ধর্ষণ মামলার বিচার দ্রুত করার জন্য আইন সংশোধন করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করা হয়েছে। এর ফলে এসব মামলার তদন্ত ও বিচারের সময় কমবে। নতুন আইনে ছেলেশিশুদের প্রতি যৌনকর্মকে ‘বলাৎকার’ ও ‘বিয়ের প্রলোভনের মাধ্যমে যৌনকর্ম’ শিরোনামে নতুন ধারা সংযোজন করা হয়েছে। আর ধর্ষণের মামলায় ডিএনএ পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হয়েছে। নতুন বিধানের পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। এ নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক নাজনীন আখতার।
প্রথম আলো: ২০২০ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে সংশোধন আনে তৎকালীন সরকার। ধর্ষণের সাজা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডের সঙ্গে মৃত্যুদণ্ড যোগ করা হয়। ধর্ষণের মামলায় ডিএনএ পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়। এবার মাগুরার শিশুটির ঘটনায় ওই আইনে সংশোধন এনেছে অন্তর্বর্তী সরকার। জনতুষ্টির বিষয়টি মাথায় রেখে সরকার তড়িঘড়ি করে আইন সংশোধন করল কি?
আসিফ নজরুল: মাগুরার শিশুটির ঘটনা ছিল হৃদয়বিদারক। আইন দ্রুত সংশোধন করার ক্ষেত্রে এ ঘটনাটি ভূমিকা রেখেছে সত্য; তবে ওই ঘটনা না ঘটলেও আইনটি সংস্কারে উদ্যোগ নিতাম। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সীমাবদ্ধতা ও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে আমরা আগে থেকে অবগত ছিলাম। আইনটি সংশোধনের আগে তড়িঘড়ি নয়, ব্যাপক আলোচনা করা হয়েছে। অনেক মহলের মতামত বিবেচনায় নিয়ে সংশোধন আনা হয়েছে।
প্রথম আলো: যৌন নির্যাতনের নানা ধরন তুলে ধরে ‘ধর্ষণ আইন সংস্কার জোট’ সাত বছর ধরে ধর্ষণের সংজ্ঞা বিস্তৃত করার দাবি করে আসছে। জোট বলছে, সরকার আলোচনায় তাদের ডাকেনি।
আসিফ নজরুল: ‘ধর্ষণ আইন সংস্কার জোট’কে ডাকলে ভালো হতো। তবে তাদের দাবিগুলো অন্যদের দাবির মধ্যেও এসেছিল। আইনের খসড়া বিষয়ে নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের লিখিত মতামত পেয়েছি। হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের মতামত নেওয়া হয়েছে। এসব মতামতের ৬০ শতাংশ গ্রহণ করা হয়েছে। অ্যাটর্নি জেনারেল, নারী ও শিশু মন্ত্রণালয়, তিনজন উপদেষ্টা এবং আইন ও ফরেনসিক–বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া হয়েছে। রাজপথে আন্দোলনে শিশু ধর্ষণ মামলার বিচার আলাদা ট্রাইব্যুনালে করার দাবি ছিল। আইনে সংশোধন এনে ২৬ক ধারায় শিশু অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। আসলে এটা এমন একটি আইন, তা সংশোধনে যত আলোচনাই করা হোক না কেন, মনে হবে আলোচনা যথেষ্ট হয়নি।
প্রথম আলো: নতুন অধ্যাদেশে ধর্ষণের সংজ্ঞা দণ্ডবিধির ধারা অনুসারেই রয়েছে। সেখানে ধর্ষণকে নারীর বিরুদ্ধে পুরুষের অপরাধ হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। অধ্যাদেশে ধর্ষণের সংজ্ঞায় ভুক্তভোগীকে ‘ব্যক্তি’ উল্লেখ করা হলে নারী ও শিশুর বাইরে অন্য লিঙ্গের মানুষেরা ধর্ষণের শিকার হলে বিচার পেতে পারতেন। এ সমস্যার তো সমাধান হলো না।
আসিফ নজরুল: ধর্ষণের সংজ্ঞায় আলাদা করে পরিবর্তন না আনা হলেও ‘যৌনকর্ম’ দফা যুক্ত করে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। ধর্ষণের সংজ্ঞা বিস্তৃত করার যে দাবি ছিল, তা যৌনকর্মের ব্যাখ্যায় তুলে আনা হয়েছে। অন্য লিঙ্গের বিষয়ে আমাদের এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেই। তবে ছেলেশিশুদের বিরুদ্ধে যৌনকর্মকে ‘বলাৎকার’ হিসেবে আইনের ২ ধারায় যুক্ত করা হয়েছে। ধর্ষণ বলতে ‘বলাৎকার’কেও বোঝাবে। ১৬ বছরের কম বয়সী ছেলেশিশুরা এই ধারায় বিচার পাবে।
প্রথম আলো: ছেলেশিশুদের ধর্ষণের বিষয়টি আগে আইনে শনাক্ত করা ছিল না। বিচারকেরা অন্য বিচারকাজের উদাহরণ টেনে ১৬ বছরের কম বয়সী ছেলেশিশুদের ধর্ষণের বিচার করতেন এই আইনে। শিশু আইন ২০১৩ ও বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ অনুসারে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত শিশু ধরা হয়। ফলে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মেয়ে ও ছেলেশিশুর বয়স ১৮ করার একটা দাবি ছিল।
আসিফ নজরুল: বয়স আগের আইনে যা ছিল, তা–ই রাখা হয়েছে। আপাতত ১৮ করার সিদ্ধান্ত নেই।