যসহ আরো অনেকটি রাজ্য গৌড়ের অধীনস্থ ছিল। রাজনৈতিক, ভৌগৌলিক, সামাজিক ও সাহিত্যিক দিক দিয়ে গৌড় রাজ্য সিলেট ইতিহাসকে সবদিকে প্রসিদ্ধ ও বাংলার অন্যান্য অঞ্চল থেকে আলাদা করেছে। তাই প্রাচীন কাল থেকে সিলেটিরা নিজস্ব রাজ্যের রাজা/শাসক দ্বারা শাসনের মাধ্যমে স্বতন্ত্র সংস্কৃতি, নিজস্ব জীবন-ব্যবস্থা এবং রাজ্যের অভ্যন্তরে সিলেটি ভাষা চর্চা/নিজস্ব স্বতন্ত্র ভাষা আলাদা বৈশিষ্ট্যের অধিকারি করে তুলে। তৎকালিন সময়ে সিলেটের অধিবাসীরা ব্যবসা-বানিজ্যসহ সর্বক্ষেত্রে বর্তমান ভারতের অসাম, কাছাড় ডিস্টিক, করিমগঞ্জ ডিস্টিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতো। তৎকালিন পূর্ববাংলা/বর্তমান বাংলাদেশের কোন অঞ্চলের সাথে গভীর সম্পর্ক না থাকায় প্রমিত বাংলা ভাষা চর্চা ব্যাহত হয় সিলেট অঞ্চলে।
• মধ্য যুগ ও মুঘল শাসনঃ
বিভিন্ন মতানুসারে খ্রিস্টীয় ১৩০৩ সালে হযরত শাহ জালাল(রহ) ৩৬০ জন সঙ্গী সহ দিল্লির সুলতানে প্রেরিত সিকান্দর গাজীর সাথে গৌড় রাজ্যে উপনীত হন। হযরত শাহ জালাল (রহ) আধ্যাতিক সাধনায় বিনা সমরে গৌড়ে প্রবেশ করেন এবং গৌড় রাজ্য মুসলমানদের দ্বারা অধিকৃত হয়। এভাবেই গৌড় রাজ্য দিল্লীর সুলতানের অধিকারে আসে। কিন্তু সিলেট অঞ্চল মুঘল শাসক দিল্লির সুলতানের (মুসলমানের) অধিকারে চলে গেলেও ভাষায় ও জীবন যাপনে ঠিক পূর্বের মতো অবিকল স্বতন্ত্র‍্যতা বিদ্যমান থাকে।
ব্রিটিশ শাসনঃ
১৮৭৪ সালে ‘উত্তর-পূর্ব সীমান্তসহ সিলেট অঞ্ছল নিয়ে অ-নিয়ন্ত্রণ প্রদেশ হিসাবে আসাম অঞ্চলটি প্রথম বঙ্গ থেকে পৃথক হয়েছিল। ১৯০৫ সালে সিলেট অঞ্চলটি পূর্ব বঙ্গ নামে নতুন প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল এবং ১৯১২ সালে এটি আসাম প্রদেশের অঞ্ছল হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। খাসিয়া-জৈন্তিয়া পাহাড়, গারো পাহাড়, নাগা পাহাড়, গোয়ালপাড়া এবং সিলেট-কাছার সহ প্রায় ৫৪,১০০ মাইল নিয়ে আসামের পরিধি বিস্তৃত ছিল । ঐতিহ্যগতভাবে বিশ্বাস করা হয়, ব্রাহ্মী লিপি থেকে আসমিয়া ও সিলেটের নাগরি লিপির উদ্ভব হয়, যা পরস্পরের সহোদর হিসেবে পরিগণিত। এমনকি আসমিয়া ভাষা ও সিলেটের ভাষার মধ্যে যথেষ্ট সাদৃশ্য বিদ্যমান। অসমীয়া ভাষা ভারতের আসাম রাজ্যের সরকারি ভাষা এবং রাজ্যের সমস্ত কর্মকাণ্ডে এটি ব্যবহৃত হত। সেজন্য জন্য সিলেটিরা প্রমিত বাংলা উচ্চারণের চেয়ে আসমিয়ার ভাষার সহোদর সিলেটি ভাষা(নাগরি) উচ্চারণে বেশি অভ্যস্ত।
• নাগরি বা সিলেটি ভাষাঃ
সিলেটি ভাষা মূলত বর্তমান ভারতের আসাম রাজ্যর বরাক উপত্যকা,বদরগঞ্জ ও করিমগঞ্জ জেলায় প্রচলিত এবং বর্তমান বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে ব্যবহৃত একটি ইন্দো-আর্য ভাষা। ২০২০ সালে কানাডাভিত্তিক ওয়েবসাইট “ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিসওগ্রি)-এ প্রকাশিত বিশ্বের ১০০টি কথ্য ভাষার তালিকায় স্থান পায় সিলেটি ভাষা। যেটি ১ কোটি ১৮ লাখ কথ্য ভাষাভাষী মানুষ নিয়ে পৃথিবীর ৯৭ তম বৃহৎ ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি প্রাপ্ত। বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলটি পূর্বাঞ্চলীয় এলাকা হওয়ায় এবং বাংলা ভাষার প্রমিত রীতির ভিত্তি নদীয়া তথা পশ্চিমাঞ্চলীয় আঞ্চলিক বাংলা ভাষা হওয়ার দরুন বাংলা ভাষার মূল রীতির সাথে এর যথেষ্ট পার্থক্য দেখা যায়। এজন্য সিলেটিরা প্রমিত বাংলা উচ্ছারণে এতো পারদর্শি হয় না। যা অন্যান্য জেলার লোকের কাছে দূর্বলতা মনে হলেও সিলেটিদের নিকট গৌ্রবের। কারণ এটি তাঁদের ঐতিহ্য।
লেখক, প্রভাষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, গোয়াইনঘাট সরকারি কলেজ, সিলেট।

Recent Posts

  • জাতীয়

সিলেট-৩ আসনের উপনির্বাচন ৫ আগস্ট পর্যন্ত স্থগিতের আদেশ দিয়েছে হাইকোর্ট

স্টাফ রিপোর্টারঃ করোনা প্রতিরোধে চলমান বিধিনিষেধের মধ্যে আগামী ২৮ জুলাই সিলেট-৩ আসনের উপনির্বাচনের যে তারিখ…

20 hours ago
  • জাতীয়
  • রাজনীতি

কঠোর লকডাউনে ও থেমে নেই সিলেট-৩ আসনের নির্বাচনী সভা- সমাবেশ

স্টাফ রিপোর্টার: সারা দেশে চলছে করোনা মহামারির তান্ডব।রবিবার (২৫জুলাই) ২২৮জনের মৃত্যু এটা দেশে সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড।এ…

1 day ago
  • আইন-অপরাধ

ফেসবুকে আগুনের গুজব : সিলেটে গ্রেফতার ৭

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে গুজব ছড়ানোর অভিযোগে সিলেটে ভুয়া সাংবাদিকসহ ৭ জনকে গ্রেফতার করেছে…

1 day ago
  • গ্রাম -বাংলা

ওসমানীনগরে দু’পক্ষের সংঘর্ষে মজলিসের সভাপতি ও যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতিসহ ১৪ জন আহত

নিজস্ব প্রতিবেদকঃওসমানীনগরে মসজিদের কাঁঠালের নিলাম ডাকাকে কেন্দ্র করে দুপক্ষের সংঘর্ষে উপজেলা যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতিসহ ১৪…

3 days ago
  • আর্ন্তজাতিক

অবৈধ অভিবাসী ঠেকাতে ফ্রান্সের সাথে ব্রিটেনের ৫৪ মিলিয়ন পাউন্ডের চুক্তি

স্টাফ রিপোর্টার:ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে প্রতিদিন ব্রিটেনে প্রবেশের চেষ্টা করে শত শত অভিবাসন প্রত্যাশি।…

4 days ago
  • ইসলামিক

বার্সেলোনায় খোলা মাঠে ঈদ-উল আযহার নামাজ অনুষ্ঠিত

ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য এবং ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনায়  স্পেনের বার্সেলোনায় উদযাপিত হলো মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বড় ধর্মীয়…

7 days ago

This website uses cookies.